১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের ২৫ বছরের মাথায় আনন্দ-উল্লাসের মধ্য দিয়ে আজ চুক্তি দিবস পালন করার কথা ছিল। কিন্তু ২৫ বছরেও এ চুক্তি বাস্তবায়ন হয়নি। চুক্তি স্বাক্ষরকারী জনসংহতি সমিতিকে এটি বাস্তবায়নে লড়াই চলমান রাখতে হচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় এ চুক্তি। এর মাধ্যমে পাহাড়ের দীর্ঘ দুই যুগের অধিক কাল ধরে চলা সশস্ত্র সংগ্রামের অবসান ঘটে। চুক্তিতে মোট চারটি খণ্ড রয়েছে- ক, খ, গ, ঘ। মোট চার খণ্ডের এই চুক্তি একটি ঐতিহাসিক দলিল।
চুক্তির চারটি খণ্ডের মধ্যে ক) সাধারণ, খ) পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ/পার্বত্য জেলা পরিষদ, গ) পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, ঘ) পুনর্বাসন, সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন ও অন্যান্য বিষয়। ক খণ্ডে চারটি, খ খণ্ডে ৩৫টি, গ খণ্ডে ১৪টি এবং ঘ খণ্ডে ১৯টি ধারার বিবরণ আছে। অধিকাংশ ধারার সঙ্গে আবার বিভিন্ন উপধারা সংযুক্ত।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ক খণ্ডের প্রধানতম ধারাটি হচ্ছে- পার্বত্য এলাকা 'উপজাতি' অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হবে। সেই সঙ্গে এই বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করার প্রয়োজনীয়তাও এই ধারায় স্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু চুক্তির ২৫ বছরের মধ্যে এই চিত্রের উল্টো জনমিতি লক্ষ্য করা যায়। পাহাড়ি ও বাঙালি জনসংখ্যার অনুপাতের পরিবর্তন শুরু হয়েছে। সর্বশেষ জনশুমারি বলছে, পাহাড়ের জুম্ম জনগণের হার কোথাও কোথাও ৫০ শতাংশের নিচে চলে গেছে। সুতরাং 'উপজাতি' অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা এবং বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা শুধু কাগজ-কলমেই স্বীকৃত।
চুক্তি অনুযায়ী স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে পৃথক ভোটার তলিকা প্রণয়ন করে পার্বত্য তিন জেলা পরিষদের নির্বাচন করার কথা ছিল। সরকার সেই ভোটার তালিকা প্রণয়নের কাজই শুরু করতে পারেনি। ফলে ২৫ বছর ধরে অনির্বাচিত এবং সরকারের মনোনীত ব্যক্তিরা তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ পরিচালনা করে আসছেন। জেলা পরিষদের নির্বাচিত সদস্যরাই পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ সদস্যদের নির্বাচন করবেন। যেহেতু জেলা পরিষদেরই নির্বাচন হচ্ছে না, সেহেতু আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচনও বন্ধ হয়ে আছে। চুক্তির পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন আঞ্চলিক পরিষদকেই আজ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি নিষ্পত্তি কমিশন গঠন এবং নিষ্পত্তির জন্য আইন প্রণীত হয়েছে। চরম সত্য হচ্ছে, সেই ভূমি কমিশন একটি ভূমি বিরোধও নিষ্পত্তি করেনি। চুক্তির মধ্য দিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ তিন পার্বত্য জেলার সর্বোচ্চ প্রশাসনিক স্তর কিংবা কাঠামো। সেই আঞ্চলিক পরিষদকে অকার্যকর রেখে, পাশ কাটিয়ে তিন পার্বত্য জেলার প্রশাসনকে পরিচালনা করা হচ্ছে। তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় পুলিশসহ ১২টি প্রশাসনিক বিষয় হস্তান্তরের কথা উল্লেখ করা আছে। কিন্তু যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, তার অধিকাংশই হস্তান্তর করা হয়নি। ভারত প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থী এবং বিভিন্ন সময় বাস্তুচ্যুত অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনে গঠিত টাস্কফোর্সও কার্যত নিষ্ফ্ক্রিয়। চুক্তি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণে একটি কমিটি কাজ করছে। সেই পরিবীক্ষণ কমিটির নির্দিষ্ট লোকবল নেই। এমনকি কার্যালয় পর্যন্ত নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক একটি মন্ত্রক আছে। মন্ত্রী বাদে সেই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারীদের মধ্যে জুম পাহাড়ের বাসিন্দার সংখ্যা হাতে গোনা। এই হচ্ছে মোটা দাগে চুক্তি বাস্তবায়নের চিত্র।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। পরবর্তী বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কিছু সময় বাদ দিলে অধিকাংশ সময় চুক্তি স্বাক্ষরকারী দলটিই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকেছে। বিশেষ করে বর্তমানে টানা তৃতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। দলটির প্রতিটি নির্বাচনী ইশতেহারে চুক্তি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা হয়েছে। তারপরও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো অবাস্তবায়িত।
