দেশের একমাত্র নৌ আদালত বিষয়ে বুধবার সমকালের এক প্রতিবেদনে যাহা তুলিয়া ধরা হইয়াছে, উহা সত্যই হতাশাজনক। প্রতিবেদন অনুসারে, তিন সহস্র পাঁচ শত মামলা বিচারাধীন থাকিলেও, রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ-বিআইডব্লিউটিএ ভবনে স্থাপিত আদালতে গত এক মাস যাবৎ কোনো বিচারক না থাকায় বিচার কার্যক্রম বন্ধ রহিয়াছে। বিষয়টা হতাশাজনক বলিবার অপর কারণ হইল, ঢাকার সিএমএম কোর্টের অধীন আদালতে বর্তমানে ১৭০টা লঞ্চ দুর্ঘটনার মামলা বিচারাধীন, যাহার কতিপয় এক যুগের পূর্বে দায়েরকৃত। অর্থাৎ এক যুগ অপেক্ষা করিবার পরও ঐসব লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিহতদের স্বজনরা অদূর ভবিষ্যতে ন্যায়বিচার পাইবে- এমন কথা বলা যাইতেছে না। মনে রাখিতে হইবে, নৌপরিবহন অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলিতেছে, দেশে গত অর্ধশতাব্দীতে দুই সহস্র ৫৭২টা নৌ দুর্ঘটনায় বিশ সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটিলেও মামলা হইয়াছে মাত্র ৬৩৪টা নৌ দুর্ঘটনায়; যেখানে মামলার সংখ্যা ৮৫৬। অর্থাৎ এমনিতেই নৌ দুর্ঘটনায় মামলা করার হার বেশ কম। এরই মধ্যে যদি বিচারের এহেন দীর্ঘসূত্রতা চলিতে থাকে, তাহা হইলে ভুক্তভোগীরা আইনি কোনো প্রতিকারের আশা সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করিতে পারেন। বিচারের এহেন দীর্ঘসূত্রতা এমন সময়ে ঘটিতেছে, যখন সাক্ষী না পাওয়ায় বহু মামলা অনিষ্পন্ন। ইহাও মনে রাখিতে হইবে, নৌ আদালতে বাহিরের কোনো আইনজীবীকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না বলিয়া অভিযোগ। নির্দিষ্ট কতিপয় আইনজীবী তথায় মামলা পরিচালনায় সুবিধা পাইয়া থাকেন। উপরন্তু বিচারের পরিবেশ লইয়াও অভিযোগ বিস্তর। বিচারের বাণী এই রূপে নিভৃতে ক্রন্দন করিতে থাকিলে যাহাদের দায়িত্বহীন আচরণ, তৎসহ মুনাফা ভোগের কারণে প্রাণঘাতী নৌ দুর্ঘটনাগুলি ঘটিয়া থাকে, তাহারা কখনোই শোধরাইবে না। ফলে নৌ দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল চলিতেই থাকিবে।
আমরা জানি, নৌপথে অন্যান্য পরিবহনের তুলনায় অধিকতর সময় ব্যয় হইলেও ভাড়া অনেকাংশেই কম। সম্ভবত সেই কারণে দেখা যায়, যাঁহারা নৌপথে অধিকাংশ সময় চলাচল করেন, তাঁহাদের অধিকাংশ নিম্ন উপার্জনক্ষম। দক্ষিণাঞ্চলের বহু ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী আছেন, যাঁহারা সমগ্র রাত্রে লঞ্চে নিদ্রা যাইয়া রাজধানীতে পদার্পণ করেন; সমগ্র দিবস ব্যবসার পণ্যাদি ক্রয় করিয়া পুনরায় রাত্রিকালে লঞ্চে এলাকায় ফিরিয়া যান। অনেকের ধারণা, নৌপরিবহন যাত্রীদের এই শ্রেণিগত অবস্থানের কারণে একেক দুর্ঘটনায় ডজন ডজন মৃত্যু ঘটিলেও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক মহলকে ইহাতে খুব একটা উদ্বিগ্ন হইতে দেখা যায় না। এমনকি এই রূপ দুর্ঘটনা ঘটিবার পর- উহার ক্ষয়ক্ষতি যত ভয়াবহই হউক না কেন; জনপরিসরেও উহা লইয়া কিছুদিন আলোচনার পর বিষয়টা থিতাইয়া যায়। সম্ভবত ইহারই প্রতিফলন ঘটিতেছে দেশের একমাত্র নৌ আদালতের উপর্যুক্ত দুরবস্থায়। বলা বাহুল্য, নৌযান মালিক অধিকাংশই সমাজের বিত্তশালী। রাজনৈতিকভাবেও তাঁহাদের প্রভাব কিঞ্চিৎ নহে। নৌ অধিদপ্তরের প্রকৌশলীসহ অন্য কর্মকর্তারাও বিবিধ কারণে সমাজের সুবিধাপ্রাপ্ত অংশেরই সদস্য। এই কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, নৌ দুর্ঘটনার জন্য মালিকের মুনাফা লোটা এবং নৌ কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতা প্রধানত দায়ী হইলেও তাঁহারা স্পর্শ-বহির্ভূতই থাকিয়া যান। নৌ আদালতের দুরবস্থার পশ্চাতেও যে উহাদের কারসাজি নাই, তাহা কে বলিতে পারে?
যাহাই হউক, আমাদের বক্তব্য হইল, নদীমাতৃক বাংলাদেশে নৌপরিবহনের গুরুত্ব যেমন কমানো যাইবে না, তেমনি এই খাতে দুর্ঘটনা এবং অন্যান্য অনিয়ম-অব্যবস্থাপনাও বেশি দিন চলিতে দেওয়া যায় না। তজ্জন্য অবিলম্বে নৌ আদালতের দিকে নজর দিতে হইবে। ইহারই অংশ হিসাবে নৌ আদালতকে মূলধারার আদালতে পরিণত করার জন্য আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা যে সকল দাবি জানাইয়াছেন, অবিলম্বে তাহা বাস্তবায়ন প্রয়োজন বলিয়া আমরা মনে করি। আদালতের সংখ্যা বৃদ্ধি, তৎসহিত দক্ষ বিচারক নিয়োগ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিষয় : সম্পাদকীয় হতাশাজনক

মন্তব্য করুন