চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে প্রবাসীরা যে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, তা গত সাত মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২ অক্টোবর প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরের তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে বৈধ চ্যানেলে ১৫৪ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। প্রবাসীদের এই আয় গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৮ কোটি ৭২ লাখ ডলার বা ১০ দশমিক ৮৪ শতাংশ কম। এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রবাসী আয় এসেছিল ১৭২ কোটি ৬৭ লাখ ডলার। এদিকে চলতি বছরের আগস্টে প্রবাসীদের কাছ থেকে বৈধ চ্যানেলে ২০৩ কোটি ডলার আসে। অর্থাৎ আগের মাসের তুলনায় আয় কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ। এ পরিসংখ্যান দেখে চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই। মাসওয়ারি হিসাব ধরে রেমিট্যান্স হার বিবেচনা করা যায় না। কোনো মাসে কম আসবে, কোনো মাসে বেশি। দেখতে হবে বার্ষিক রেমিট্যান্সে তফাত হয় কিনা। দেশে যখন বন্যা বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়, তখন চালসহ অন্যান্য পণ্যের সংকট দেখা দেয়। দেশে থাকা স্বজনদের কষ্ট লাঘবে ধারদেনা করে কিংবা সঞ্চিত টাকা থেকে প্রবাসীরা বাড়িতে বেশি টাকা পাঠান। ফলে সে মাসে রেমিট্যান্স বেড়ে যায়। এক মাসে বেশি টাকা পাঠালে পরে সেই ধাক্কা সামাল দিতে গিয়ে কিছুটা কম টাকা পাঠাতে পারেন। বাংলাদেশ ব্যাংক যে পরিসংখ্যান দিয়েছে, এটা হচ্ছে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর তালিকা। এর বাইরে হুন্ডির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছে। সুতরাং রেমিট্যান্স নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই।

আমরা জানি, বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত কৃষি, রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। আশির দশক থেকেই রেমিট্যান্স অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে শুরু করে। যখনই বৈদেশিক রিজার্ভে ঘাটতি দেখা দেয় তখন প্রবাসীরা সচল ভূমিকা রেখে সেই ঘাটতি পূরণ করে দেন। এ জন্য আমরা বলে থাকি- অভিবাসীর ঘামের টাকা সচল রেখেছে দেশের চাকা। অথচ এসব অভিবাসীর জন্য যেসব পদক্ষেপ হাতে নেওয়া প্রয়োজন, তা নিচ্ছি না। রেমিট্যান্স কমতে থাকলে সংবাদমাধ্যম সে তথ্য আমাদের সামনে তুলে ধরে। তখন আমরা এর কারণ ও সমাধান নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করে দিই। কিন্তু যখন বাজেট প্রণয়ন করা হয়; পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় কিংবা ডেলটা প্ল্যানের মতো বড় বড় কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়, তখন রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের কথা ভুলে যাই।

দীর্ঘ মেয়াদে চিন্তা করলে রেমিট্যান্স প্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সুশীল সমাজ ও প্রবাসীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর দাবি ছিল- রেমিট্যান্সে প্রণোদনা দেওয়া হোক। সরকার শুরুতে ২ শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছিল। এখন এটা বাড়িয়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করেছে। এই প্রণোদনার সুফল করোনাকালে আমরা দেখেছি। সে সময় বিদেশে অনেকে কাজ হারিয়ে ঘরবন্দি ছিলেন। কিন্তু দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়ে রেমিট্যান্সের চাকা সচল রেখেছেন তাঁরা।

আমাদের দেশে বৈদেশিক রিজার্ভ আছে- এতদিন অনেকে রেমিট্যান্স নিয়ে সেভাবে হয়তো চিন্তা করেননি। সম্প্রতি রিজার্ভে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় রেমিট্যান্স নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। ইউরোপ-আমেরিকায় রেমিট্যান্স আসে বিনিয়োগ খাতে। আমাদের দেশেও বিনিয়োগ খাতে রেমিট্যান্স টানতে হবে। দেশে থাকা আত্মীয়স্বজনের খরচের জন্য যে টাকা প্রবাসীরা পাঠান, এটা জাতীয় অর্থনীতিতে তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। বিনিয়োগ খাতে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে আমাদের আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এখানে বার্ষিক ১ কোটি টাকার বেশি পাঠানো যাচ্ছে না। অথচ বিদেশে যাঁরা যান তাঁদের উদ্দেশ্য হচ্ছে বেশি টাকা আয়। বিশেষ করে ইউরোপ-আমেরিকা যাঁরা যান, তাঁরা অনেকেই বছরে কয়েক কোটি টাকা আয় করেন। এই টাকা তাঁরা দেশে বিনিয়োগ করতে চাইলে সরকারের উচিত উৎসাহিত করা। বাংলাদেশ ব্যাংক দুই ধরনের বন্ড বিক্রি করে। প্রিমিয়াম বন্ড ও ডলার বন্ড। প্রিমিয়াম বন্ডে টাকা আর ডলার বন্ডে ডলার দেওয়া হয়। এসব বন্ডে বছরে ১ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করা যাবে না। আগেই বলেছি, ১ কোটি টাকা বিদেশিদের কাছে কিছু না। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীরা দেশে বিনিয়োগ করছেন না। পরিণামে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমছে। তা ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক ৬-৭ শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছে। অথচ হুন্ডির মাধ্যমে আরও বেশি লাভে প্রবাসীরা টাকা পাঠাতে পারার কারণে রেমিট্যান্সের বড় অংশ দৃশ্যমান হচ্ছে না।

