গ্রামের পথ আলোকিত করিবার নিমিত্তে গৃহীত সরকারের 'আলোকিত পল্লি সড়কবাতি' প্রকল্পটি যে প্রবারে আঁধারের পথে ধাবিত হইয়াছে, তাহা বেদনাদায়ক। বৃহস্পতিবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলিতেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করিবার কারণে সৌরবাতির অধিকাংশই জ্বলে না; অবশিষ্টগুলিও নিভুনিভু। অথচ প্রায় দুই কুড়ি উপজেলার জন্য প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সরকারের অর্ধশত কোটি টাকা ইতোমধ্যে ব্যয় হইয়াছে। কিন্তু গ্রামের মানুষের রাতের চলাচলের নিরাপদ পথ সেই তিমিরেই রহিল।
সমকালের প্রতিবেদন বলিতেছে, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সমবায় বিভাগের উদ্যোগে ২০১৯ সালের মধ্যবর্তী সময় হইতে দেশের ৮ বিভাগের এক-পঞ্চমাংশ জেলায় সড়কে সৌরবাতি স্থাপনকার্য শুরু হইয়াছিল। প্রায় ছয় মাস পূর্বে প্রকল্পের মেয়াদ উতরাইলেও তিন বছরে উহার কাজ মাত্র অর্ধাংশ সম্পন্ন হইয়াছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের ব্যয় এক-পঞ্চমাংশ বাড়িলেও কাজের গতি সন্তোষজনক নহে এবং যে সকল এলাকায় সৌরবাতি স্থাপন করা হইয়াছে, সেগুলির খুঁটির কোনোটা হেলিয়া পড়িয়াছে; কোনোটায় আলোই জ্বলিতেছে না। রংপুরের পীরগঞ্জ, মাগুরা সদর উপজেলা, বরিশালের আগৈলঝাড়া, শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জসহ সংশ্নিষ্ট অঞ্চল হইতে সমকালের স্থানীয় প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য তাহারই সত্যায়ন করিতেছে। সংশ্নিষ্ট উপজেলার বাতি এক-দেড় বছরের মধ্যে স্থাপন করা হইলেও অধিকাংশই এখন বিকল। কোথাও সোলার প্যানেল থাকিলেও বাতি নাই। এমনকি এই প্রকল্প লইয়া মন্ত্রণালয়ে দাখিলকৃত অভিযোগে উল্লেখ করা হইয়াছে, ইস্পাতে নির্মিত খুঁটিগুলির ব্যাসার্ধ কথানুযায়ী দেওয়া হয় নাই। প্রতিটি বাতির তিন বছর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনের কথা থাকিলেও তাহা পরিপালিত হইতেছে না। তজ্জন্যই মাসের পর মাস বাতি না জ্বলিলেও তাহা দেখিবার যেন কেউই নাই।
বস্তুত আলো ছড়াইবার প্রকল্পটির এই আঁধার-কথনের মূল কারণ ইহার গোড়াতেই গলদ। ইহার কাজ পাইয়াছে এক প্রতিষ্ঠান; অথচ তাহা বাস্তবায়ন করিতেছে অন্য ঠিকাদার। এমনকি সংশ্নিষ্টরা সমকাল প্রতিবেদকের নিকট অভিযোগ করিয়াছেন, প্রথম দফায় বিস্তর অনিয়ম করিয়া ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হইয়াছিল। দ্বিতীয় দফার দরপত্রে এমন কিছু শর্ত দেওয়া হইয়াছে, যাহাতে উক্ত প্রতিষ্ঠান ব্যতীত অন্য কেহ দরপত্রেই অংশগ্রহণ করিতে না পারে। ইহার পশ্চাতে প্রভাবশালী কাহারও হাত রহিয়াছে- তাহা বুঝিতে বিশেষজ্ঞ হইবার প্রয়োজন নাই। বলাবাহুল্য, প্রকল্প কর্মকর্তারাও ইহার দায় এড়াইতে পারেন না। তাঁহাদের উৎকোচ বাণিজ্যও প্রকল্পটি বেহাল হইবার অন্যতম কারণ হইতে পারে বলিয়া আমাদের ধারণা। তাহা না হইলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিয়ত পরিদর্শন করিবার কথা ছিল। তাহারা হয় পরিদর্শন করেন নাই; না হয় পরিদর্শন করিলেও বিষয়টি ইচ্ছাকৃতভাবে এড়াইয়া গিয়াছেন। আমরা বিস্মিত, প্রকল্পের সার্বিক তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সমকালকে বলিয়াছেন, সৌরবাতি লইয়া তাঁহারা বড় ধরনের কোনো অভিযোগ পান নাই। প্রশ্ন হইল, অভিযোগ পাইতে হইবে কেন? সরেজমিন গিয়া কি তাঁহারা দেখেন নাই?
দুঃখজনক হইলেও সত্য, শুধু এই প্রল্পটিতেই নহে; আমরা দেখিয়াছি, সরকারের উন্নয়নমূলক অনেক প্রকল্পই তথৈবচ। অধিকাংশ প্রকল্পই সঠিক সময়ে বাস্তবায়ন না হইবার কারণে ব্যয়ের অঙ্ক বৃদ্ধি পাইয়া থাকে। প্রকল্পের সুফল পাইবার আগে যথেষ্ট ভোগান্তিও মানুষকে পোহাইতে হয়। সড়কবাতি প্রকল্পটিতে ব্যাপক অবকাঠামোগত কাজ না থাকায় সেই দিক হইতে হয়তো সংকট তৈরি হয় নাই। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হইতেছিল, তাহা সাধন হয় নাই। প্রত্যাশা ছিল- আলো থাকিলে গ্রামীণ সড়কগুলিতে দুর্ঘটনা হ্রাস পাইবে। নিরাপত্তা বাড়িবার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যেরও সম্প্রসারণ এবং তাহাতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটিবে। সেই প্রত্যশার গুড়ে যে বালি পড়িল; তিন বছর অতিক্রান্তের পরও প্রকল্পটি শেষ না হওয়া এবং বাতি থাকিলেও তাহা কাজে না আসাই তাহার জন্য যথেষ্ট।
বিদ্যুতের ব্যবহার না করিয়া সৌরবাতির ধারণাটিও ছিল অভিনব। সৌরবাতি হওয়ায় তাহা বাস্তবায়নে প্রাযুক্তিক সংকটসহ প্রাকৃতিক প্রতিকূল পরিবেশের কারণে প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে কিছুটা সমস্যা হওয়া দূষণীয় নহে। কিন্তু অধিকাংশ বাতি না জ্বলা এবং যেসব বাতি জ্বলছে সেইগুলিতে আলো না থাকা স্বাভাবিক বিষয় নহে। এ ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান এবং মন্ত্রণালয়ের সংশ্নিষ্ট বিভাগও দায় এড়াইতে পারে না। আমরা চাহিব, কর্তৃপক্ষ তদন্তসাপেক্ষে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করুক এবং প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে কঠোর হউক।

বিষয় : সম্পাদকীয়

মন্তব্য করুন