নামাজ ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো আদায় করার ক্ষেত্রে ইমাম-মুয়াজ্জিনের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আগে আজান দেওয়া ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান। এর দ্বারা দৈনিক পাঁচবার আল্লাহর একত্ববাদ ও বড়ত্বের ঘোষণা দেওয়া হয়। আজানের ধ্বনিতে খোলে আকাশের দুয়ার; কবুল হয় বান্দার ফরিয়াদ। ইমাম সাহেব পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের নেতৃত্ব দেন। এ ছাড়াও মুসল্লিদের নামাজ শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামের মৌলিক বিষয়ে ধারণা দেন।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার পরও তাঁরা ন্যায্য সম্মানী পান না। ২৮ নভেম্বর প্রকাশিত সমকালের একটি প্রতিবেদনে নাটোরের একটি উপজেলার চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের শিরোনামে যথার্থই বলা হয়েছে- ভালো নেই ইমাম-মুয়াজ্জিনরা। বস্তুত সেটি সারাদেশেরই চিত্র। ইসলামিক ফাউন্ডেশন কার্যালয় সূত্রে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলায় ৪৪৪টি মসজিদ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮০টি ওয়াক্তিয়া। বাকিগুলো জামে মসজিদ। প্রায় প্রতিটিতেই একজন ইমাম ও মুয়াজ্জিন রয়েছেন। তাঁদের মাসিক বেতন ৪-৫ হাজার টাকা। এই টাকায় তাঁদের সংসার চলে কীভাবে?
ইমাম-মুয়াজ্জিনরা শুধু জীবিকার তাগিদে দায়িত্ব পালন করেন না। তাঁরা ইমামতি ও মুয়াজ্জিনির পেশাকে দ্বীন ইসলামের পবিত্র ও গুরুদায়িত্ব মনে করেন। হাদিসে বর্ণিত রাসুলে পাক (সা.) এরশাদ করেন, 'কিয়ামতের দিন মুয়াজ্জিনদের মাথা সবার থেকে উঁচু থাকবে।' (সহিহ মুসলিম)। মসজিদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হলেন ইমাম। নামাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব তাঁর ওপর ন্যস্ত। দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী, বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষকেই ইমামের পেছনে নামাজ আদায় করতে হয়।
মুসলিম সমাজে ইমামের গুরুত্ব ও ভূমিকা অনস্বীকার্য। ইমাম শব্দের অর্থ পথপ্রদর্শক, নেতা ও পরিচালক। রাসুলে পাক (সা.) ইসলামের প্রথম ইমাম ছিলেন। তারপর খোলাফায়ে রাশেদিন ইমামতির গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন। ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে ইমামকে পূর্ণ এখতিয়ার দিয়ে নামাজ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর জন্য বিশেষ অবস্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। রাসুলে পাক (সা.) এরশাদ করেন, ইমাম হলেন সালাতের সার্বিক জিম্মাদার, আর মুয়াজ্জিন হলেন আমানতদার। হে আল্লাহ, ইমামদের সঠিক পথ প্রদর্শন করুন এবং মুয়াজ্জিনদের ক্ষমা করুন। (তিরমিযি)
ইসলামের বিধান অনুযায়ী ইমাম-মুয়াজ্জিন যথাযথ সম্মান ও সম্মানী পাওয়ার হকদার। জুমার খুতবায় ইমাম মুসল্লিদের সামনে সমাজের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে তার ধর্মীয় সমাধান ব্যাখ্যা করেন। সমাজের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে সম্প্রীতি ও ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে উদ্বুদ্ধ করেন এবং শিশু-কিশোরদের ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও ইমামরা বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।
দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সময়ানুবর্তিতা মেনে ২৪ ঘণ্টার চাকরি করা সত্ত্বেও প্রতিদান বা বিনিময় হিসেবে ইমাম-মুয়াজ্জিন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যে বেতন বা মাসিক সম্মানী পান, তা দিয়ে পরিবার-পরিজনের ব্যয়ভার বহন করা কষ্টসাধ্য- এতে কোনো সন্দেহ নেই। সুতরাং তাঁদের বেতন-ভাতা মানসম্মত ও ইনসাফপূর্ণ হওয়া সময়ের দাবি।
ইমাম-মুয়াজ্জিন যদি তাঁদের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অন্য কোনো পেশায় নিয়োজিত হতে চান তাতেও আমরা বাধা দিই। কারণ এতে তাঁদের ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদাহানি হয়। ইমাম-মুয়াজ্জিনকে আমরা শুধু ধর্মীয় কাজেই দেখতে চাই। নম্র-ভদ্র-শালীন-মার্জিত, অমায়িক আচরণ; এক কথায় ভালো গুণের সমাবেশ তাঁদের মধ্যে সবসময় দেখতে চাই। এসব আমাদের উন্নত চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। সমাজের অনুকরণীয় ব্যক্তিদের এমন গুণের অধিকারী হওয়াই সবার কাম্য।
সমকালের প্রতিবেদনে তাঁদের বেতনের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা বেদনাদায়ক। শহরে ইমাম-মুয়াজ্জিনের বেতন-ভাতা কিছুটা মানসম্মত হলেও গ্রামাঞ্চলে খুবই খরাপ অবস্থা। কীভাবে তাঁরা তাঁদের সংসার পরিচালনা করেন, সে ব্যাপারে আমরা খুব কমই অবগত। তাঁদের অভাব-অভিযোগ কেউ শুনতে চাই না। তাঁদের স্ত্রী-সন্তান, মা-বাবা আছেন। ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন তাঁদের বাড়িতেও বেড়াতে আসেন। এত অল্প টাকায় তাঁরা কীভাবে সংসার চালান, তা নিয়ে আমরা কখনও ভাবি না। আজকাল বাজারে পণ্যের দাম ক্রমেই বেড়ে চলেছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এ দুঃসময়ে ইমাম-মুয়াজ্জিন কীভাবে তাঁদের সংসার চালাচ্ছেন তার খোঁজ-খবর রাখা প্রত্যেক মুসল্লির বিশেষ করে যাঁরা সমাজের বিত্তশালী ও মসজিদ কমিটির দায়িত্বে রয়েছেন; তাঁদের কর্তব্য।
শহর ও গ্রামের মসজিদের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের উদ্যোগ ও সদিচ্ছায় ইমাম-মুয়াজ্জিনও সচ্ছল জীবনযাপনে সক্ষম হতে পারেন। বর্তমান সরকার ইসলামের খেদমতে অনেক কাজ করে যাচ্ছে। পাশাপাশি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে মসজিদ কমিটি ও সরকার-সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে ইমাম-মুয়াজ্জিনের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো তৈরি করে তা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। যাঁদের মহান আল্লাহ সম্মানের জায়গায় নিযুক্ত করেছেন এবং যাঁরা আমাদের ইবাদত-বন্দেগি করতে ও সমাজে শান্তি-সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখছেন, তাঁরা অবশ্যই যোগ্য সম্মান ও সম্মানী পাওয়ার হকদার।
ড. মো. শাহজাহান কবীর: চেয়ারম্যান ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি