সমকালের সম্পাদকীয় স্তম্ভ সাধু ভাষারীতিতে এমন সময় প্রত্যাবর্তন করিতেছে, যখন 'অসংকোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস' লইয়া প্রকাশিত সংবাদপত্রটির অষ্টাদশ বর্ষে পদার্পণ ঘটিয়াছে। নিয়মিত পাঠকগণ নিশ্চয়ই জানেন, প্রথমদিকে সমকালের বাকি অংশগুলো চলিত ভাষা অনুসরণ করিলেও সম্পাদকীয় স্তম্ভটুকু সাধু ভাষারীতিতেই রচিত হইত। পরবর্তী সময়ে আমরা চলিত ভাষার শরণাপন্ন হইয়াছিলাম তৎকালীন সম্পাদকীয় বিবেচনায়। বস্তুত, বাংলা সাংবাদিকতার সূচনা যুগে সংবাদপত্রসমূহের সর্বাঙ্গেই প্রাচীন গদ্যরূপ চর্চিত হইত। বাংলাদেশে নব্বই দশকের গোড়াতেও ঐরূপ সংবাদপত্র প্রথম সারির প্রচার সংখ্যা লইয়া সগৌরবে বহাল রহিয়াছিল। কালের বিবর্তনে প্রায় সকল সংবাদপত্রই বাংলা ভাষার চলিত রূপ গ্রহণ করিয়াছে। অবশ্য সমকালসহ একাধিক সংবাদপত্র অন্তত সম্পাদকীয় স্তম্ভে সাধুরীতি অনুসরণ করিতে থাকে মূলত ইহার আভিজাত্য ও ঋজুতার কারণে। এই ধারা অদ্যাবধি একেবারে বিলুপ্ত হইয়া যায় নাই। ঢাকা হইতে প্রকাশিত অন্তত একটি সংবাদপত্র এখনও সাধুরীতিতে সম্পাদকীয় স্তম্ভ রচনা করিয়া থাকে। আমরাও যে সাধুরীতির সম্পাদকীয় স্তম্ভে প্রত্যাবর্তন করিলাম- ইহার নেপথ্যে রহিয়াছে বহুবিধ বিবেচনা। পাঠকগণও এইসব বিবেচনা আমলে লইবেন বলিয়া আমাদের প্রত্যাশা।

আমরা অস্বীকার করিতে পারি না যে, বাংলা গদ্যের সাধুরীতি একদা একক লৈখিক রূপ হিসাবে বিবেচিত হইলেও কালের পরিবর্তনের সহিত তাল মিলাইতে না পারিয়া সাধারণ পাঠকের অনেকের কাছে তাহা ক্রমশ কেবল অপরিচিত নহে, দুষ্পাঠ্যও বিবেচিত হইতে থাকে। এই যুক্তিও কেহ কেহ প্রদর্শন করিয়া থাকেন যে, কেবলমাত্র ভাষাগত অপরিচিতি কিংবা অস্বস্তির কারণে অনেক পাঠক সাধু ভাষার সম্পাদকীয় স্তম্ভ পাঠে আগ্রহ নাও পাইতে পারেন। কিন্তু ইহাও মনে রাখিতে হইবে- আধুনিকতার সহিত তাল মিলাইতে গিয়া ঐতিহ্য বিসর্জন কাম্য হইতে পারে না। বরং আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের মধ্যে যোগসূত্র ও সমন্বয় সাধনই কাঙ্ক্ষিত। উন্নত সভ্যতা ও রাষ্ট্রসমূহে আমরা এই ধারাই প্রত্যক্ষ করিয়া থাকি। তাহাদের সংস্কৃতি ও ভাষার ক্ষেত্রেও অভিন্ন নীতি ও চর্চার প্রতিফলন দেখা যায়। যে ইংরাজি ভাষা সবচেয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক; যাহার অভিধান প্রায় প্রতি বৎসরই নতুন নতুন বিজাতীয় শব্দ গ্রহণ করিয়া থাকে, সেই ভাষার শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রসমূহেও আমরা দেখি সম্পাদকীয় স্তম্ভে অপেক্ষাকৃত প্রাচীন রীতির গদ্য অনুসৃত হইয়া থাকে। সমকালের সম্পাদকীয় বিবেচনা শেষোক্ত যুক্তিটি গ্রহণ করিল। ভাষাগত অস্বস্তির কারণে যাঁহারা সম্পাদকীয় স্তম্ভ পাঠ করিবার উৎসাহ না পাইবার অজুহাত প্রদর্শন করেন, তাঁহারা যে চলিত ভাষায় রচিত সম্পাদকীয় পাঠ করিতে উৎসাহী হইবেন- এই নিশ্চয়তা কে দিতে পারিবে?

