আমাদের দেশের রপ্তানি নির্ভর করছে ইউরোপীয় দেশগুলো ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর। ওইসব দেশে এখন এক ধরনের মন্দা চলছে। তাই সেখানে চাহিদা কমছে। এখন এর প্রতিকার হিসেবে আমাদের রপ্তানির বাজার পরিবর্তন করতে হবে। ভারতীয় বাজার, চীনা বাজার, কোরিয়ান বাজারসহ আরও যেখানে বাজার ধরা যায়, সেদিকে সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। চীনা ও ভারতীয় বাজারে আমাদের অনেক সুযোগ রয়েছে। তবে অবাক হওয়ার মতো একটি বিষয় হলো, আমাদের রপ্তানিকারকরা সেদিকে যেতে চান না। কেন এমনটা চলে আসছে, তা পরিস্কার নয়।
চীনা বাজারের কথা এ জন্য বলছি, সেখানকার বাজার এখন অনেক বড়। পাশাপাশি চীনা মুদ্রা ইউয়ান এখন বিশ্ববাজারে বেশ পরীক্ষিত ও ভালো অবস্থানে রয়েছে। তাই চীনা মুদ্রায় ব্যবসা করলে তো ক্ষতি নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক এটাকে গ্রহণ করেছে। চীনারা যদি আমাদের এখান থেকে পণ্য ক্রয় করে, তাহলে চীনা মুদ্রা দেশে আসবে। এতে সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিই শক্ত অবস্থানে যাবে। তাই চীনা বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধির একটি সুযোগ রয়েছে। এটাকে এখন দ্রুত কাজে লাগাতে হবে।
রাশিয়ান বাজারে ইউক্রেন যুদ্ধের একটি প্রভাব পড়েছে এরই মধ্যে- স্বীকার করতে হবে। তবুও সরকারকে চেষ্টা করতে হবে রাশিয়ান বাজার ধরতে। রুবলের মান এখনও এগিয়ে। অর্থাৎ বাংলাদেশের পক্ষে বিদেশি অর্থ দেশে আনতে যে বৈধ পথ রয়েছে, তা বাড়াতে হবে। রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের মাধ্যমেই মূলত দেশে বিদেশি অর্থ প্রবেশ করে। এসব দিকে এখন মনোযোগী হতে হবে; গুরুত্ব বাড়াতে হবে।
ওদিকে সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রের খবরে প্রকাশ- চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে রেমিট্যান্স কমেছে ১১ শতাংশ। কিন্তু এই রেমিট্যান্স কমে যাওয়া নিয়ে এখনই মন্তব্য করা উচিত হবে না। অন্তত তিন মাস এটাকে দেখতে হবে। আগামী তিন মাস যদি এভাবেই কমতে থাকে, তবে ব্যবস্থা নিতেই হবে। এক মাস বৈদেশিক আয় দেখেই সবকিছু নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। এভাবে যদি তিন মাস কমতে থাকে, তবে বুঝতে হবে- বিপর্যয় আসতে পারে। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, আগস্ট মাস পর্যন্ত আট লাখ লোক বিদেশে গেছেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে অনেক বাংলাদেশি গেছেন। তাঁরা গিয়ে যখন রেমিট্যান্স পাঠাতে থাকবেন, তখন পরিস্থিতি ঘুরে যেতে পারে।
এখানে একটি বিষয় রয়েছে, প্রচলিত উপায়ে ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশি অর্থ প্রবেশের তুলনায় অপ্রচলিত উপায়, যাকে 'কার্ব' মার্কেট বলা হয়, এর মাধ্যমে অর্থ পাঠালে খরচ কম। এটাকে আমরা হুন্ডি বলেও চিহ্নিত করে থাকি। এসব কারণে বিদেশ থেকে অনেকে প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে অপ্রচলিত পদ্ধতিতে অর্থ পাঠিয়ে থাকেন। এসব ক্ষেত্রে যে অর্থ দেশে আসে, তার কোনো হিসাব থাকে না। কেননা, এসব অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবের বাইরে থাকে।
প্রচলিত ব্যাংকিং পদ্ধতি এবং অপ্রচলিত যে পথ রয়েছে অর্থ আনার, তার মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে আনতে হবে। প্রচলিত উপায়ে যদি অল্প খরচে টাকা দেশে আনা যায়, তাহলে সরকারি হিসাবে সেটি যুক্ত হবে। আমার মনে হয়, সরকারের সংশ্নিষ্ট বিভাগকে এই ব্যবধান কমিয়ে আনতে হবে। মানুষ যাতে প্রচলিত বা বৈধ উপায়ে অর্থ দেশে আনতে আগ্রহী হয়ে ওঠে, সেই পথ তৈরি করতে হবে।
