বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতে আধুনিক সংবাদপত্র বিনির্মাণের পথিকৃৎ পুরুষ দৈনিক বাংলার সম্পাদক তোয়াব খানের মৃত্যুর (১ অক্টোবর) মধ্য দিয়ে একটি আলোকিত অধ্যায়ের যবনিকাপাত ঘটল। জীবন্ত কিংবদন্তি তোয়াব খান ছিলেন এ দেশের গণমাধ্যমের সৎ-নিষ্ঠাবান তথা আদর্শবাদী, মোহমুক্ত সাংবাদিকতার সর্বশেষ বাতিঘর।
আজ থেকে তিন দশক আগে দৈনিক জনকণ্ঠ যে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত একটি শ্রেষ্ঠ প্রগতিশীল দৈনিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পেরেছিল; সেটা সম্ভব হয়েছিল শুধু ওই অনন্য কারিগর ব্যক্তির নেতৃত্বের কারণেই। ১৯৯৩ সালে সম্পাদক-প্রকাশক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আতিকউল্লাহ খান মাসুদ বিনা বাক্যব্যয়ে একটি উন্নত দৈনিকের জন্য তোয়াব খানের প্রতিটি পরামর্শ গ্রহণ করেছিলেন; আর তিনি একটি অসাধারণ দৈনিক জন্ম দিয়েছিলেন। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী আমরা অনেকে এখনও জীবিত। সরকারি ট্রাস্টের নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ চাকরি ছেড়ে দিয়ে শুধু দক্ষ কারিগর তোয়াব খানের অধীনে কাজ করার লোভেই দৈনিক বাংলা ছেড়ে আমার মতো আরও অনেকেই জনকণ্ঠে যোগ দিয়েছিলেন।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৯৯৩ সালের জানুয়ারিতে জনকণ্ঠে আসার আগেই তোয়াব খানের ক্যারিশমা জানতাম। ষাটের দশকে তিনি ছিলেন দৈনিক সংবাদের বার্তা সম্পাদক। ১৯৬৪ সালে দৈনিক পাকিস্তানে যোগ দিয়েছিলেন।
বার্তা সম্পাদক হিসেবে বাংলাদেশে তোয়াব খানের তুলনা তিনি নিজেই। দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায় ফিচার পরিকল্পনায় রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন তিনি। ১৯৭১-এ দৈনিক বাংলার বার্তা সম্পাদক সাহসী সাংবাদিক তোয়াব খান জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। স্বাধীন বাংলা বেতারে তাঁর কথিকা 'পিন্ডির প্রলাপ' আজও প্রবীণদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
মুক্তিযুদ্ধ শেষে কলকাতা থেকে ফিরে আসার পর দৈনিক পাকিস্তান নাম পরিবর্তিত হয়ে দৈনিক বাংলায় রূপান্তরিত হলে প্রথম সম্পাদক পদে বঙ্গবন্ধু-সরকার তাঁকে নিয়োগ দেয়। ১৯৭৩ সালে পুলিশের গুলিতে ছাত্র নিহতের ঘটনার জেরে দৈনিক বাংলার একটি টেলিগ্রাম প্রকাশ করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিলেন তোয়াব খান। এর পর বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রেস সচিব পদে নিয়োগ দিয়ে আরও কাছে টেনে নেন তোয়াব খানকে।
আপাদমস্তক পেশাদার সাংবাদিক তোয়াব খান কোনো রকম দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কখনও কাজ করেননি। প্রচারবিমুখ তোয়াব খান অর্থবিত্তের প্রতিও নির্বিকার থাকার কারণে সাংবাদিকতার শীর্ষ পর্যায়ের দায়িত্ব পালন এবং তিনজন সরকারপ্রধানের প্রেস সচিবের দায়িত্ব পালন করেও কোনো রকম সহায়-সম্পদ, অর্থবিত্ত এমনকি একটি ব্যক্তিগত গাড়িরও মালিক হতে পারেননি। দীর্ঘ জীবনে অনৈতিকতার কোনো রকম কালিমা তাঁর নামের আগে লাগতে দেননি। সর্বশেষ ১৯৯০-এর ডিসেম্বরে এরশাদ সরকারের পতনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ তাঁকে প্রেস সচিবের দায়িত্ব দেন।
নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে তোয়াব খানের অবস্থা ত্রিশঙ্কু হয়ে পড়ে। এমন অবস্থা হয়েছিল ১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরও। তাঁকে প্রেস উইংয়ে নেয়নি জিয়ার সরকার। তথ্য মন্ত্রণালয়ে ফিরে যান তিনি। কাজ করেন তথ্য অধিদপ্তরে।
দীর্ঘ ১৯ বছর পর সচিব পদমর্যাদার মানুষটি যখন ১৯৯১ সালে আবার দৈনিক বাংলার সম্পাদক হলেন, তখন তাঁর ডিমোশন দেখে অনুরাগীরা বিষণ্ণ বোধ করেছিলেন। তার পরও শেষ রক্ষা হয়নি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছবির পাশে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার ছবি এবং নিউজ প্রথম পাতায় ছাপানোর ধকল এতটাই ছিল; জেনারেল জিয়াউর রহমানের আপন চাচাতো ভাই দৈনিক বাংলার তৎকালীন নির্বাহী সম্পাদক ফওজুল করিমও (তারা ভাই) বোঝাতে পারেননি সরকারকে- এতে পত্রিকার গ্রহণযোগ্যতা এবং মানও বাড়ে।
মাত্র এক বছরের মধ্যে মৃতপ্রায় দৈনিক বাংলাকে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিলেন তোয়াব খান। ফিচার পাতাগুলোকে এমন নতুন আঙ্গিকে আবার সাজালেন, শনৈঃ শনৈঃ সার্কুলেশন বাড়তে লাগল। তাঁর তত্ত্বাবধানেই আমার দায়িত্বের ক্ষেত্রও বদল হলো। আবারও সাহিত্য ও ফিচার বিভাগে কাজ করার সুযোগ পাই আমি।
কিন্তু বেশি দিন থাকতে পারলেন না তোয়াব খান। একদিন অকস্মাৎ তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি এলো তাঁর চাকরি অবসানের। বিনা বাক্যব্যয়ে তিনি চলে গেলেন নিঃশব্দে। সরকারের এহেন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে নির্বাহী সম্পাদক ফওজুল করিম তারা ভাইও সেদিন তাঁর পিছু পিছু অফিস থেকে বেরিয়ে গেলেন; আর ফিরলেন না।
এর কয়েক মাস পরেই প্রকাশিতব্য নতুন দৈনিক জনকণ্ঠে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। সহকারী সম্পাদক। কিন্তু সাহিত্য সাময়িকী পাতাও দেখে দিতে হবে।
সেই থেকে টানা ১৫ বছর একসঙ্গে তাঁর স্নেহের ছায়ায় থেকে দেখেছি, কী অসাধারণ তাঁর সম্পাদনার দক্ষতা! কী নিখুঁত তাঁর দূরদর্শী পরিকল্পনা! কী বিস্তৃত তাঁর পড়াশোনার পরিধি! বিস্মিত হয়েছি। ইংরেজি যেন তাঁর মাতৃভাষা! তাঁর মতো সুইফট রিডারও কাউকে আর দেখিনি। বিশ্বরাজনীতি, ইতিহাস, দর্শন, বাংলা সাহিত্য, সমাজতান্ত্রিক পৃথিবীর উত্থান-পতন সবকিছু ছিল তাঁর নখদর্পণে! সাহিত্য জানতেন বাংলার অধ্যাপকের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
ফলে তিনি যে সম্পাদকীয় গাইডলাইন দিতেন, ব্রিফিং দিতেন; ফিচারের কোন পাতা কীভাবে সাজাতে হবে, যে ধারণা দিতেন, তা বিস্ময়কর। দৈনিক জনকণ্ঠের এ টু জেড দেখে দিতেন তিনি। সকাল ১০টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতেন। মাঝখানে শুধু লাঞ্চের বিরতিতে বাড়ি যেতেন।
পত্রিকাটির প্রথম পাতায় অনুসন্ধানী রিপোর্ট চালু করলেন- 'সেই রাজাকার'! সরকারের দোষ-ত্রুটি, দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ে প্রতিদিন প্রথম পৃষ্ঠার প্রতিবেদন 'সাধু সাবধান' পেয়ে যায় বিপুল জনপ্রিয়তা। এ রকম আরও কত কী যে তিনি যুক্ত করেছেন ঢাকার পত্রিকায়, কেউ আগে তা কখনও কল্পনা করেননি।
তোয়াব ভাই জানতেন, কাকে দিয়ে কী কাজ হবে। জানতেন, মুক্তিযুদ্ধজয়ী বাংলাদেশে প্রগতিবিমুখ কোনো পত্রিকা দাঁড়ায় না। তাই যোগদানের সঙ্গে সঙ্গেই প্রবীণ-নবীনের মেলবন্ধনে প্রতিভাবান সাংবাদিকদের জড়ো করেছিলেন জনকণ্ঠে।
