আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া শতবর্ষ বয়সেও কাজ করে গেছেন এবং অনেক কাজ করার স্বপ্ন দেখেছেন। তাঁর লিখে যাওয়া অনেক পাণ্ডুলিপি এখনও অপ্রকাশিত। সেগুলো প্রকাশিত হলে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসবে। আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া স্যারের ওপর আরও গবেষণা করা প্রয়োজন। স্থাপত্য ও ইতিহাস গবেষণায় তিনি যে রোডম্যাপ দিয়ে গেছেন, তা বাস্তবায়ন হলে আমরা অনেক উপকৃত হবো। এ রকম একজন ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে যেতে এবং তাঁর সঙ্গে বসে কাজ করতে পেরেছি বলে আমি গর্বিত। ঢাকা স্থাপত্যবিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটিকে ধন্যবাদ জানাই এ রকম একটি সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। যাকারিয়া স্যার আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও হৃদয়জুড়ে এখনও তিনি আছেন। আরও শত শত বছর হৃদয়ে থাকবেন ইনশাআল্লাহ।


আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া স্যারের সঙ্গে আমার পরিচয় খুব বেশি দিনের না। ঢাকা স্থাপত্যবিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটির মিটিংয়ে প্রথম দেখা। মানুষটিকে যতই দেখেছি, ততই মুগ্ধ হয়েছি। তাঁর বিনয়, নম্রতা, জ্ঞানের গভীরতা, কাজের প্রতি মনোযোগ, একাগ্রতা সবকিছু আমাকে অভিভূত করেছে। মানুষকে কীভাবে সম্মান করতে হয়, তা তিনি ভালোভাবে জানতেন। যতদিন তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে, কখনোই আগে সালাম দিতে পারিনি। সব সময় তিনি আগে সালাম দিতেন। ছোটদের সঙ্গে বড়দের, জ্ঞানপিপাসুদের সঙ্গে জ্ঞানীদের ব্যবহার কেমন হওয়া উচিত তা তাঁর কাছ থেকে শেখার আছে বলে আমি মনে করি। বাংলায় 'পণ্ডিত' শব্দটি অনেক শুনেছি। আবুল কালাম যাকারিয়াকে দেখে মনে হয়েছে, তিনি ছিলেন পাণ্ডিত্যের মূর্ত প্রতীক। একজন মানুষ একসঙ্গে জ্ঞানের কয়টি শাখায় বিচরণ করতে পারেন- তিনি তাঁর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

তাঁর জ্ঞানপিপাসা ছিল অপরিসীম। যে কয়বার তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে, অধিকাংশ সময়েই তাঁকে বইয়ের মধ্যে ডুবে থাকতে দেখেছি। একদিন বিকেলে তাঁর কলাবাগানের বাসায় দেখা করতে গিয়েছিলাম। উষ্ণ আতিথেয়তায় তিনি আমাদের গ্রহণ করেছিলেন। যে রুমে তিনি থাকতেন, এর চতুর্দিকে বই আর বই। আমরা যখন পৌঁছেছিলাম, তখনও তিনি বই পড়ছিলেন। আমাদের দেখে উঠে এলেন। ইতিহাস ও অনুবাদ সাহিত্যে তিনি কী কী কাজ করেছেন; একে একে আমাদের দেখালেন। বুঝতে পারলাম, আল্লাহ তাঁকে অসাধারণ পাণ্ডিত্য দান করেছেন। তিনি ছিলেন একাধারে ইতিহাসবিদ, প্রত্নতত্ত্ব গবেষক, সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক ও একজন সফল অনুবাদক। মোগল ও সুলতানি আমলের বই তিনি ফারসি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন। ফারসি থেকে বাংলায় অনূদিত মিনহাজ-ই-সিরাজ লিখিত তাবাকাতে নাসিরি, সৈয়দ গোলাম হোসেন তবাতবায়ির সিয়ার-উল-মুতাখ্‌খিরিন, মোজাফ্‌ফরনামা, নও-বাহারি- মুর্শিদ কুলি খান, ইউসুফ আলি খানের লেখা তারিখ-ই-বাঙ্গালা-ই মহব্বত জঙ্গী তিনি মূল ফারসি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেন। একজন ইংরেজি শিক্ষিত মানুষ ফারসি থেকে এত বই বাংলায় অনুবাদ করেছেন দেখে সত্যিই অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। তাঁর অনুবাদের মানও অসাধারণ। পরে স্যারের কাছ থেকে তাঁর ফারসি চর্চার ইতিহাস জানতে পারি। স্কুলে যাওয়ার আগেই শৈশবে মক্তবে তিনি ফারসি শিখেছিলেন। তাঁর গ্রামের পাশের রুপসদি বৃন্দাবন হাই স্কুলের হেড মাওলানা আব্দুর রহমানের কাছেও কিছুদিন ফারসি চর্চা করেন। এইচএসসিতে ঢাকা কলেজেও তিনি ফারসি পড়েন। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হলেও সেখানে সাবসিডিয়ারি হিসেবে ফারসি চর্চা করেন। জীবনে তিনি এই ফারসির জ্ঞানকে আমাদের বাঙালি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য উদ্ঘাটনে ব্যবহার করেছিলেন। ওইদিন আমাদের যাওয়ার মূল কারণ ছিল 'তারিখ-ই ঢাকা' বইটি তিনি অনুবাদ করতে চাচ্ছিলেন। বইটি মূল ফারসিতে লেখা ছিল। এটি অনুবাদ করতে পারলে ঢাকা শহরের অজানা অনেক ইতিহাস বের হয়ে আসবে। এ জন্য তিনি বইটি অনুবাদ করত উদগ্রীব ছিলেন। কিন্তু তাঁর সংগৃহীত মূল ফারসি বইটি খাত্তে নাস্তালিকে লেখা ছিল। খাত্তে নাস্তালিক একটু প্যাঁচানো হরফে লেখা হয় বলে এর পাঠোদ্ধার খুব কঠিন। স্যার বইটি পাঠোদ্ধারের জন্য বলেছিলেন। যদিও এ কাজে তাঁকে সন্তোষজনকভাবে সাহায্য করতে পারিনি।

