বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গৌরব একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। এর মূলে ছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনা। এই চেতনা বাঙালির রক্তে মিশে আছে। তাই তো ধর্মের ভিত্তিতে গড়া রাষ্ট্র পাকিস্তান টিকতে পেরেছিল মাত্র ২৪ বছর। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে একটি ধর্ম-রাষ্ট্র থেকে জন্ম হয়েছিল জাতি-রাষ্ট্রের।
আমরা অনেকে ধর্ম আর জাতিকে গুলিয়ে ফেলি। যেমন আমি ধর্ম-পরিচয়ে মুসলমান, কিন্তু জাতি-পরিচয়ে বাঙালি। সৌদি আরবের একজন মুসলমান ধর্ম-পরিচয়ে মুসলমান হলেও জাতিতে আরব। ধর্মীয় আচার অভিন্ন হলেও দুই জাতির সংস্কৃতি সম্পূর্ণ আলাদা।
অসাম্প্রদায়িকতা বা ধর্মনিরপেক্ষতাকে অনেকে ধর্মহীনতা বলেন। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা হলো রাষ্ট্রে সব ধর্ম সমান অধিকার পাবে। একাত্তরে এই চেতনাতেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি অসাধারণ স্লোগান ছিল। অল্প কথায় যা আমাদের মূল চেতনাকে ধারণ করে- 'বাংলার হিন্দু, বাংলার খ্রিষ্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান; আমরা সবাই বাঙালি।' এটাই আমাদের চেতনা। ধর্মের সঙ্গে জাতীয়তার কোনো বিরোধ নেই। ধর্মের সঙ্গে উৎসবের কোনো বিরোধ নেই। ক'দিন আগে নারী ফুটবল দল সাফ জয় করে এলো। সেই দলে মুসলমান আছে, হিন্দু আছে, বৌদ্ধ আছে। বাঙালি আছে, আদিবাসী আছে। এটাই আসল বাংলাদেশ, আসল সৌন্দর্য।
মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাংলাদেশের সংবিধানেও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ঠাঁই হয়েছিল। ধর্মনিরপেক্ষতা আমাদের সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি। কিন্তু সামরিক শাসকরা বারবার নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তবে এ দেশের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ সব সময় এর প্রতিবাদ করেছে। কার কী ধর্ম- সেটা ভুলে আনন্দ-বেদনায় একে অন্যের পাশে থেকেছে। উৎসব-পার্বণ একসঙ্গে উদযাপন করেছে।
আশির দশকে একটি জনপ্রিয় স্লোগান ছিল- 'ধর্ম যার যার উৎসব সবার'। এ স্লোগানটিই আমাদের মৌলিক চেতনাকে ধারণ করে। এটি শুধু কথার কথা নয়; বাংলাদেশের সমাজ-বাস্তবতা। ছেলেবেলা থেকেই আমরা দেখে আসছি, ঈদের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতাটুকু মুসলমানের; উৎসব সবার। পূজার ধর্মীয় আচারটুকু হিন্দুদের; উৎসব সবার। ঈদের সেমাই, পূজার নাড়ু সবার ঘরেই পৌঁছে যায়।
শারদীয় দুর্গোৎসব বাংলাদেশের হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। কিন্তু প্রতিবারই দুর্গাপূজা উৎসবের পাশাপাশি শঙ্কাও নিয়ে আসে। নানা জায়গায় প্রতিমা ভাঙচুরের খবর আসে। সাম্প্রদায়িক অপশক্তি নানাভাবে সম্প্রীতি বিনষ্টের অপচেষ্টা করে। কখনও ফেসবুকে গুজব ছড়িয়ে, কখনও ধর্ম অবমাননার ধুয়া তুলে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সৃষ্টি করে। একতরফা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় সংখ্যালঘুরা। সংখ্যালঘুর এই নিরাপত্তাহীনতা সংখ্যাগুরুর জন্যই লজ্জার; ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জন্য গ্লানির। যে দেশের সংখ্যালঘু যত ভীত, যত নির্যাতিত; ধরে নিতে হবে- সে দেশের সংখ্যাগুরু তত অসংবেদনশীল। সংখ্যাগুরুরই দায়িত্ব সংখ্যালঘুর অধিকার নিশ্চিত করা। তাঁদের পাশে দাঁড়ানো; অভয় দেওয়া।