নিয়োগের ক্ষেত্রেও নিরপেক্ষ নির্মোহ পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছেন তিনি। তাঁর বিপরীত চিন্তার লোকদেরও যোগ্য বিবেচনা করে নিয়োগ দিয়েছিলেন তিনি।
তোয়াব খান না এলে হয়তো এই পত্রিকাটি ক্ষণায়ু কোনো অখ্যাত দৈনিকের ভাগ্য বরণ করত। ফকিরাপুলের একটি অখ্যাত আন্ডারগ্রাউন্ড সাপ্তাহিককে দৈনিকের ডিক্লারেশন নিয়ে যে উচ্চতায় তিনি
প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি ১৯৯৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির আগে।
বিএনপি নেতা প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার হামিদুল্লাহ খান, যিনি প্রকাশক-সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত ও সম্পাদক মোহাম্মদ আতিকউল্লাহ খান মাসুদের অগ্রজ ছিলেন। নিয়োগ প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল বিএনপি ঘরানার সাংবাদিকদের দিয়েই। তোয়াব ভাই যোগদানের আগেই এ ধরনের অনেক সংবাদকর্মী নিয়োগ পেয়ে যান। তখন পত্রিকাটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বোরহান আহমেদকে। পত্রিকাটি বেরোবে বেরোবে করছে, কিন্তু বের হচ্ছে না। বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে।
নিরপেক্ষতা বোঝাতে জিয়াউর রহমানের ছবি বঙ্গবন্ধুর সমান মর্যাদায় পাশাপাশি স্থাপন করা হয়েছিল অফিসের প্রবেশমুখে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর এক সময়ের প্রেস সচিব তোয়াব খান জনকণ্ঠে যোগদানের সঙ্গে সঙ্গে নিরপেক্ষতার হাস্যকর এই ভ্রান্ত ধারণা ভেঙে দেন।
বাংলাদেশের বরেণ্য সাংবাদিক ওবায়দুল হক, এবিএম মূসা, আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী, কবি-কথাশিল্পী সৈয়দ শামসুল হক, কবি শামসুর রাহমান, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, ড. মুনতাসীর মামুন, ওয়াহিদুল হক, আবেদ খানসহ দেশের প্রগতিশীল লেখকদের নিয়মিত কলামিস্ট হিসেবে জনকণ্ঠে সমাবেশ ঘটান দূরদর্শী উপদেষ্টা সম্পাদক তোয়াব খান। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে লড়াকু একটি উজ্জ্বল পত্রিকা হিসেবে দেশে-বিদেশে বিপুল জনপ্রিয়তা এবং খ্যাতি লাভ করে জনকণ্ঠ। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত অনেক লেখক এখানে কলাম, উপন্যাস, গল্প-কবিতা লিখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে লিখতে গিয়ে বিএনপি সরকারের রোষানলে পড়ে এ পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক তোয়াব খান, নির্বাহী সম্পাদক বোরহান আহমেদ এবং সহকারী সম্পাদক এটিএম শামসুদ্দিন বৃদ্ধ বয়সে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি জীবনযাপন করতে বাধ্য হন।
ততদিনই এই পত্রিকা বিপুলভাবে জনপ্রিয় ছিল, যতদিন প্রকাশক সাংবাদিকতা বোঝার চেষ্টা করেননি। যেদিন থেকে বোঝার চেষ্টা করেছেন, সেদিন থেকে ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে থাকে জনকণ্ঠ।
ওয়ান-ইলেভেনের আগে-পরে একাধিক বড় গ্রুপ থেকে আমন্ত্রণ এসেছিল উপদেষ্টা সম্পাদক নয়; সম্পাদক হিসেবেই জনকণ্ঠের চেয়ে চার গুণ বেতনে যোগদানের। নির্মোহ-নির্লোভ তোয়াব খান বেশি বেতনের কথা ভাবেননি; দৈনিক জনকণ্ঠ ছেড়ে যাননি।
নাসির আহমেদ :কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক