বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক থেকে ২৫-৩০ হাজার টাকা 'ঋণখেলাপি' হয়ে পাবনার ঈশ্বরদীর ১২ কৃষকের কারাবাস নিয়ে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যম যখন তোলপাড়, সেই শুক্রবার কাকতালীয়ভাবে আমি বগুড়ার কাহালুতে এক কৃষি খামারে অবস্থান করছিলাম। মন্দের ভালো, রোববারই জামিন পেয়েছেন ওই ১২ কৃষক ও অভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আরও ২৫ 'আসামি' কৃষক। (সমকাল, ২৮ নভেম্বর, ২০২২)।
যদিও আদালত জামিন দিয়েছেন, মামলা তো আর তুলে নেওয়া হয়নি। যে কৃষক ঝড়-ঝঞ্ঝা উপেক্ষা করে দেশের জন্য খাদ্য উৎপাদন করেন, তাঁদের এমন পরিণতি? তাঁদের 'অপরাধ'- ব্যাংক থেকে কৃষিঋণ নিয়ে তা সময়মতো পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। অথচ ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে যায়। স্বীকৃত ঋণখেলাপিরা রাজপথে চড়ে বেড়ান দামি গাড়িতে করে। এ ধরনের একটি মামলায় উচ্চ আদালত এরই মধ্যে তিরস্কার করেছেন দুদক আইনজীবীকে- রাঘববোয়ালদের কিছুই করছেন না; ধরছেন চুনোপুঁটিদের!
অথচ হাতকড়া লাগানো এসব কৃষক বিগত দশকে কয়েকবার বাম্পার ফসল ফলিয়েছেন। সেই উৎপাদন নিয়ে গালগল্পে মশগুল মন্ত্রী-এমপিরা। ওদিকে বারবার ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়েও কৃষক কাস্তে কোদাল মই হাতে পরের মৌসুমে ফিরে গেছেন ফসলের মাঠে। যে কৃষক রোদ-বৃষ্টি-ঝড় মহামারি উপেক্ষা করে প্রতিদিন সকালে মাঠে যান চাষাবাদ করতে; যে কৃষক আমাদের জন্য উৎপাদন করেন ধান গম ভুট্টা সবজি ফল; তাঁদের কোমরে দড়ি 'উপহার'? যাঁদের সম্মান জানানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তাঁদেরই করেছি অপরাধী!
দুই বছর আগে শুরু হওয়া একটি মহামারি থেকে আমরা সবেমাত্র বের হচ্ছি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে টালমাটাল হয়েছে বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনীতি। আসন্ন খাদ্য সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে বাংলাদেশ। পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন বারবার আহ্বান জানাচ্ছেন- এক ইঞ্চি জমিও খালি রাখা যাবে না; ঠিক সেই সময়ে এমন ঘটনা ঘটল দেশে!
বগুড়ার কাহালুতেই দেখলাম, এক কেজি আলুর দাম ১৫-১৭ টাকা। ঢাকায় সেই আলু বিক্রি হচ্ছে ৩০-৩৫ টাকায়। কৃষক যিনি প্রকৃত উৎপাদনকারী, তিনি পেয়েছেন ভোক্তা যে টাকায় কিনছেন তার অর্ধেক দাম। এর জন্য কৃষককে জমি চাষ, সার, নিড়ানি দিতে হয়েছে এবং ফলনের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত করতে হয়েছে। কৃষক তাঁর সময়, শ্রম ও অর্থ বিনিয়োগ করে পেয়েছেন অর্ধেক; আর বাকি অর্ধেক মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে পরিবহন এবং হাতবদলে।
কেন কৃষি ও খামারি খাতে এমন পরিস্থিতি? জিজ্ঞাসা ছিল প্রশিক্ষিত খামার মালিকের কাছে। তিনি দেখালেন- এক কেজির একটি সোনালি মুরগির জন্য তাঁকে আড়াই কেজি ফিড খরচ করতে হয়। পাশাপাশি খুদ-কুঁড়াসহ অন্যান্য দেশীয় খাবারও তাঁকে দিতে হয়। এভাবে এক কেজির একটি সোনালি মুরগির উৎপাদন খরচ পড়ে যায় ১২০ টাকা। তিনি বিক্রি করতে পারেন বড় জোর ১৮০-১৯০ টাকায়। তাতেই নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতেন। কিন্তু গবাদি পশু-পাখির খাদ্যের দামও যেভাবে বেড়ে চলছে, তাতে খামার টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
কৃষি খাতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সার, সেচ ও কীটনাশক। বিগত দুই বছরে সারের দাম বেড়েছে। কয়েক মাস আগে এক লাফে ১৬ থেকে ২২ টাকা হয়েছে কেজিপ্রতি। সেচের জন্য পল্লী বিদ্যুৎ যে সেবা দেয়, তা পর্যাপ্ত নয়। ফলে পাম্প চালাতে নির্ভর করতে হয় ডিজেলের ওপর। এক লাফে ৬৯ থেকে ডিজেলের দাম ১১৪ টাকা। এই ভয়াবহ চাপ অনুভব করছেন কৃষক। কৃষি খাতে যান্ত্রিক উপকরণের ব্যবহার বাড়ছে। ট্রাক্টর চালাতে ডিজেল এমনকি ধান কাটা যন্ত্রের ব্যবহারও শুরু হয়েছে। সেখানেও ডিজেলের ব্যবহার আছে। এরই মধ্যে বেড়েছে কীটনাশকের দাম।
পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে হয়তো কৃষককে ঋণ নিতে হয়। বাস্তবে কৃষক ঋণ নিতে আগ্রহী নন। ঋণকে তাঁরা ভয় পান বংশপরম্পরায়। তাঁদের পূর্বপুরুষ অনেকেই এক সময় মহাজনি ঋণের ফাঁদে জমি-জিরাত হারিয়েছেন। এনজিও ঋণও তাঁদের গলার কাঁটা।
আবার কৃষি উৎপাদনে সবকিছুর পরও একটা অনিশ্চয়তা থাকে। আকস্মিক বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, খরা, ধানের চিটা হয়ে যাওয়া প্রভৃতি বিষয় জলবায়ুর ওপর নির্ভরশীল। এই খাতে এই ঝুঁকি প্রবল। ঋণ নিয়ে কোনো কারণে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন না পেলে প্রান্তিক কৃষক সংকটে পড়ে যান। সেই প্রাপ্য ঋণের একটি অংশ চলে যায় দালাল, ফড়িয়া, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তাদের পকেটে।
ওদিকে বেসরকারি ব্যাংকগুলো কৃষিঋণে আগ্রহী নয়। এমন সব নিয়মকানুন করে রেখেছে, যেখানে একজন কৃষক বা খামারি এই ঋণ নিতে চাইবেন না। ঋণ নেওয়ার ছয় মাস পর তাঁকে কিস্তি দিতে হবে। এটি কৃষি খাতে বলতে গেলে অসম্ভব। কারণ, ফসলের উৎপাদন একটি নির্দিষ্ট সময়ে; বিক্রিও একটি নির্দিষ্ট সময়ে। ফলে বেসরকারি ব্যাংকের ঋণের বড় অংশ চলে যায় গ্রামীণ হাটের ফড়িয়াদের হাতে, যারা সস্তায় কৃষকের ফসল কিনে কিছুটা মজুত করে এবং এর বড় অংশ বিক্রি করে। হাতবদল হতে হতে বগুড়ার কাহালুর ১৫ টাকার আলু ঢাকার কারওয়ান বাজারে ৩৫ টাকায় পরিণত হয়।
কৃষক ও খামারিদের মূল চাওয়া হচ্ছে ফসলের ন্যায্যমূল্য। সরকার যে ধান কেনে, তাতে দলীয় লোকজনের কারসাজি থাকে। সেখানে প্রকৃত কৃষকের ফসল আগেই দলীয় লোকজনের কাছে চলে যায়। এই দলীয় লোকজন আসলে কারা? এরা হয়তো যে দল ক্ষমতায় আসে তাদের নেতাকর্মী। তাদের সঙ্গে ভিড়ে যায় গ্রামীণ হাটবাজারের এক দল ফড়িয়া। সিন্ডিকেট তৈরি হয়। সেখানে কারও কিছু করার থাকে না।
দেশে এক সময়ে কৃষক-ক্ষেতমজুর সংগঠন ছিল। মূলত বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো দ্বারা প্রভাবিত এসব সংগঠন কৃষক-ক্ষেতমজুরের পক্ষে কথা বলত। এখন জাতীয় রাজনীতির ডামাডোলে কৃষক-ক্ষেতমজুর সংগঠনগুলো অনেক দুর্বল। শহরে শিক্ষিত রাজনৈতিক কর্মীরা গ্রামে বসে আর কৃষক-ক্ষেতমজুরের কথা বলেন না। তাঁরা বক্তব্য দেন শহরে বসে। এই ফাঁকে কৃষক-ক্ষেতমজুরকে ঋণ দিয়ে 'সংগঠিত' করে রেখেছে এনজিওগুলো। তাতে আর যা-ই হোক, কৃষক আন্দোলন সংগঠিত হচ্ছে না। হাতকড়া পরা কৃষকের পাশে তাহলে কে দাঁড়াবে?
অবশ্য, এই জমিনের ইতিহাস বলছে, কৃষক জাগে অনেক বছর পরপর। যখন জাগে তখন খরস্রোতা নদীর মতো সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সেই স্রোতে ভেসে যায় অন্যায়-অবিচার।
রুস্তম আলী খোকন: সাবেক ছাত্রনেতা