আমাদের দেশের করনীতির দিকে তাকাতে হবে। অনেকেই কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য অবৈধ পথে দেশে অর্থ পাঠান। এলসি না খুলে হুন্ডির মাধ্যমে পণ্য আমদানির ফলে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এসব ঠেকাতে করনীতিতে পরিমার্জন করা দরকার। অর্থ পাচারের জন্য কেউ কেউ মোবাইল ব্যাংকিংকে দায়ী করেন। আসলে অর্থ পাচারে মোবাইল ব্যাংকিং দায়ী নয়। এ জন্য হুন্ডিওয়ালাদের ধরতে হবে। কারণ, তাদের মাধ্যমেই অর্থ পাচার হচ্ছে। সরকার এখন রেমিট্যান্সের ওপর ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছে। অন্যদিকে হুন্ডি ব্যবসায়ীরা ৭-৮ শতাংশ লাভ দিচ্ছে। তাহলে প্রবাসীরা হুন্ডিতে না দিয়ে ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে যাবেন কেন? এ জন্য প্রণোদনা বাড়িয়ে তফাত কমিয়ে আনতে হবে এবং হুন্ডি ব্যবসায়ীদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

অভিবাসীরা যেমন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে দেশের চাকা সচল রাখতে দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন; সরকারেরও উচিত তাঁদের সেবা বাড়িয়ে দেশপ্রেমের জবাব দেশপ্রেম দিয়ে দেওয়া। কিন্তু আমরা বিভিন্ন সময় সিন্ডিকেট দেখি, দালাল চক্র দেখি। সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানো নিয়ে আরেকবার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য দেখলাম। অভিবাসন নিরাপদ করতে না পারলে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে বলার কোনো অধিকার আমাদের নেই।

গত এপ্রিল থেকে দেশে ডলারের সংকট দেখা দেয়। এর পর ব্যাংকগুলো বেশি দাম দিয়ে ডলার সংগ্রহ শুরু করে। ফলে এপ্রিল, জুলাই ও আগস্টে ২০০ কোটি ডলারের বেশি প্রবাসী আয় এসেছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাপে ব্যাংকগুলো নিজেরাই গত ১১ সেপ্টেম্বর রেমিট্যান্সে সর্বোচ্চ ১০৮ এবং রপ্তানি বিল নগদায়নে ৯৯ টাকা দর ঠিক করে দেয়। এর পর থেকেই রেমিট্যান্স কমছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মুদ্রাস্ম্ফীতির কারণে প্রতিনিয়ত ডলারে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এর ছাপও রেমিট্যান্সে পড়েছে। রেমিট্যান্স বাড়াতে হলে অদক্ষ জনশক্তির বদলে দক্ষ জনশক্তি বিদেশে পাঠাতে হবে। অদক্ষদের তুলনায় দক্ষদের আয় বেশি। আমরা যদি দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে পারি, তাহলে আর কয়েক দিন পরপর রেমিট্যান্স নিয়ে ভাবতে হবে না। বাংলাদেশে রেমিট্যান্স বাড়াতে অন্য রকম বিনিয়োগে প্রবাসীদের উৎসাহিত করতে হবে। যেমন- শেয়ারবাজারে তাঁরা বিনিয়োগ করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। এ কারণে শেয়ারবাজারের কেলেঙ্কারি দূর করে ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নিতে হবে। এসব ঠিক করতে পারলে রেমিট্যান্স বাড়বে। পাশাপাশি বিনিয়োগ খাতের দিকে প্রবাসীদের আগ্রহী করে তুলতে আইনি বাধার অবসান ঘটাতে হবে।

অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী: চেয়ারপারসন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, রামরু