বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ এবং ২০১৩-এর সংশোধন অনুসারে, কর্মরত শিশু বলতে বোঝায় ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে যারা সপ্তাহে ৪২ ঘণ্টা পর্যন্ত হালকা পরিশ্রম বা ঝুঁকিহীন কাজ করে। এ শ্রম অনুমোদনযোগ্য। অথচ আইনের এই বিষয় তোয়াক্কা না করে শিশুশ্রম চলছে দেশের আনাচে-কানাচে! যা শিশু সুরক্ষা তথা শিশু অধিকারের পরিপন্থি। সরকারের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সংস্থা শিশুশ্রম রোধে নানা কাজ করলেও শিশুশ্রম বন্ধ হচ্ছে না। বাংলাদেশে ৩২ লাখ শিশুশ্রমিক রয়েছে, যার মধ্যে ১৩ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। যা তাদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও নৈতিকতার জন্য ক্ষতিকারক।

সারাবিশ্বে শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ রচনা করতে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক কর্মসূচি গৃহীত হলেও শিশু নির্যাতন তথা শিশু অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি থেমে নেই এক মুহূর্তের জন্যও। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শিশু অধিকার সনদে মূলনীতি হিসেবে (১) বৈষম্যহীনতা, (২) শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষা, (৩) শিশুর অধিকার সমুন্নত রাখতে অভিভাবকদের দায়িত্ব ও (৪) শিশুদের মতামতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কথা উল্লেখ থাকলেও বাংলাদেশে বিশেষ করে বর্তমান পরিস্থিতিতে এর যথাযথ প্রয়োগ খুবই বিরল। শিশুশ্রম কেবল একটি শিশু বা তার পরিবারকেই ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে না, বরং অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে ফেলে তার সব সম্ভাবনা! নিষ্পাপ শিশুর শৈশবকে যারা গলা টিপে হত্যা করে বা যারা প্ররোচিত ও বাধ্য করে, তারা আসলে কেমন মানুষ! মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম একটি হলো সুশিক্ষা (প্রাতিষ্ঠানিক ও বাস্তবভিত্তিক)। কিন্তু অনুকূল পরিবেশের অভাবে আরেকটি মৌলিক চাহিদা, অর্থাৎ অন্ন জোগাড় করতে তখন তাকে শৈশবেই যুবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। কাজ যতই হোক, পারিশ্রমিকের বেলায় (অল্প টাকায়) কেবল শৈশবকে বিবেচনা করা হয়।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ৮.৭-এ বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে শিশুদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং ২০২৫ সালের মধ্যে সব ধরনের শিশুশ্রম নির্মূল করতে হবে। এখনই তার প্রকৃত সময়। সম্প্রতি বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ কভিড-১৯ মহামারির কারণে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। এর ফলে শিশুশ্রমের ওপর কী প্রভাব পড়ল, তার হিসাব কেউ রাখছে কি? এক বছরের বেশি সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিশুশ্রম কতটা বেড়ে গেল, তা কি আমরা জানি? হয়তো জানি, কিন্তু স্বীকার করি না।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) শ্রম নিয়োগ সম্পর্কে যে মান নির্দিষ্ট করে দিয়েছে, সেখানে মূলত চারটি মাত্রার কথা বলে হয়েছে- সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা, যৌথ দরকষাকষির অধিকার, শিশুশ্রমিকের অনস্তিত্ব ও বৈষম্যহীন নিয়োগ ব্যবস্থা। এগুলো সব দেশে নীতি হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে এর প্রয়োগকৌশল নিয়ে। দিন, মাস, বছর যায়। সময়ের পরিক্রমায় শিশু দিবস, শিশু অধিকার সপ্তাহ, শিশুশ্রম দিবস, মানবাধিকার দিবস পালিত হয়। অনেকে আবার শিশুদের উন্নয়নে কাজ করেন, গবেষণা চালিয়ে যান। বড় বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। অনেকে দেশবরেণ্য মানুষের স্বীকৃতি পান। নামি-দামি পুরস্কারও পান! কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না!

সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করতে না পারলে শিশুশ্রম কমবে না; শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে না। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। সুন্দর আগামীর জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা যেমন জরুরি, ঠিক তেমনি প্রয়োজন প্রতিটি শিশুর জন্য আমজনতার আন্তরিক ভালোবাসা! নয়তো এই শিশুরাই আগামীতে গর্বিত নাগরিক না হয়ে ভিক্ষাবৃত্তিসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে যাবে। যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে বাড়ছে শিশুশ্রম, বঞ্চিত হচ্ছে শিশু অধিকার, তবুও যে কোনো সচেতন ও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিই চাইবেন শিশুশ্রম বন্ধ হোক; প্রতিষ্ঠিত হোক শিশু অধিকার। আমরাও প্রত্যাশায় আছি সেদিনের।

মো. তানজিমুল ইসলাম: সামাজিক উন্নয়ন ও মানবাধিকারকর্মী
aronnyok@gmail.com