বিভিন্ন সময়ে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার চিত্র দেখে অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশ বুঝি তার মূল চেতনা থেকে সরে গেছে। বাস্তবতা হলো, সাম্প্রদায়িক অপশক্তি সংখ্যায় অল্প। তারা আঁধারে লুকিয়ে থাকে। তারা ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে একটা ভুয়া স্ট্যাটাস দিয়ে পরিস্থিতি নষ্ট করে। ধর্মীয় গোঁড়ামি তো আছেই; অনেকে সংখ্যালঘুদের জমি দখল করতে, কোণঠাসা করতেও পরিকল্পিতভাবে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। কিন্তু এই সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের রুখে দাঁড়ানোর চিত্র আমাদের আশাবাদী করে। মুসলমান তরুণরা পূজামণ্ডপ পাহারা দেয়। একই ক্যাম্পাসে মসজিদ এবং মন্দিরের অবস্থান অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চেতনাকেই বারবার ঊর্ধ্বে তুলে ধরে।
গত বছরের চেয়ে এবার ৫০টি বেশি অর্থাৎ ৩২ হাজার ১৬৮টি মণ্ডপে পূজা হচ্ছে উৎসবমুখর পরিবেশে। সরকার এবারও পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিয়েছে। আমরা যদি সবাই মিলে নির্বিঘ্নে উৎসবটা পালন করতে পারি, সেটা হবে সবচেয়ে ভালো।
এই যে সারাদেশে এত মণ্ডপে পূজা হচ্ছে; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থনীতির প্রশ্নও। কয়েকশ' কোটি টাকা লেনদেন হয় পূজার বাজারে। দুর্গাপূজা হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলেও এর অর্থনীতিতে মুসলমানদের অংশগ্রহণও কম নয়। গত চার বছর ধরে কারওয়ান বাজার মিডিয়াপাড়ায় শারদীয় দুর্গোৎসবের আয়োজনে সম্পৃক্ত থেকে দেখেছি- ডেকোরেটর, লাইটিং, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা আয়োজনে মুসলমানদের সম্পৃক্ততাই বেশি।
মিডিয়াপাড়া দুর্গোৎসবের প্রথম আয়োজনের সময় আমরা ভাবলাম, যেহেতু কারওয়ান বাজারে আয়োজন, তাই সেখানকার ব্যবসায়ীদেরও সঙ্গে নেওয়া দরকার। ব্যবসায়ী নেতারা যেদিন অফিসে এলেন; আমাদের আশঙ্কা ছিল- তাদের কেউ কেউ পূজার আয়োজনকে নিরুৎসাহ করবেন না তো! কিন্তু সে আশঙ্কা অমূলক প্রমাণিত হতে কয়েক মিনিট মাত্র লেগেছিল। ব্যবসায়ী নেতা ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা বিপুল উদ্যমে উৎসব আয়োজনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। প্রতি রাতেই কারওয়ান বাজারে সবজিবাহী ট্রাকের লাইন লেগে যায়। ব্যবসায়ীরা সেই লাইন ঘুরিয়ে দিলেন অন্যদিকে। শৃঙ্খলা রক্ষায় নিজেরাই স্বেচ্ছাসেবী হয়ে গেলেন। পূজার খাবারের জন্য ব্যবসায়ীরা সানন্দে পণ্য সরবরাহ করলেন। দুর্গোৎসবে যেন কারওয়ান বাজারজুড়েই উৎসবের বান ডাকে। এটাই আসলে বাংলাদেশ; এটাই সর্বজনীনতা।
অসাম্প্রদায়িকতা কিন্তু সব ধর্মেরও মূল কথা। কোনো ধর্মেই অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষের কথা নেই। সব ধর্মই পরমতসহিষুষ্ণতা, পরধর্মকে শ্রদ্ধা করতে শেখায়। অল্প কিছু সাম্প্রদায়িক অপশক্তি সংঘাত সৃষ্টি করে আসলে ধর্মেরই অবমাননা করে। ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশে কোনোদিন এই অপশক্তির ঠাঁই হবে না। তবে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে এই অন্ধকারের শক্তি কোনোভাবেই আমাদের সম্প্রীতির চিরায়ত চিত্রটি নষ্ট করতে না পারে। শরতে সাদা মেঘের ভেলায় চড়ে যেন শুধু উৎসবই আসে; শঙ্কা নয়।
প্রভাষ আমিন :সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক