মেয়েদের নিরাপত্তাহীনতা যে মোটেই ঘুচছে না- সে সংবাদ আমরা হরদম পাচ্ছি। কিছুদিন আগের কথা। কুষ্টিয়া থেকে যাত্রীবাহী একটি বাস রওনা হয়েছিল রাত্রিবেলায়; ঢাকা হয়ে নারায়ণগঞ্জে যাবে। পথিমধ্যে যাত্রী সেজে ডাকাত উঠেছে ১৩ জন। তিন ঘণ্টা ধরে সদর রাস্তায় গাড়ি নানা দিকে নিয়ে গেছে। যাত্রীদের সঙ্গে যা যা ছিল- টাকা-পয়সা, মোবাইল ফোন, স্বর্ণালংকার সব ছিনিয়ে নিয়েছে। অতিরিক্ত যেটা করেছে, সেটাও পুরোপুরি পুঁজিবাদসম্মত। দেখা গেল তাদের জন্য বড় রকমের বিপদ হয়নি, যাদের কাছে বেশি টাকা ছিল। ডাকাতরা তাদেরকে মারধর করেনি; টাকা নিয়েই অব্যাহতি দিয়েছে। প্রতিবাদ করা কারও পক্ষে সম্ভব হয়নি। তবে একটি মেয়ে প্রতিবাদ করেছিল। ডাকাতরা সবাই মিলে তাই তাকে শাস্তি দিয়েছে। তার ওপর চড়াও হয়েছে, ধর্ষণ করেছে পালাক্রমে। যেন উৎসব; লুণ্ঠনেরই।
তাহলে কী বার্তা পাওয়া গেল? হ্যাঁ, জানা গেল নারী হওয়াটা অপরাধ। নারী হলে বিপদ আছে। প্রতিবাদ করলে বড় বিপদ ঘটবে, বিশেষ করে প্রতিবাদকারী যদি নারী হয়। কিন্তু প্রতিবাদ না করলে ব্যবস্থাটা কি ভাঙবে? কী করে? ভাঙতে হলে তো প্রতিবাদ চাই। হ্যাঁ, প্রতিবাদটা হওয়া দরকার সংগঠিত ও সমবেত। ওই বাসের ২৪ জন যাত্রী যদি একসঙ্গে রুখে দাঁড়াতে পারত, ঘটনাটা তাহলে দাঁড়াত অন্য রকম। কিন্তু সেটা তো সম্ভব নয় এবং ব্যবস্থার পক্ষে টিকে থাকার জন্য সেখানেই সুবিধা।
এটাও তাৎপর্যপূর্ণ যে, মেয়েটি ছিল এক গার্মেন্ট শ্রমিক। সে তার কর্মস্থলে যাচ্ছিল। অল্প বয়স এবং শ্রমিক বলেই শক্তি ছিল প্রতিবাদের। আবার শ্রমিক বলেই নির্যাতিত। সঙ্গে টাকা-পয়সা বেশি ছিল না; তদুপরি সে প্রতিবাদ করেছে এবং সে পুরুষ নয়; মেয়েছেলে। বাস ডাকাতির ওই ঘটনা নিয়ে যখন পত্রিকায় বেশ একটা শোরগোল চলছিল; তার মধ্যেই খবর পাওয়া গেল গাজীপুরে রাতের বাসে স্বামীকে পিটিয়ে ফেলে দিয়ে স্ত্রীকে ধর্ষণ করেছে বাসের চালক, হেলপার ও অজ্ঞাতপরিচয় তিনজন। গোটা ব্যবস্থাই তো অভিশপ্ত। অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া চাই- আমরা বলব; আমরা বলছি, লিখছি। কিন্তু তাতে কুলাবে কি? পুরো ব্যবস্থাটাই যখন হয়ে দাঁড়িয়েছে মানবতাবিরোধী এবং অপরাধকারী?
নারীর প্রতিবাদের প্রসঙ্গ উঠলে স্মরণে আসে ফরাসি দেশের সেই আশ্চর্য মেয়ে জোন অব আর্কের কথা। মেয়েটি কৃষক পরিবারের সন্তান। প্রায় ৭০০ বছর আগের ঘটনা। সে দেখেছিল, তার দেশে ঘোরতর জুলুমবাজি চলছে। দেশের মাটিতে অন্যায্য যুদ্ধ। বিদেশি ইংরেজরা দেশের কিছু অংশ দখল করে ফেলেছে। তার বয়স তখন মাত্র ১৭। সে যুদ্ধে চলে গেছে। বেশ নিয়েছে পুরুষের। সামনে থেকেছে নিজের বাহিনীর। তার বুদ্ধিদীপ্ত ও দুঃসাহসী অভিযানে বিজয় অর্জিত হয়েছে একের পর এক। শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে গেছে সে ইংরেজদের পক্ষ নেওয়া লোকদের হাতে। তারা তাকে ইংরেজদের কাছে বিক্রি করে দেয়। এর পর ফরাসি ধর্মযাজকরা এগিয়ে আসে ধর্মদ্রোহের অভিযোগে তাকে বিচার করতে। বিচারে ডাইনি বলে অভিহিত করে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাকে মারা হয়েছিল পুড়িয়ে।


ফরাসি দেশে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পরে, নেপোলিয়ন যখন ক্ষমতায় আসেন সেই সময়ে; জোন অব আর্কের ভাবমূর্তি বদলে যায়। ফরাসিদের জাতিগত সত্তার একজন প্রতিনিধি হিসেবে তাকে গণ্য করা শুরু হয়। শত্রুর বিরুদ্ধে জাতীয় প্রতিরোধেরও সে প্রবাদপ্রতিম প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী হিসেবে বিশ্বজুড়ে তার খ্যাতিলাভ ঘটে। শুধু তাই নয়; ক্যাথলিক চার্চের যে অভিভাবকরা ধর্মদ্রোহী হিসেবে একদিন কিশোরীকে পুড়িয়ে মেরেছিল; ঘটনার ৪৮৮ বছর পর; ১৯২০ সালে তারাই তাকে ক্যাথলিক গির্জার একজন সন্ত (সেইন্ট) হিসেবে অভিষিক্ত করেছে।
সবই তো হলো। কিন্তু যে পিতৃতান্ত্রিকতার অপারগতা ও কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে নারী হিসেবে জোন অব আর্ক উঠে দাঁড়িয়েছিল এবং যে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গিয়ে দেশপ্রেমিক মানুষের জন্য সে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছিল; সেই ব্যবস্থার তো পতন ঘটল না। শতবর্ষের যুদ্ধ শেষ হয়েছে। ফরাসি দেশে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক সমাজ বিপ্লবও ঘটেছে। কিন্তু পিতৃতান্ত্রিকতা তো রয়েই গেছে। জোন অব আর্ক যে পুরুষের পোশাক পরত; তার দুটি কারণের কথা সে নিজেই বলেছে। একটি যুদ্ধের জন্য ওই পোশাকের উপযোগিতা; অন্যটি যৌন হয়রানি থেকে বাঁচার উপায়। যখন সে ইংরেজদের হাতে বন্দি, সেই অবস্থায় সল্ফ্ভ্রান্ত এক ইংরেজ তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছিল। নারীর জন্য ওই বিপদ তো আজও রয়ে গেছে। তাৎপর্যপূর্ণ এই ঘটনাটিও যে, জোনকে আটক করেছিল ইংরেজদের সমর্থক যে ফরাসি বাহিনী; নগদ অর্থের বিনিময়ে তারা তাকে তুলে দিয়েছিল দেশের শত্রু ইংরেজদের হাতে। মেয়েটি বিক্রি হয়ে গিয়েছিল, পণ্য যেভাবে বিক্রি হয়। অর্থের কত জোর! দেশপ্রেম কত অসহায়!
সামন্তবাদ গেছে; রাজতন্ত্রও এখন আর নেই। কিন্তু স্বৈরশাসন রয়ে গেছে বিবিধ বেশে ও ছদ্মবেশে। অর্থের আধিপত্য তখনও ছিল, এখনও আছে। এখন বরং বহু মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান বিশ্বে মানুষের পক্ষে মানুষের মতো বাঁচার লড়াইটা ওই পিতৃতান্ত্রিক ও অর্থ-শাসিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই।
এ ব্যবস্থার হাত থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজন সামাজিক বিপ্লব। সে বিপ্লব আমাদের দেশে ঘটেনি। এমনকি সামাজিক বিপ্লব ঘটাও তো যথেষ্ট নয়। সামাজিক বিপ্লব তো ইরানেও ঘটেছে। বাদশাহী স্বৈরশাসনের অবসান ঘটেছে, গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে। কিন্তু ক্ষমতা তো নিয়ে গেছে কট্টর দক্ষিণপন্থি ধর্মীয় 'বিপ্লবী' গোষ্ঠী। সেই ইরানে 'ঠিকমতো' হিজাব পরেনি এবং নিজের অধিকারের কথা বলেছে বলে একজন তরুণীকে পিটিয়ে মেরেছে নীতি পুলিশ বাহিনী। প্রতিবাদে হাজার হাজার নারী-পুরুষ রাজপথে নেমেছে। সেখানেও চলছে হত্যা। মৃতের সংখ্যা শতকের ঘর ছুঁই ছুঁই। তবুও প্রতিবাদ থামেনি।
ইরানে বামপন্থিরা ছিলেন; সংশোধনবাদী বামপন্থিরা ছিলেন দলে বেশ ভারী। কিন্তু তাঁরা সাহস করেননি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে। আর যাঁরা সত্যিকার কমিউনিস্ট বিপ্লবী ছিলেন, তাঁরা সুসংগঠিত ছিলেন না। বিভাজন ছিল। আর ছিল দক্ষিণপন্থি ধর্মীয় 'বিপ্লবী' এবং বুর্জোয়াদের সমবেত আক্রমণ। ইরানের বিপ্লব তাই ছিনতাই হয়ে গেছে। আর দখলদাররা টিকেও আছে নারীবিরোধী ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে।
এই ব্যবস্থার পরিবর্তনে বিপ্লব চাই। কিন্তু বিপ্লব তো মুখের কথায় ঘটবে না। বিপ্লবটা অবশ্যই হবে রাজনৈতিক। এ জন্য ব্যাপক ও গভীর সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি দরকার। নারীকে ঘরে রেখে, নির্যাতিত রেখে সেটা সম্ভব নয়। বরং নারীকেও হতে হবে প্রতিবাদী। রাতের পরিবহনে ডাকাতদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো নাম না-জানা মেয়েটি প্রতিবাদের ওই কাজটিই করেছিল। ইরানে নিহত তরুণীর নাম আমরা জেনেছি- মাহসা আমিনি। তাঁরা দু'জনই জোন অব আর্কের উত্তরসূরি। তাঁরা তিনজনই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে জীবন দিয়েছেন।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়