নারীর প্রতি সহিংসতা অন্তর্জালেও যে বিস্তৃতি লাভ করিয়াছে, তাহা পূর্বেও আমরা জানিয়াছি। কিন্তু উহা কতটা ব্যাপকতা লাভ করিয়াছে, তাহা সমীক্ষার বরাতে সোমবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদনে উঠিয়া আসিয়াছে। প্রতিবেদনসূত্রে জানা যাইতেছে- দেশে অর্ধেকেরও অধিক সংখ্যক নারী নানাভাবে নিপীড়ন ও হয়রানির শিকার হইয়া থাকেন। এমনকি সহিংসতার শিকার হইয়াও উল্লেখযোগ্য নারী অভিযোগ জানাইতে আগ্রহী হন না। কারণ, অভিযোগের প্রক্রিয়াগুলো নারীবান্ধব নহে। অভিযোগ জানাইলেও অধিকাংশ নারী সামাজিক কলঙ্ক, ভুক্তভোগীর দোষারোপ ও গোপনীয়তা হারাইবার ভয়ে অনলাইনের মাধ্যমে বেনামে অভিযোগ জানাইতে চান। বস্তুত ইহার মাধ্যমে অন্তর্জালে আমরা নারীর এক অনিরাপদ ব্যবস্থাই দেখিতেছি।
তথ্যপ্রযুক্তির এই সময়ে কার্যসূত্রেই অন্তর্জাল আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সামাজিক মাধ্যম ব্যতিরেকে দাপ্তরিক কাজ ও যোগাযোগ, অনলাইন বাজার ও তথ্যের উৎস হিসেবে যেখানে সময়ের প্রয়োজনে সবাই অন্তর্জালের ওপর নির্ভরশীল- সেখানে এই মাধ্যমটিতে নারীর নাজুকতা নিঃসন্দেহে উদ্বিগ্ন হইবার জন্য যথেষ্ট। একশনএইড বাংলাদেশ পরিচালিত ওই সমীক্ষাটিতে উঠিয়া আসিয়াছে, ২০২২ সালে সহিংসতার শিকার নারীর প্রায় অর্ধেকই ফেসবুকে সহিংসতার শিকার হইয়াছেন। ইহা ব্যতীত মেসেঞ্জার, ইনস্টাগ্রাম, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব অর্থাৎ যে মাধ্যমটিই নারী ব্যবহার করিতেছেন, সেখানেই তাঁহারা হয়রানির শিকার হইতেছেন। সেখানে তাঁহাদের উদ্দেশ্য করিয়া ঘৃণ্য এবং আপত্তিকর যৌনতাপূর্ণ মন্তব্য করা এবং তাঁহাদের ইনবক্সে যৌনতাপূর্ণ ছবি পাঠানো হয়। আবার কাহারও নামে অন্য কেহ অনলাইনে নকল আইডি তৈরি করিবার ফলে তাঁহারা হয়রানির শিকার হইয়াছেন। অনেকে গোপনে নারীর কার্যকলাপ অনুসরণ করিয়া থাকেন। কেউ আবার ব্যক্তিগত ছবি সংশ্নিষ্টদের অনুমতি ছাড়াই সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করিয়া থাকেন।
উল্লিখিত বিভিন্ন প্রকারে নারী অন্তর্জালে হেনস্তার শিকার হইলেও বেদনাদায়ক ব্যাপার হইতেছে, অনেকেই তাহা মুখ বুজিয়া সহ্য করিয়া থাকেন। প্রতিকারের জন্য তাঁহারা সংশ্নিষ্ট দপ্তরে জানাইতেও নিরাপদ বোধ করিতেছেন না। আমরা জানি, অনলাইনে নারী হয়রানির বিরুদ্ধে পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন ইউনিট কাজ করিতেছে। তাহাদের তথ্য বলিতেছে, ভুক্তভোগী ৮৮ শতাংশ নারীই আইনি পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী নন। এখানেও তাঁহাদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি সামনে আসিতেছে। এই ক্ষেত্রে নারী কেন নিরাপদ বোধ করেন না, তাহা অনুধাবন করা কঠিন নহে। যাহারা নারীদের অনলাইন কিংবা অফলাইনে হয়রানি করে, তাহারা অনেকে নারীর পরিচিত, কেহ হয়তো নিকটাত্মীয়, সহপাঠী কিংবা সহকর্মী বা অন্য কেহ হইতে পারে। তাহাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে গেলে, অনেক ক্ষেত্রে বিপরীতে নারীই আরও ভয়ানকভাবে তাহার নেতিবাচক শিকার হন, সে দৃষ্টান্তও কম নহে। আমরা দেখিয়াছি, কর্মক্ষেত্রে যখন কোনো নারী তাঁহার সহকর্মী দ্বারা হয়রানির শিকার হন, তখন তিনি নিজেই কর্মস্থল ত্যাগ করিয়া নিপীড়ন হইতে রক্ষা পাইতে চাহেন। প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করিবার ক্ষেত্রে প্রশাসন ও সমাজের যে দুর্বলতা রহিয়াছে, ইহাই তাহার প্রমাণ।
তজ্জন্য আমরা দেখিতেছি, আলোচ্য সমীক্ষায় আরও উঠিয়া আসিয়াছে, অনলাইনে সহিংসতার শিকার হইলে অধিকাংশ নারী তীব্র মানসিক আঘাত পাইয়া থাকেন। তন্মধ্যে অনেক নারী ট্রমার মধ্যে পড়িয়া যান এবং নারী হিসাবে আত্মমর্যাদা হারান। এমনকি এর শিকার হইয়া তরুণীর আত্মহননের খবরও সংবাদমাধ্যমে আসিয়াছে। বর্তমানে যেহেতু কিশোরীরাও সামাজিক মাধ্যমসহ অনলাইনে বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করিতেছে, ফলে হয়রানি কিংবা সহিংসতার শিকার হইয়া বয়সের কারণেও তাহারা যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতে পারে।
অনলাইন ব্যবস্থাপনায় নারীর সতর্কতার উপদেশ দেওয়া এই ক্ষেত্রে যতটা না জরুরি, ততোধিক জরুরি সামষ্টিক দায়িত্বশীলতা। মনে রাখিতে হইবে, নারীর প্রতি সকল প্রকার হয়রানিই নারীর ক্ষমতায়ন, অগ্রগতি ও আর্থসামাজিক উন্নতির পথে অন্তরায়। এই জন্য প্রথমেই সামষ্টিকভাবে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন জরুরি। এই ক্ষেত্রে পারিবারিক, সামাজিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। একই সঙ্গে অভিযোগের প্রক্রিয়া সহজীকরণসহ অপরাধীর বিরুদ্ধে ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয়তা কাম্য।

বিষয় : সম্পাদকীয় অনিরাপদ অন্তর্জাল

মন্তব্য করুন