যাকারিয়া স্যার বই পড়তে এবং লিখতে ভালোবাসতেন। পুথি সাহিত্যের ব্যাপারে তাঁর অনেক আগ্রহ ছিল। তাঁর কাছে পুথির বড় একটি সংগ্রহ ছিল। পুথিবিষয়ক তিনি অনেক বই লিখেছেন। গুপিচন্দ্রের সন্ন্যাস এর মধ্যে অন্যতম। তিনি কবিতা শুনতে ভালোবাসতেন। বাংলা, ফারসি ও উর্দু ভাষার অনেক কবিতা তাঁর মুখস্থ ছিল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি কবিতাগুলো আবৃত্তি করতেন। কোনো বিষয় সম্পর্কে কারও কোনো কবিতা জানা থাকলে তিনি তা আগ্রহ সহকারে শুনতে চাইতেন। অনেক সময় কবিতা শোনার পর বাহ বাহ বলে উৎসাহিত করতেন। শতবর্ষ বয়সে স্যারকে পেয়েছিলাম। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, বার্ধক্য তাঁকে কখনও ক্লান্ত করতে পারেনি। শতবর্ষেও তিনি যেন আমাদের চেয়েও যুবক ছিলেন। একাধারে তিনি কাজ করে যেতেন, কিন্তু কখনও কাজের প্রতি বিরক্তি বা ক্লান্তি দেখতে পাইনি। পড়াশোনা আর গবেষণাই যেন ছিল তাঁর নেশা ও পেশা।

যাকারিয়া স্যারের সঙ্গে জাতীয় জাদুঘর ও পুরান ঢাকার কিছু মন্দিরের প্রতিমা দেখতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। কোনো মূর্তি দেখার সঙ্গে তিনি তার প্রকার, এই মূর্তি কোন আমলের, সেটি কী ধরনের মূর্তি, কারা এই প্রতিমার অর্চনা করে থাকে; বলে দিতে লাগলেন। প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে স্যারের জ্ঞানের বিশালতা সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম। স্যারের লেখা বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ বইটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া অনেক স্থাপত্য, স্থাপনার তথ্য তিনি এই বইয়ে দিয়েছেন।

স্যারের আরেকটি বিষয় অনেক ভালো লেগেছে। গবেষণা ও সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন যোগ্য সংগঠক ও ক্রীড়াব্যক্তিত্ব। তিনি ভালো ফুটবল খেলতে পারতেন। ঢাকা কলেজ ফুটবল টিমের নিয়মিত সদস্য ছিলেন। তৎকালীন বিখ্যাত ভিক্টোরিয়া ও ওয়াপদা ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগে খেলেছেন। এ ছাড়া ভলিবল, টেনিস, দৌড়ে তাঁর দক্ষতা ছিল অসাধারণ। কিছুদিন তিনি বাংলাদেশ ফুটবল টিমের ম্যানেজার ছিলেন। সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা পরিদর্শন করেন এবং সব জায়গায় তিনি কৃতিত্বের পরিচয় দেন। এক কথায়, তিনি সব্যসাচী ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন।

শতবর্ষ বয়সেও তিনি কাজ করে গেছেন এবং অনেক কাজ করার স্বপ্ন দেখেছেন। তাঁর লিখে যাওয়া অনেক পাণ্ডুলিপি এখনও অপ্রকাশিত। সেগুলো প্রকাশিত হলে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসবে। আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া স্যারের ওপর আরও গবেষণা করা প্রয়োজন। স্থাপত্য ও ইতিহাস গবেষণায় তিনি যে রোডম্যাপ দিয়ে গেছেন, তা বাস্তবায়ন হলে আমরা অনেক উপকৃত হবো। এ রকম একজন ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে যেতে এবং তাঁর সঙ্গে বসে কাজ করতে পেরেছি বলে আমি গর্বিত। ঢাকা স্থাপত্যবিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটিকে ধন্যবাদ জানাই এ রকম একটি সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। যাকারিয়া স্যার আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও হৃদয়জুড়ে এখনও তিনি আছেন। আরও শত শত বছর থাকবেন ইনশাআল্লাহ।

মোহাম্মদ আহসানুল হাদী: সহযোগী অধ্যাপক, ফারসি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়