দেশের চলমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় আমি মনে করি, সরকারের বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন সরকারি কর্মচারীদের বিদেশ ভ্রমণের ওপর ইতোমধ্যে সরকার নিয়ম করে দিয়েছে। এটাকে যথাযথ পালন করতে হবে। আবার জনসাধারণের জন্য কিছু নিয়ম করতে হবে। দেশ থেকে অনেকে বিদেশে বেড়াতে যান। এই বেড়াতে যাওয়ার ওপর একটি নিয়ম ঠিক করা যেতে পারে। যাঁরাই বিদেশে বেড়াতে যেতে চান, তাঁরাই কিন্তু বিদেশি মুদ্রার চাহিদা বাড়াচ্ছেন।
তবে এখানে আমরা একটি দিক থেকে ভাগ্যবান; আমাদের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ কম, যেটা ভারতে অনেক বেশি। ভারতের রুপি এখন সর্বোচ্চ ৮২ টাকা ডলারের বিপরীতে। এটা সর্বোচ্চ। সেখানে এখন বিদেশিরা শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। সে তুলনায় আমাদের এখানে শেয়ারে বিদেশিদের বিনিয়োগ কম।
আমি মনে করি, আগামী তিন মাস আমাদের জন্য অর্থনৈতিক ক্রান্তিকাল। ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিস্থিতি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বৈশ্বিক অর্থনীতি কোনদিকে যায়, তা খেয়াল করতে হবে। বিশ্বে একটি মন্দাকাল চলছে- তা বেশ বোঝা যায়। তাই এখন পরিস্থিতি না দেখে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
অবশ্য কিছুটা উদ্বেগ তো আছেই। দেশের রিজার্ভ যখন ৩৭ বিলিয়ন ডলারের কম বা আরও যদি কমের দিকে চলে যায়, তখন কিছুটা দুশ্চিন্তা হতেই পারে। না জানি, আমরা পাকিস্তান কিংবা শ্রীলঙ্কার দিকে যাত্রা শুরু করি- এমন একটা ভয় আছে। কিন্তু বাংলাদেশ সেদিকে যাবে না বলেই বিশ্বাস করতে চাই। তবে এখন যেটা করতে হবে, আমরা যতটা বৈদেশিক অর্থ আয় করব, ঠিক ততটাই ব্যয় করতে হবে। অর্থাৎ আয় বুঝে ব্যয়। পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কা এই নীতি মেনে চলেনি বলেই তাদের এ পরিস্থিতি। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা খরচ যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। বিলাসজাত পণ্যের ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে। যেহেতু আমরা চাল, ডাল, জ্বালানির মতো বিষয় কমাতে পারব না; তাই আমাদের দামি গাড়ির মতো পণ্য আমদানি বন্ধ করতে হবে।
এটাও মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ চাইলেই বিদেশি ঋণ পাবে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ- যে কেউ ঋণ দেবে। কারণ এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ঋণের যে কিস্তি, তা বকেয়া হয়নি। কিন্তু একদিকে রেমিট্যান্স কমে যাওয়া, অন্যদিকে রিজার্ভ কমতে থাকা- এভাবে চলতে থাকলে সমস্যাটা শুরু হবে আগামী ২০২৪ থেকে। তখন বিভিন্ন ঋণের কিস্তি শুরু হবে। সেটা বকেয়া হয়ে গেলে আর পরিস্থিতি এত সহজ থাকবে না। তাই এখন থেকে বড় প্রকল্পে ব্যয় করার আগে ভাবতে হবে। বিনিয়োগ নিয়ে চিন্তা করতে হবে।
সোজা কথা- ঋণ করে ঘি খাওয়া যাবে না। ব্যক্তিগত পর্যায়ে যেমন আমরা বলে থাকি; বৃহৎ পরিসরে এখন তা-ই মেনে চলতে হবে। অর্থাৎ আয়ের পথ না খুলে ব্যয়ের খাত চালু করা যাবে না।
আবু আহমেদ :অর্থনীতিবিদ; অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়