বাংলাদেশের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সম্পর্ক প্রায় ৫০ বছরের। ১৯৭৩ সালে ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের উন্নয়নে সম্পৃক্ত হয়, তখন থেকেই উভয়ের মধ্যকার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়। তবে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ-ইইউ রাজনৈতিক সংলাপের আয়োজন হয় গত ২৪ নভেম্বর বৃহস্পতিবার। এ সংলাপের মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা এক নতুন মাত্রা লাভ করে। এখন থেকে নিয়মিত প্রতি বছর এ সংলাপের আয়োজন করা হবে। সে ক্ষেত্রে উচ্চ পর্যায়ের এ সংলাপটি এক বছর ঢাকায় হবে, পরের বছর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদরদপ্তর বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে। আশা করা যাচ্ছে, এ সংলাপ যেমন কৌশলগত দিকনির্দেশনা প্রদান করবে, তেমনি বৈদেশিক ও নিরাপত্তানীতি সহযোগিতা আরও বৃদ্ধি করবে। প্রথমবারের এ সংলাপে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে।
বাংলাদেশের সামাজিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের বিষয়টি ইউরোপীয় ইউনিয়ন গুরুত্বের সঙ্গেই দেখছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে অস্ত্র বাদে আর সব 'এভরিথিং বাট আর্মস (ইবিএ)' স্কিমের সুবিধাভোগী হিসেবে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে যে উন্নতি ঘটিয়ে চলেছে, সেটি প্রশংসনীয়। বাংলাদেশের যেহেতু স্বল্পোন্নত দেশ থেকে ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটবে, সে জন্য দেশটি ২০২৯ সালের পরও ব্যবসায়িক সুবিধার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তা চেয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করে বাংলাদেশের শ্রমিকদের জন্য একটি সুন্দর কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছে। বস্তুত এর মাধ্যমে বাংলাদেশ শ্রমিক অধিকার সুরক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার যে স্বীকৃতি দিয়েছে, তারই প্রতিফলন ঘটবে। এ জন্য প্রয়োজন ন্যায্য মজুরি ও গার্মেন্টস কমপ্লায়েন্স তথা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে কারখানার পরিবেশ সন্তোষজনক অবস্থায় রাখা। বিশেষ করে নিরাপদ ও সবুজ কারখানা গড়তে বিনিয়োগ করা।
বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওই সংলাপে দেশটির পক্ষ থেকে যোগদানকারী প্রতিনিধিদের নেতৃত্বে ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ইউরোপিয়ান এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিসের উপপরিচালক এনরিক মোরা। এ সংলাপে বিভিন্ন বিষয় আলোচিত হয়, যেখানে গণতন্ত্র, মৌলিক স্বাধীনতা, আইনের শাসন, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও সবার মানবাধিকারের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত হয়।
প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ এবং ইইউর এই রাজনৈতিক সংলাপের উদ্দেশ্য ছিল, বর্তমানে উভয়ের দিক থেকে যে অগ্রাধিকার তথা বাণিজ্য, অভিবাসন, সুশাসন, মানবিক উদ্যোগ এবং উন্নয়ন সহযোগিতা চলছে তার বাইরেও সম্পর্কের আরও বিস্তৃতি ঘটানো। সে লক্ষ্যে এ সংলাপে উভয় পক্ষই জলবায়ু পদক্ষেপ, ডিজিটাল রূপান্তর, কানেকটিভিটি ও নিরাপত্তা বিষয়ে আরও ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে একমত। বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা সংলাপে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা ও উগ্রবাদী সহিংসতা প্রতিরোধে তাঁদের মত বিনিময় করেছেন। সব ধরনের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে শূন্য সহিষুষ্ণতা বিষয়ে বাংলাদেশ পুনরায় তার অবস্থান নিশ্চিত করেছে। মানবাধিকার ও মানবিক সমাজ গঠন নিশ্চিত করতে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা যে জরুরি- উভয় পক্ষই এ ব্যাপারে তাদের যৌথ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।
এই সংলাপে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংঘবদ্ধ অপরাধ প্রতিরোধে জোরালো সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ও আলোচিত হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের আলোচনায় অভিবাসী চোরাচালান, মানব পাচার ও মানি লন্ডারিংয়ের মতো অপরাধের বিষয়ও বাদ পড়েনি। অভিবাসী বিষয়ক একটি সংলাপ ইতোমধ্যে চলমান, যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক হয় এমনভাবে আন্তর্জাতিক শ্রমিক চলাচল বাড়ানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি 'ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ' কর্মসূচির সূচনা করেছে। বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমারের ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে যেভাবে উদারতার পরিচয় দিয়েছে, সে জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন পুনরায় সাধুবাদ জানিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যেভাবে রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক ও মানবিক সহায়তা প্রদান করেছে, সে জন্য ইইউকে ধন্যবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও চলমান শরণার্থী সংকটে সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় ইইউ বাংলাদেশকে সহায়তা করছে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে আরও পদক্ষেপ জরুরি, যাতে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, তাৎপর্যপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন হয়।
এ সংলাপে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রেখে এবং জাতিসংঘ সনদ অনুসারে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণে সম্মত হয়েছে। এ যুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে সংকট তৈরি হয়েছে এবং যুদ্ধে যে জীবনের ক্ষয় হয়েছে, সে জন্য উভয় পক্ষই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশ্বের ছয়জন বিশেষ নেতা যাঁরা খাদ্য, জ্বালানি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে জাতিসংঘের 'গ্লোবাল ক্রাইসিস রেসপন্স গ্রুপ'-এর চ্যাম্পিয়ন হিসেবে কাজ করছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁদের অন্যতম। বাংলাদেশ জাতিসংঘে শান্তিরক্ষী কার্যক্রমে অন্যতম সেরা অবদান রাখা দেশ। দেশটি বতর্মানে জাতিসংঘ পিস বিল্ডিং কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছে। উভয় পক্ষ দ্বন্দ্ব অবসান, মানবিক সহায়তা ও সংঘাত-পরবর্তী পর্যায়ে নারীর ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন রোধে পদক্ষেপের জন্য এবং বিশেষ করে জলবায়ু সম্মেলন কপ২৭-এ যুগান্তকারী পদক্ষেপের জন্য বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিশেষ প্রশংসা করেছে। বাংলাদেশের মতো যেসব দেশ সামান্য পরিমাণে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করেও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবের শিকার, সেসব দেশের জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে কপ২৭-এ লস ও ড্যামেজ ফান্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করে ইইউ।
তবে দুই পক্ষের মধ্যে এখনও অনেক অভিন্ন বিষয় রয়েছে, যা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এই রাজনৈতিক সংলাপ ও প্রস্তাবিত অংশীদারিত্ব সহযোগিতা চুক্তির মধ্যে সেসব বিষয় সামনে আসতে পারে। জাতিসংঘ ও এর অঙ্গীভূত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বিশ্বের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে বোঝাপড়া প্রয়োজন।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ উভয়েই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় ব্যবসায়িক পরিবেশের স্থায়িত্ব বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেছে। ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উভয় পক্ষই অধিকতর নিরাপদ, সবুজ ও স্থিতিশীল বিশ্ব গড়তে বদ্ধপরিকর এবং এ লক্ষ্যে কাজ করতে সম্মত।
নিক পাওয়েল: ইইউ রিপোর্টারের রাজনৈতিক সম্পাদক; ইইউ রিপোর্টার থেকে ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক