সভ্য সমাজ স্বভাবতই নারীর জন্য নিরাপদ বলে বিবেচ্য। পরিতাপের বিষয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশের বাস্তবতা এই ধারণা বদলে দিয়েছে। বিশেষ করে যৌন হয়রানির একের পর এক ঘটনা নারীর নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন আমাদের সামনে হাজির করেছে। দেশে ইন্টারনেট তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে আস্থার প্রতীক হলেও অশুভ প্রয়োগ ও ব্যক্তিগত দায়িত্বহীনতার কারণে অনেক নারীর কাছে তা এক আতঙ্কের নাম। সাইবার জগৎকে নারীদের জন্য আমরা এখনও নিরাপদ করে গড়তে পারিনি। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, ইনস্টাগ্রাম, টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিনিয়ত হয়রানির ঘটনা ঘটছে।
ইন্টারনেট সম্পর্কে জ্ঞানের ঘাটতি ও সঠিক ব্যবহার না জানায় দেশের ৬৪ শতাংশ কিশোরী অনলাইনে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে- এমন তথ্য সম্প্রতি উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের এক গবেষণায়। শহর ও গ্রামের ৪৫৬ শিক্ষার্থীর (নবম ও দশম শ্রেণি) ওপর পরিচালিত এ গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৬ শতাংশ কিশোর এবং ৬৪ শতাংশ কিশোরী ইন্টারনেটের মাধ্যমে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। শহরে শিশুদের মধ্যে এ নির্যাতনের ঘটনা গ্রামীণ শিশুদের দেড় গুণ। একই গবেষণায় আরও জানা গেছে, দেশের প্রায় ৩৩ শতাংশ শিশু ইন্টারনেট ব্যবহার করে। তাদের মধ্যে কমপক্ষে একটি, দুটি বা তিনটি সাইবার অপরাধের প্রবণতা ছিল যথাক্রমে ৫৯, ৩৮ ও ২৬ শতাংশ। সাইবার অপরাধের মধ্যে উৎপীড়ন, উপহাস, গুজব কিংবা অপমান ৩৫; অসৎ উদ্দেশ্যে বেনামে যোগাযোগ ২৯; যৌন নিপীড়নমূলক বার্তা কিংবা মন্তব্য ১১ এবং যৌনতাপূর্ণ ছবি বা ভিডিওর শিকার হয়েছে ১৭ শতাংশ। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য দেখে বলা যায়, ১৬ বছরের কম বয়সীদের হাতে মোবাইল ফোন দেওয়া ঠিক নয়। এই বয়সের শিশুরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে অজান্তেই অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
অনলাইনে হয়রানির শিকার নারীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অভিযোগের মধ্যে পর্নোগ্রাফি, ব্ল্যাকমেইল, ফেসবুক আইডি হ্যাক, অর্থ আদায় এবং হত্যার হুমকির ঘটনা উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক বছরে ঘরে বসে নারীদের অনলাইনে পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের প্রসার যেমন বেড়েছে; তেমনি তৃণমূলের নারীদেরও অনলাইনে সরব থাকতে দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একজন বিক্রেতা নারী যখন তাঁর পণ্য বিক্রির জন্য ফেসবুকে লাইভ করেন, তখন কমেন্ট বক্স তাঁর প্রতি অবমাননাকর ও হয়রানিমূলক মন্তব্যে ভরে যায়।
নারীদের সম্মান ও সমতার চোখে দেখার ধারণা সাধারণত পরিবার ও সমাজ থেকে উঠে আসে। কিন্তু সমাজ এখনও সবাইকে সে শিক্ষা দিতে পারছে না। পরিবারও কাঙ্ক্ষিত দায়িত্বশীল আচরণ পালনে ব্যর্থ হচ্ছে। নারীকে এখনও সমাজের ব্যাপক অংশে এক ধরনের ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখা হয়। একজন নারী যে পুরুষের মতোই স্বাভাবিক মানুষ; একজন পুরুষ যা যা করতে পারে, একজন নারীও যে তা করতে সক্ষম এবং অধিকার রাখে- দুর্ভাগ্যজনকভাবে একটা বিরাট অংশের পুরুষ তো বটেই অনেক নারীও তা মানতে পারে না। নারীকে এভাবে দেখার চোখ যতদিন না বদলাবে ততদিন পরিস্থিতির উন্নতি আশা করা যায় না।
সুনির্দিষ্ট আইন না থাকায় ইন্টারনেটের মাধ্যমে শিশু-কিশোরীর যৌন হয়রানির যথাযথ বিচার হচ্ছে না। শিশুর যৌন হয়রানি বিষয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, তথ্য ও প্রযুক্তি আইন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই। এই সুযোগে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। অনলাইন-অফলাইনে হয়রানির শিকার হয়ে অনেক শিশু-কিশোরীর জীবনই বিপন্ন হয়ে পড়ছে। আমরা চাই কোনো শিশু-কিশোরী অনলাইন বা অফলাইনে যৌন হয়রানির শিকার না হোক। তাদের স্বাভাবিক বিকাশের স্বার্থেই বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। এটি রোধ করা না গেলে সামাজিক শৃঙ্খলাও ভেঙে পড়বে। আমাদের প্রত্যাশা, সংশ্নিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ দ্রুত এ বিপদ মোকাবিলায় সক্রিয় হবে। প্রয়োজনীয় আইন সংস্কারসহ এর যথাযথ প্রয়োগে কার্যকর উদ্যোগ নেবে; সর্বোপরি এ বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তুলতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
এহ্‌সান মাহমুদ :সহ-সম্পাদক, সমকাল