১৯৯৭ সালের চুক্তি স্বাক্ষর করার মূল স্পিরিট ছিল- নিরাপত্তার চশমা দিয়ে নয়, রাষ্ট্রীয় বল প্রয়োগের মধ্য দিয়েও নয়; পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা একটি জতীয় সমস্যা এবং এই সমস্যার সমাধান হবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়। এই দর্শন ধারণ করেই সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে উপনীত হয়েছিল। চুক্তির ২৫ বছরের মাথায় দাঁড়িয়ে আমাদের রাষ্ট্র আবার পুরোনো নীতিতে ফিরে যেতে শুরু করেছে। জুম পাহাড়ের সমস্যাকে নিরাপত্তার চশমায় দেখার প্রবণতা এখন বাড়ন্ত। সেখানে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হচ্ছে। জেএসএসের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মামলার পর মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে।
চুক্তি স্বাক্ষরকারী দল হিসেবে জনসংহতি সমিতি ও সরকারের মধ্যে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজ করার কথা ছিল। সেটা না হয়ে সরকারের স্থানীয় বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ জনসংহতি সমিতির নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। নিয়মিত মিথ্যা মামলায় জর্জরিত হয়ে জেএসএসের অধিকাংশ নেতাকর্মী এখন কার্যত এলাকাছাড়া। এ ছাড়াও চুক্তির ২৫ বছরে পাহাড়ে অনেক জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক হামলা সংঘটিত হয়েছে। রাঙামাটির বাঘাইহাট, বগাছড়ি, লংগদু; খাগড়াছড়ির মহালছড়ি ও তাইন্দংয়ে পাহাড়ি মানুষের বহু গ্রাম ও বসতভিটা আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। খোদ খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলা শহর সাম্প্রদায়িক আক্রমণের কবলে পড়েছে। এসব সাম্প্রদায়িক হামলা ও বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সংশ্নিষ্ট অপরাধী শাস্তি পেয়েছে বলে তেমন কোনো তথ্য নেই। জুমিয়া নারীদের ওপর সহিংসতা, যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যার মতো নৃশংস ঘটনার সংখ্যাও কম নয়। ধর্ষক, খুনি, যৌন নিপীড়করা বরাবরই বিচারের বাইরে থেকে গেছে।
২৫ বছরে কোনো সরকারই এমন দৃষ্টান্ত দেখাতে পারেনি, যেখানে অপরাধের বিচার হয়েছে। ভুক্তভোগী কিংবা আক্রান্ত মানুষ ন্যায়বিচার পেয়েছে- সে ধরনের সুখবর কেউ পেয়েছে বলেও শোনা যায়নি। জুমিয়া মানুষের ভূমি জবরদখল তো ডালভাত। হরহামেশা ভূমি দখল হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সংখ্যা সম্প্রসারণের কারণে তাদের আবাসন ও ক্যাম্প নির্মাণ, ট্রেনিংয়ের স্থান নির্বাচন ইত্যাদি অজুহাতে ভূমি অধিগ্রহণের মাত্রা বেড়েছে। ইদানীং যোগ হয়েছে সীমান্ত সড়ক। সীমান্ত সড়ক তৈরির অজুহাতে কোনো নোটিশ জারি না করে ভূমি অধিগ্রহণ ব্যতিরেকেই জুমিয়া মানুষকে বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। পর্যটনের নামে জুমিয়া মানুষের ভূমি দখল করা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন কোম্পানিকে অবৈধ লিজ প্রদান। চুক্তি-পরবর্তী ২৫ বছরে উন্নয়নের নাম দিয়ে পাহাড়ের প্রাণবৈচিত্র্য, ভূ-প্রকৃতি, প্রতিবেশ, বন-বনানীর সর্বনাশ করা হয়েছে। পাহাড়ের ঝিরি-ঝরনা থেকে প্রাকৃতিক পাথর লুণ্ঠন করে পানির উৎস ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। পাহাড়ে এখনও হাম, ডায়রিয়ায় শিশুমৃত্যুর ঘটনা অহরহ। প্রান্তিক জুমিয়া মানুষের জুম চাষের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়েছে। তাই প্রায়ই দূরবর্তী পাহাড়ি জনপদে খাদ্য সংকট দেখা দেয়। সুপেয় পানির সন্ধানে নারীদের মাইলের পর মাইল পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। অথচ এসবের অবসান হওয়ার জন্যই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু এখন জুম্ম জনগণ মনে করতে শুরু করেছে, রাষ্ট্র ও সরকার তাদের ঠকিয়েছে। বঞ্চিত জুম্ম জনগণ বঞ্চিতই রয়ে গেছে।
১৯৯৭ সালের চুক্তি স্বাক্ষরের আগের সময়ে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, ভারতের শরণার্থী জীবন- এসব মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক কমিশন একটি প্রতিবেদনধর্মী পুস্তক প্রকাশ করেছিল। বইটির নাম ছিল 'জীবন আমাদের নয়'। নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে, চুক্তি স্বাক্ষরের ২৫ বছরে এসেও জুম্ম জনগণের জীবন তাদের হয়নি।
দীপায়ন খীসা: তথ্য ও প্রচার সম্পাদক, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম