কিছুদিন আগে নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতিসহ বিভিন্ন ধরনের স্বজনপ্রীতি এবং স্বেচ্ছাচারিতার প্রমাণ পাওয়ায় খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পরিবারের ৯ সদস্যসহ ৭৩ শিক্ষক নিয়োগ বাতিলের নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনও বলেছে, নিয়োগে অসংগতি রয়েছে। এই নিয়োগ নিয়ে এখনও আলোচনা-সমালোচনা চলমান। কিন্তু ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি ৭৩ জন শিক্ষক নিয়োগ বাতিলের বিপক্ষে কথা বলছে। তাদের কথা- নিয়োগ বৈধ। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় আইনে সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ থাকার বাধ্যবাধকতা নেই। তারপরও বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ থাকা উচিত ছিল। যেহেতু শিক্ষক নিয়োগ বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী হওয়ায় মানবিক ও সামাজিক দিক বিবেচনায় ৭৩ জন শিক্ষক নিয়োগ বাতিল হওয়া কাম্য নয়। প্রশ্ন হলো, একজন উপাচার্যের নিজ পরিবারের ৯ জন সদস্য নিয়োগ পান কীভাবে? এটি কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। সম্প্রতি জামালপুরের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শেষ কর্মদিবসে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে পারেননি বলে সংবাদ প্রকাশ পায়। কারণ তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ছিল। এ ছাড়া রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) সদ্য প্রাক্তন উপাচার্যের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি করে ভাই, শ্যালক-শ্যালিকা, আত্মীয়স্বজন, পছন্দের লোকদের নিয়োগ দেওয়াসহ নানা ধরনের অন্যায়, অনিয়ম এবং দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, 'ইদানীং কয়েকজন উপাচার্য ও শিক্ষকের কর্মকাণ্ডে সমাজে শিক্ষকদের সম্মানের জায়গাটা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।' অর্থাৎ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যাঁরা শিক্ষক বা উপাচার্য; সবার আরও সতর্ক বা দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) এক তদন্তে এসব অনিয়ম ধরা পড়েছে। অনিয়ম করে নিয়োগ দেওয়া অধিকাংশ লোক তাঁর নিকটাত্মীয়। তদন্ত প্রতিবেদনে এসব ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে, যা খুবই দুঃখজনক। আমাদের শিক্ষকদের জন্য লজ্জাজনক। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকা অবস্থায় চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে; তাকেও শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন কোনো এক উপাচার্য। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ যোগ্যতায় শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে যাচ্ছেন উপাচার্য। এর মানে এই নয় যে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ ভালো হয় না। অধিকাংশ শিক্ষক ভালো ফল এবং পরীক্ষায় শীর্ষস্থান অধিকার করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। তবে লবিং ও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে শিক্ষক হওয়া বন্ধ করতে পারলে দেশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যাণ হবে।
শিক্ষক নিয়োগ শতভাগ সঠিক করতে গেলে এক কাজ করা যেতে পারে। যেমন মেধা তালিকায় যাঁরা ১-৫% শতাংশের মধ্যে থাকবেন, একমাত্র তাঁরাই শিক্ষক পদের জন্য আবেদন করতে পারবেন। যার মানে, কোনো ব্যাচে ১০০ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। তাহলে ১ থেকে মেধাক্রম ৫ পর্যন্ত শিক্ষক নিয়োগের জন্য আবেদনের যোগ্য। অর্থাৎ লবিং থাকবে না বললেই চলে এ পদ্ধতিতে। তখন শিক্ষার্থীরা জানবে যে, লবিং করার দরকার নেই। এ জন্য সরকারকে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করে দিতে হবে, যা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মানতে বাধ্য। এমন নিয়ম বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু রয়েছে।
শিক্ষক নিয়োগের জন্য লিখিত পরীক্ষা, ডেমো ক্লাস, ব্যাচের ফলে শীর্ষস্থান (১-৫ মেধাক্রম) এবং মৌখিক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা জরুরি।
উপাচার্য নিয়োগ নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হওয়া একান্ত বাঞ্ছনীয়। কারণ তাঁকে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক দিন কাজ করতে হবে। তাই চক্ষুলজ্জার ভয়ে হলেও অনেকে খারাপ কাজ করতে উৎসাহী হবেন না। অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়োগ দেওয়া উপাচার্য মনে করতে পারেন, নানা কৌশলে চার বছর পার করতে পারলেই তাঁর দায়িত্ব শেষ।
ড. মো. শফিকুল ইসলাম: সহযোগী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যপদ্ধতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়