মহালয়া আজ মনে পড়ছে না! দুর্গা প্রতিমায় চক্ষুদান, বেদি তৈরি, মন্দির সাজানোর ব্যস্ততা- কোনো কিছুই মনে পড়ছে না! অষ্টমীর রাতে বাজারের মন্দিরে আরতি দেখার সময় চোখে চোখ রেখেছিল যে অচেনা, তার কথাও মনে পড়ছে না! শুধু মনে পড়ছে কৌশিকের কথা, ছোট্ট রাধিকার কথা, ওদের বাবা জগদীশের কথা।

পঞ্চগড়ের বোদার বটতলী গ্রামের জগদীশ রায়ের সঙ্গে আমার কোনো দিন দেখা হয়নি; কৌশিক-রাধিকার সঙ্গেও না। তবু তাদের কথাই মনে পড়ছে মহালয়ার সমস্ত স্মৃতি ছাপিয়ে। উৎসবের এই দিনে করতোয়ার জলে বাবাকে হারিয়ে ফেলল ওরা!

একটি-দুটি নয়, হারিয়ে গেল ৬৯টি জীবন। 'অগভীর করতোয়া' পেরিয়ে বদেশ্বরী মন্দির দর্শন তাঁদের হলো না। পূজার ফুল, বেলপাতা, আতপ চাল, কলা- সব ভেসে গেল করতোয়ার স্রোতে। অনেক অপেক্ষার তীর্থযাত্রা যেন মুহূর্তেই রূপ নিল বুক খালি হওয়ার আয়োজনে। মাঝনদীতে চিৎকার, বাঁচাও বাঁচাও আর্তনাদ। কে বাঁচাবে কাকে?

দেবীগঞ্জের শালডাঙ্গার দীপনের সামনে এখন অন্ধকার। বদেশ্বরী মন্দিরে যাবেন বলে তার মা-বাবা সেদিন একসঙ্গেই উঠেছিলেন নৌকায়। কিন্তু মাঝপথ থেকে মা ফিরেছেন ভেজা শরীরে, করতোয়ার জলে ভেজা। অনেক ভারী সে শরীর। কয়েকজন মিলে বাড়িতে আনতে হয়েছে। নিষ্প্রাণ মাকে জড়িয়ে ডুকরে কেঁদেছে ১৭ বছরের দীপন ও ১৩ বছরের পরিতোষ। মা-বাবার সঙ্গে থাকলেও প্রাণে বেঁচে ফিরেছে তিন বছরের দীপু। করতোয়া থেকে উদ্ধার হয়েছে সে। মায়ের শরীর দাহ হয়েছে কিন্তু তাদের দিনমজুর বাবা ভূপেন এখনও বাড়ি ফেরেননি! তাঁর খোঁজ মেলেনি।

মহালয়ার কথা নয়, আজ শুধু মনে পড়ছে বোদার মাড়েয়ার বামনহাটের কথা। গেল রোববার দুপুরে এই মাড়েয়া বাজারের পাশের আউলিয়া ঘাটে নৌকায় উঠেছিলেন কৌশিক-রাধিকার বাবা জগদীশ ও দীপনের মা-বাবাসহ শতাধিক মানুষ। বড়শশী ইউনিয়নে বদেশ্বরী মন্দিরে যাওয়ার কথা ছিল তাঁদের। ঘাট থেকে কিছুদূর যাওয়ার পরই নৌকাটি ডুবে যায়। সেই থেকে মরদেহ মিলছে একের পর এক। এক-দুই-তিন করে মৃতের সংখ্যা উঠেছে ৬৯ জনে। কিছু নিথর দেহ করতোয়ায় জলে ভেসে ভেসে গেছে পাঁচ-দশ কিলোমিটার দূরে। কে নেবে এতগুলো মৃত্যুর দায়? প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি নাকি স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা?

