বলিউড তারকা নোরা ফাতেহি ঢাকায় এলেও 'মন ভরেনি' দর্শকের- সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য। 'দিলবার' গানে ১৫ সেকেন্ডের মতো কোমর দুলিয়েই নাচের ইতি টেনেছেন তিনি। তার আগেই যদিও উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়া দর্শকরা 'নোরা, নোরা' ধ্বনিতে অভিবাদন জানানো সম্পন্ন করেছিল; জবাবে মঞ্চ থেকে দর্শকদের দিকে উড়ন্ত চুমু ছুড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো পারফরম্যান্স না থাকায় সে উচ্ছ্বাস মিলিয়ে যেতে সময় লাগেনি।
এই দৃশ্য গত ১৮ নভেম্বরের। উইমেন লিডারশিপ করপোরেশন আয়োজিত 'গ্লোবাল অ্যাচিভার অ্যাওয়ার্ড-২০২২' অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এসেছিলেন নোরা। পাঁচ শতাধিক দর্শক ৫ থেকে ১৫ হাজার টাকায় টিকিট কিনে আগ্রহভরে অপেক্ষা করছিলেন এই নৃত্যশিল্পীর নাচ দেখার জন্য। কিন্তু অপূর্ণ আর আর টইটম্বুর হতাশা নিয়েই বাড়ি ফিরতে হয়েছে তাঁদের। ক্ষুব্ধ কোনো কোনো দর্শক সংবাদমাধ্যমে আয়োজকদের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ এনেছেন। তবে আয়োজকরা দাবি করেছেন, নোরা ফাতেহি বাংলাদেশে আসতেই চাইছিলেন না। এক দিন আগে তাঁকে রাজি করানো গেছে। নানা ঝামেলা হচ্ছিল। এ অবস্থায় তাঁকে আনতে পারা গেছে; দর্শকের সামনে উপস্থিত করতে পারা গেছে- সেটাই অনেক। তাঁরা আরও জানিয়েছেন, নোরার পারফর্ম করার অনুমতি ছিল না। তা ছাড়া তিনি সাত ঘণ্টা ভ্রমণ করে এসেছেন। অনেক ক্লান্তও ছিলেন। এ অবস্থায় কিছু বলার ছিল না।
'সাকি সাকি' কিংবা 'দিলবার' গানে নাচ পরিবেশন করে নোরা বলিউডের সেরা নৃত্যশিল্পীদের একজন হয়ে উঠেছেন গত কয়েক বছরে। শুধু বড় পর্দা নয়; ছোট পর্দা ও মিউজিক ভিডিওতে সমান জনপ্রিয় মরক্কো বংশোদ্ভূত নোরার জন্ম ও বেড়ে ওঠা কানাডায়। ছোটবেলায় তিনি শাহরুখ খান ও হূতিক রোশনের ভক্ত ছিলেন। আরবি ভাষায় ডাব করা তাঁদের অভিনীত সিনেমা দেখে বড় হয়েছেন নোরা। পরে বলিউডে নাম লেখানোর স্বপ্ন নিয়ে ভারতে পা রেখেছিলেন।
বলিউডের সীমানা ছাড়িয়ে নোরার ভক্তকুল সৃষ্টি হয়েছে বৈশ্বিক পর্যায়ের বিনোদন জগতে। সেই ঢেউ বাংলাদেশেও লেগেছে। তাই তাঁর নাচ দেখার জন্য ৫ থেকে ১৫ হাজার টাকায় টিকিট কাটতে অনেকে দ্বিধা করেননি। বরং দফায় দফায় পিছিয়ে যাওয়া তারিখের জন্য দর্শক অপেক্ষার গ্রহর গুনছিলেন। আমার ধারণা, তিনটি গানের সঙ্গে ১৫ মিনিট নাচলেও দর্শকের মন ভরত। কিন্তু তার বদলে মাত্র ১৫ সেকেন্ড! স্বাভাবিকভাবেই সন্তুষ্টির বদলে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
ভিনদেশি শিল্পীদের প্রতি বিশেষ রাগ বা অনুরাগ নেই। বলিউড তারকা শাহরুখ খান ও সালমান খানও ঢাকায় এসেছিলেন পারফর্ম করতে। যে কোনো বিবেচনায় তাঁরা নোরার চেয়ে বড় তারকা। তাঁরা তো ঠিকই সময় দিয়েছেন, দর্শক মাতিয়েছেন। কে না জানে, বিনোদন জগত আসলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে'! কিন্তু দেশীয় অর্থের মায়া নিশ্চয়ই থাকতে হবে। মঞ্চে মাত্র ১৫ সেকেন্ডের জন্য উপস্থিত হয়ে সাধারণ দর্শকের এত টাকা কেউ নিয়ে যাবেন, কীভাবে মানা যায়? বাংলাদেশের দর্শক কি এতটাই ফেলনা?
প্রশ্ন হচ্ছে- যদি নোরার নাচের অনুমতি না থাকে তাহলে আয়োজকরা এত দামে টিকিট বিক্রির আগে দর্শকের কাছে বিষয়টি পরিস্কার করেননি কেন? তাঁরা আগেই বলতে পারতেন, 'দর্শকের সামনে উপস্থিত করতে পারব- এটাই অনেক।' যে অনুষ্ঠানে নোরা ও আয়োজকদের আচরণে দর্শক হতাশ হলেন, সে অনুষ্ঠানের প্রাণ অবশ্য ফিরিয়ে দিয়েছেন দেশীয় শিল্পীরা। জানা যাচ্ছে, পূজা চেরির পারফরম্যান্সে দর্শক সন্তুষ্ট।
দায় শুধু আয়োজকদের নয়; দর্শকদেরও। তাঁদের রুচিতেও পরিবর্তন আসা উচিত। ১৫ হাজার টাকায় টিকিট কাটার সময় চিন্তা করা উচিত, ঠিক কী আয়োজন তাঁদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে। এটা ঠিক, নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস,/ ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস। তাই বলে ওপার শুনলেই বেহুঁশ হওয়ার মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসা উচিত।
মিজান শাজাহান: সহ-সম্পাদক, সমকাল
mizanshajahan@gmail.com