নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মাহমুদাবাদে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পার্শ্ববর্তী সবজি বাজারে রবিবার চলন্ত ট্রাক উল্টাইয়া ১০ জন হতাহতের যে ঘটনা ঘটিয়াছে, তাহা বেদনাদায়ক হইলেও মোটেও বিস্ময়কর নহে। সোমবার সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে- ঢাকা হইতে ভৈরবগামী সবজিবাহী ট্রাকটি মাহমুদাবাদে একটি যাত্রীবাহী অটোরিকশাকে চাপা দিয়া নিয়ন্ত্রণ হারায়। ইহার পর ট্রাকটি পার্শ্ববর্তী সবজি বাজারে ঢুকিয়া উল্টাইয়া যায়।

প্রথমত, ট্রাকটি চলিতেছিল বেপরোয়া গতিতে। দ্বিতীয় বিষয় হইল, উচ্চ আদালতের নির্দেশের পাশাপাশি আজ অবধি একাধিকবার জারিকৃত সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, মহাসড়কে কোনো ধরনের ধীরগতির ও তিন চাকার যান চলিবার কথা নহে; কিন্তু ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের মাহমুদাবাদ অংশে তিন চাকার অটোরিকশা দিব্যি চলিতেছিল। তৃতীয় বিষয় হইল, ঐ একই নির্দেশনা অনুযায়ী মহাসড়কের পার্শ্বে কোনো বাজার বা দোকানপাটের অবস্থান আইনবিরুদ্ধ।

কিন্তু স্থানীয়দের ভাষ্য, মাহমুদাবাদের ওই সবজি বাজার দীর্ঘদিন ধরিয়া চলিয়া আসিতেছে। যেখানে এই তিনটা অনিয়মের একটাই প্রাণঘাতী কোনো সড়ক দুর্ঘটনা ঘটাইবার জন্য যথেষ্ট সেখানে রবিবারের ঐ দুর্ঘটনার সময় একসঙ্গে তিনটি অনিয়মই ঘটিয়াছে। শুধু তাহাই নহে, প্রতিবেদন অনুসারে, গত ৩০ জুন একটি কাভার্ডভ্যান নিয়ন্ত্রণ হারাইয়া ঐ একই বাজারে ঢুকিয়া পড়িলে পাঁচজন সবজি বিক্রেতা প্রাণ হারান। ইহার পরিপ্রেক্ষিতে এলাকাবাসী অবৈধ বাজারটি অবিলম্বে উচ্ছেদের দাবি জানাইয়াছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্থানীয় প্রশাসন তাহাতে কর্ণপাতই করে নাই। আবার সড়ক-মহাসড়কের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে নিযুক্ত হাইওয়ে পুলিশও এতদ্‌বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে নাই। এই সব বিষয় বিবেচনা করিলে অবশ্য রবিবারের ঘটনাকে দুর্ঘটনা না বলিয়া অবলীলায় সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড বলাই শ্রেয়।

সড়ক দুর্ঘটনা লইয়া দেশে একাধিক সমীক্ষা আছে, যেখানে প্রতি বৎসর সংঘটিত অর্ধেক সংখ্যকের অধিক সড়ক দুর্ঘটনার জন্য চালকের বেপরোয়া আচরণকে দায়ী করা হইয়াছে। কিন্তু দুঃখজনক হইলেও সত্য, পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাইতে সরকার অদ্যাবধি দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে নাই। বলা হইতে পারে, আমাদের দেশের বিদ্যমান আর্থসামাজিক বাস্তবতায় সাধারণত যাহারা গাড়ি চালনাকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করিয়া থাকেন, তাহাদের প্রায় সবাই নিম্নআয়ের অধিকারী। শিক্ষাদীক্ষাও তাহাদের অধিকাংশের নাই বলিলেই চলে। এই বিপুলসংখ্যক চালককে প্রচলিত ট্রাফিক আইন ও বিধিমালা সম্পর্কে যথাযথভাবে শিক্ষিত করিতে হইলে যে রূপ কর্মযজ্ঞ পরিচালনা বাঞ্ছিত, তাহা সময়সাপেক্ষ। কিন্তু মহাসড়কে ধীরগতির বা তিন চাকার যান চলাচল বন্ধ করিবার জন্য সংশ্নিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব সম্পাদনে আন্তরিকতা ভিন্ন আর কিছুই প্রয়োজনীয় নহে। প্রায় একই কথা মহাসড়কের পার্শ্ববর্তী বাজার বা অনুরূপ কোনো স্থাপনা উচ্ছেদের বেলায়ও প্রযোজ্য।

ইহা স্বীকার করিতে আমাদের দ্বিধা নাই যে, আমাদের দেশটা বিশ্বের সবচাইতে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বহু হাটবাজার রহিয়াছে, যেগুলি সংশ্নিষ্ট এলাকায় মহাসড়ক নির্মাণের বহু পূর্ব হইতেই সচল; সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইত্যাদি কারণে ইচ্ছা করিলেই তাৎক্ষণিক উচ্ছেদ করা সম্ভব নহে। আবার মহাসড়কের পার্শ্বে ব্যক্তি ও সামাজিক মালিকানাধীন বহু স্থাপনা বিদ্যমান, যেগুলি উচ্ছেদ করাও সময়সাপেক্ষ। কিন্তু আলোচ্য বাজারটির মতো বিভিন্ন মহাসড়কের পার্শ্ববর্তী অবৈধ বাজারগুলি উচ্ছেদের জন্য কোনো সময়ই লাগিবার কথা নহে। উপরন্তু এলাকাবাসীর সমর্থন থাকিবার কারণে কাজটা আরও সহজ হইয়া যাওয়ার কথা। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করিতেছি, স্থানীয় প্রশাসন এবং হাইওয়ে পুলিশ এই সহজ কাজটি সম্পাদনে আবশ্যকতা দেখাইতেছে না। ইহার অর্থ হইল- 'ডাল মে কুছ কালা হ্যায়'।

সাধারণত নিয়মিত জনসমাগম হয় এমন জায়গায়- তা লোক বা যান চলাচলে যতই সমস্যা তৈরি করুক; এই ধরনের অবৈধ বাজার স্থাপন করিয়া থাকে এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিগণ। রাজনৈতিকভাবেও তাহারা প্রভূত ক্ষমতা ভোগ করিয়া থাকেন। আর অধিকংশ ক্ষেত্রেই এই কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর সহিত স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক ধরনের অশুভ আঁতাত গড়িয়া ওঠে। মাহমুদাবাদের বাজারটির পশ্চাতেও এই ধরনের কোনো আঁতাত ক্রিয়াশীল বলিয়া আমাদের সন্দেহ অমূলক নহে। যাহাই হউক, আমরা মনে করি, শুধু মাহমুদাবাদ নয়; দেশের আরও যেসব মহাসড়কের পার্শ্বে এই ধরনের অবৈধ বাজারে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলিতেছে, তাহার সমুদয় দ্রুত উচ্ছেদ করা আবশ্যক।