ন্যায়সংগত সুবিধা ধারণাটি বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি। প্রযুক্তির উন্নতি, মানুষের সচেতনতা এবং সরকারের উদ্যোগের ফলে অল্প সংখ্যায় হলেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসছেন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পরিবার তাদের সন্তানটিকে আর লুকিয়ে রাখছে না। এটি অনেক বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্জন।

খুব অল্প সংখ্যায় হলেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা পড়াশোনা করছেন, চাকরি করছেন। সমাজের সর্বস্তরে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু ন্যায়সংগত সুবিধা ধারণাটির চর্চা ও প্রয়োগ না থাকায় তাঁরা অগ্রসর হতে পারছেন না।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করে, তারা দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের জন্য ন্যায়সংগত সুবিধা বাস্তবায়নের কথা বলে আসছে। আমাদের দেশে বিষয়টি নিয়ে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। অনেকেরই এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণাও নেই।

প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার সময় ১০ থেকে ৩০ মিনিট অতিরিক্ত সময় পেয়ে থাকেন। কিন্তু এ ধরনের সহায়তা কোনোভাবেই ন্যায়সংগত সুবিধার ধারণার সংজ্ঞার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

কর্মক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ন্যায়সংগত সুবিধার ধারণাটি একেবারেই অনুপস্থিত। কর্মক্ষেত্রে যে এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, তার একটি বড় প্রমাণ আমাদের দেশের কোনো প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ন্যায়সংগত সুবিধা নিশ্চিত করা হবে- এই কথাটি উল্লেখ থাকে না কিংবা প্রতিবন্ধী আবেদনকারীর কাছে জানতে চাওয়া হয় না, তাঁর কী প্রয়োজন পরীক্ষা চলাকালীন।

ন্যায়সংগত সুবিধা ধারণাটির অর্থ হলো, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অবস্থা ও চাহিদা অনুযায়ী তাঁর জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা। জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সনদ ২০০৬-এর আর্টিকেল ২-এ বলা হয়েছে, 'ন্যায়সংগত সুবিধা হলো, একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পূর্ণমাত্রায় অংশগ্রহণের জন্য যেসব উপকরণ অথবা ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন, তা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত সুবিধার নামে এমন কোনো কিছু করা যাবে না, যার ফলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়।' প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য ন্যায়সংগত সুবিধার বিষয়টি নির্ধারিত হয় প্রতিবন্ধিতার ধরন এবং কী প্রয়োজন সে অনুযায়ী। ধরা যাক, স্কুলে যদি হুইলচেয়ার ওঠার জন্য কোনো র‌্যাম্প না থাকে, সে ক্ষেত্রে শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সুবিধার্থে সেই স্কুলের নিচতলায় শ্রেণিকক্ষ স্থাপন করা। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির কর্মস্থলে তাঁর সুবিধা ও স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী টেবিল অথবা কামরা নির্ধারণ করা। আমাদের দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য ন্যায়সংগত সুবিধা ধারণাটির প্রসার না ঘটার অন্যতম কারণ বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকা। অনেকেই মনে করেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ন্যায়সংগত সুবিধা ধারণাটি বাস্তবায়ন করতে অনেক অর্থ, সময় ও শ্রম দিতে হয়।

প্রকৃতপক্ষে কিছু ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অথবা কর্মস্থলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ন্যায়সংগত সুবিধা নিশ্চিত করার মাধ্যমে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারি। যেমন- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যদি কোনো ক্ষীণ দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি পড়ালেখা করেন, তাহলে তার জন্য বড় হরফে মুদ্রিত প্রশ্ন, অডিও বইয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য বসার স্থানটি যেন শ্রেণিকক্ষের দরজার কাছে হয়।

উন্নত বিশ্বে ন্যায়সংগত সুবিধা এখন আর শুধু প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয় নয়। এটি এমন একটি চিন্তা, যা সবার জন্য প্রযোজ্য। কারণ একজন সুস্থ মানুষ যে কোনো সময় শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ বা কোনো দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন। এতে তাঁর কার্যক্ষমতা কমতে পারে। সে ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে সমাজের মূল স্রোতধারায় যুক্ত থাকার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়।আমাদের দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা এখনও অনেক পিছিয়ে আছেন। তাঁদের সমাজের মূলধারায় নিয়ে আসতে ন্যায়সংগত সুবিধা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে। এভাবেই আমরা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈচিত্র্যময় সমাজ প্রতিষ্ঠায় অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারব।

তালুকদার রিফাত পাশা: সহকারী পলিসি অফিসার, ইনস্টিটিউট অব ওয়েলবিইং বাংলাদেশ
rifatir2@gmail.com