আউলিয়া ঘাটের ওপারেই প্রাচীন বদেশ্বরী মন্দির। সনাতন ধর্মের একটি তীর্থস্থান। প্রতিবছর মহালয়া উপলক্ষে এই মন্দিরে বড় অনুষ্ঠান হয়। লোকসমাগমও হয় বেশ। আশপাশের জেলা থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা আসেন। কেউ কেউ আসেন আউলিয়া ঘাট দিয়ে করতোয়া পার হয়ে। এবারও মন্দিরে ছিল একই রকম আয়োজন। তবে ছিল না নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা।

বিবিসি বলেছে, মহালয়ার দিন বদেশ্বরী মন্দিরমুখী যাত্রীদের 'নিরাপত্তায়' জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুলিশ, দমকলকর্মী, আনসার, গ্রাম পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের করতোয়ার দুই পাড়ে রাখা হয়েছিল। ভাবতে বিস্ময় লাগে, এত 'সতর্কতা'র পরও অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে নৌকাটি ঘাট ছেড়ে গেল! ধরে নিলাম অশিক্ষিত, ধর্মীয় আবেগপ্রবণ কিছু মানুষ হুড়মুড়িয়ে নৌকায় উঠেছেন। কিন্তু আমরা, যাঁরা পুলিশ, আনসার, দমকলকর্মী বা জনপ্রতিনিধি, তাঁরা কী করলাম- শুধু চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া! অনেক চেষ্টা করেও নৌকা থেকে কাউকে নামানো যায়নি- এমন কথা হয়তো  বলা যায়, দায় এড়ানো যায়, তবে তা বিশ্বাসে নেওয়া যায় না।

আউলিয়া ঘাটে নৌকাডুবির পর উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দেন স্থানীয় দমকল বাহিনীর কর্মকর্তা শাজাহান আলী। সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, মহালয়ার দিন সকাল সাড়ে ৯টা থেকে তিনি করতোয়ার পাড়ে হ্যান্ডমাইকে যাত্রীদের সতর্ক করেছেন। নিষেধ সত্ত্বেও অনেক মানুষ নৌকাটিতে উঠে পড়েন এবং ধর্মীয় উৎসব বলে জোর করে কাউকে নামাননি। বলতেই হয়, ধর্মীয় ভাবাবেগের প্রতি দমকল কর্মকর্তার অসম্ভব 'শ্রদ্ধাবোধ'! আর সেই শ্রদ্ধার ভারে হারিয়ে গেল ৬৯টি জীবন। সত্যিই অদ্ভুত আমাদের বোধ, বুদ্ধি, বিবেচনা!

নিশ্চয় এই মৃত্যুর মূল দায় তাঁদের, যাঁরা পরিবারের কথা না ভেবে, নিষেধ অবজ্ঞা করে, ছোট্ট শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে জোর করে ডুবুডুবু নৌকায় উঠেছেন; বুঝে হোক বা না বুঝে হোক জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন। কিন্তু সনাতন সম্প্রদায়ের স্থানীয় নেতারই বা কী করলেন? মহালয়ার দিন বদেশ্বরী মন্দিরের অনুষ্ঠানে লোকসমাগমের কথা ভেবে খেয়ার নৌকার পাশাপাশি তাঁরা ছয়টি বাড়তি নৌকা প্রশাসনের কাছে চেয়েছিলেন বলে জানা যায়। পেয়েছিলেন মাঝারি মাপের তিনটি নৌকা। একেকটির দৈর্ঘ্য ১৮ থেকে ২০ ফুট। শ্যালো ইঞ্জিনচালিত। সকাল থেকে সেগুলোতেই করতোয়া পার হচ্ছিলেন মানুষ। অনুষ্ঠানের আয়োজকরা কি তখন একবারও খেয়াঘাটে দাঁড়ানোর কথা ভাবতে পেরেছিলেন?

আজ এসবই মনে পড়ছে। শুধু মনে পড়ছে না মহালয়ার সেই উৎসবের দিনগুলোর কথা। সনাতন সম্প্রদায়ের রীতি অনুযায়ী, হিসাব বলছে, বোদা-দেবীগঞ্জের গ্রামে গ্রামে এখন শ্রাদ্ধের আয়োজন। কোনো বাড়িতে বাবার শ্রাদ্ধ, কোনো বাড়িতে মায়ের, কোথাও আবার ছোট্ট দুই ভাইবোনের। কে দিচ্ছে কাকে সান্ত্বনা? মহালয়া তো শারদীয় দুর্গোৎসবের সূচনা, এই তো সামনে মূল পূজা। ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী হয়ে দশমীতে মা দুর্গার বিদায়। বটতলীর কৌশিক-রাধিকা, শালডাঙ্গার দীপন-পরিতোষ-দীপুরা কি এবার মন্দিরে যাবে?

গৌতম মণ্ডল :বার্তা সম্পাদক, সমকাল অনলাইন