ইহাও স্বীকার করিতে হইবে- সম্পাদকীয় স্তম্ভের মাধ্যমে কোনো ঘটনা বা পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি সংবাদপত্র নিজস্ব অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করিয়া থাকে। ইহার মাধ্যমে সংশ্নিষ্টদের প্রতি তাগিদ ও সুপারিশও বিবৃত হইয়া থাকে। পাশাপাশি জনমত গঠনেও উহা ভূমিকা রাখিয়া থাকে। আমরা জানি, ভাষা জনমতেরও বাহক। সমাজে প্রচলিত ধারণা হইতে সংবাদপত্রের স্বতন্ত্র ভাষা ও ভঙ্গি রক্ষায়ও সম্পাদকীয় স্তম্ভে সাধু ভাষার প্রয়োগ চলিতে পারে। আমরা মনে করি, এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গুরুগম্ভীর ভাষা প্রয়োগই যথার্থ। সেই ক্ষেত্রে সাধু ভাষা বিশেষ উপযোগী। ইংরাজি ভাষার ক্ষেত্রেও আমরা দেখিয়া থাকি যে, গুরুগম্ভীর বিষয়ে উহার মূল ভাষা লাতিন শব্দের শরণাপন্ন হইতেছে। চতুর্দিকে চলিত ভাষার জয়জয়কারের মধ্যেও আমরা দেখি ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ বিষয়ে সাধু ভাষার প্রাসঙ্গিকতা এখনও সমুজ্জ্বল। পাঠকগণকে আমরা এই বাস্তবতাও বিবেচনা করিতে বলি যে, বিভিন্ন বিষয়ে সূক্ষ্ণ ব্যঙ্গ কিংবা তীক্ষষ্ট মন্তব্য করিতেও বাংলা গদ্যের সাধুরীতি অদ্বিতীয়। বাংলা ভাষার আধুনিক গদ্য সাহিত্যেও ইহার ব্যবহার অহরহ। আমরা বিশ্বাস করি, সাধু ভাষায় আরোহণ করিয়া সমকাল সম্পাদকীয় স্তম্ভের স্বকীয়তা পাঠকের চেতনাতে বিশেষ মাত্রা যুক্ত করিবে।

সাধু ভাষারীতিতে প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়া আমরা চলিত ভাষা ও তাহার প্রয়োজনীয়তাকে অবজ্ঞা কিংবা অশ্রদ্ধ মোটেই করিতেছি না; বরং সমকালের উপসম্পাদকীয়, নিবন্ধ, প্রতিবেদন, ফিচার, ঘোষণা প্রভৃতি চলিত ভাষায় রচনা করিয়া তাহারই প্রমাণ রাখিয়া যাইতেছি। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও 'বাংলাভাষা পরিচয়' প্রবন্ধে সাধু ও চলিত ভাষাকে যথাক্রমে 'সুয়োরাণী ও দুয়োরাণী' আখ্যা দিয়া বলিয়াছিলেন যে, কালক্রমে দুয়োরাণীই সিংহাসনে বসিবে। বিগত কয়েক দশকে তাহা বাস্তবে পরিণত হইয়াছে। কিন্তু একই সঙ্গে শিকড় ছিঁড়িয়া ফেলাও যে উচিত হইবে না- সম্পাদকীয় স্তম্ভে 'সাধুবাদ' প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়া আমরা তাহা ঘোষণা করিতেছি। আমরা নিশ্চয়ই অগ্রসর হইব; কিন্তু অগ্রসর হওয়ার অর্থ কি ইতিহাস ও ঐতিহ্য অস্বীকার করা? কদাচ নহে!