মূল কথায় যাওয়ার আগে এখানে 'ধাঁধা' ও 'রহস্য' শব্দ দুটি যে অর্থে ব্যবহূত হবে, তা একটু বলে নেওয়া দরকার। গ্রেগরি ট্রেভরটন নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক সিনিয়র ইন্টেলিজেন্স অফিসার এই শব্দ দুটিকে আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত করে বলেছেন, এখন কোনো সরকার যদি ভালোভাবে দেশ চালাতে চায়, তাহলে তাদের এ দুটি শব্দের অর্থ বুঝতে হবে এবং এটাও বুঝতে হবে- এখন সমস্যাগুলোকে আর 'ধাঁধা' হিসেবে দেখলে চলবে না; সেগুলোকে 'রহস্য' হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
কিছুদিন আগ পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রের সমস্যাগুলো 'ধাঁধা' হিসেবে দেখলেও চলত। যেমন ১৯৬২ সালে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের ৩৮টি জাহাজ কিউবায় নোঙর করল, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ধাঁধায় পড়ে গেল। সেটা সমাধানে তাদের দুটো কাজ করতে হয়। স্পাই প্লেন দিয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু যখন '৯/১১'-এর আক্রমণ হলো, তখন তা রুখে দিতে তথ্যের কোনো অভাব ছিল না। মার্কিন সরকার জানত, ২০০১ সালে কিছু একটা ঘটবে। ঘটনার আগে বস্টন এয়ারপোর্টে ছবি তোলার সময় এবং আরিজোনায় ফ্লাইট প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময় আল কায়দার দুই সদস্যকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। আসল অভাবটা ছিল অন্য জায়গায়- প্রাপ্ত তথ্য বিশ্নেষণে। এ ক্ষেত্রে 'কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস' ছিল 'ধাঁধা' আর '৯/১১' হলো 'রহস্য'। ধাঁধা সমাধানে লাগে তথ্য এবং রহস্য ভেদ করতে লাগে তথ্যের বিশ্নেষণ।
ট্রেভরটন বলেন, এখন যেহেতু তথ্যের অভাব নেই এবং এই যুগের মূল সমস্যাগুলো যেহেতু রহস্যাবৃত, সেহেতু এখন তথ্য বিশ্নেষণই বেশি জরুরি। মেডিকেল সায়েন্সের কথা ধরা যাক। আগে প্রোস্টেট ক্যান্সার ছিল একটা 'ধাঁধা'। ডাক্তার চেকআপ করে কিছু তথ্য নিয়ে অপারেশন করে ফেলতেন। কিন্তু এখন বিষয়টা অত সহজ নয়। বিভিন্ন রোগীতে যেহেতু পার্থক্য, সে কারণে রোগীর মানসিকতা বুঝেই ডাক্তারকে এগোতে হয়।
আমরা মানুষের আয়ুস্কালের কথা ধরলে দেখব, সেটা ১৯৫০ ও '৬০-এর দশকে বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। কিন্তু গত দু-তিন দশকে সেটা আর তেমন বাড়ছে না, বরং কোথাও কোথাও কমছে। এটা যে ডাক্তার, হাসপাতাল বা ওষুধের ঘাটতির কারণে হচ্ছে, তা নয়। এটা হচ্ছে মূলত আগের চেয়ে অনেক সচ্ছল ও আরামদায়ক জীবনযাপনের কারণে। যেমন প্রাচুর্যের কারণে ডায়াবেটিস এমনভাবে বাড়ছে; ২০৩০ সালে গিয়ে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যাবে। সবকিছু জানা সত্ত্বেও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করাটা যে কঠিন হচ্ছে, এর কারণ এটা একটা 'রহস্য'; 'ধাঁধা' নয়। এই নিয়ন্ত্রণ যতটা ওষুধে হয়, এর চেয়ে বেশি হয় জীবনযাপন পদ্ধতির পরিবর্তনে।
শিক্ষাক্ষেত্রেও একই কথা। আগে শিক্ষার উন্নয়নে তথ্য সংগ্রহ করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলেই হতো। যেমন শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত, অবকাঠামো, জাতীয় শিক্ষাক্রম ইত্যাদি ক্ষেত্রে তথ্যের ভিত্তিতে বিনিয়োগ করে পাবলিক পরীক্ষায় ভালো ফল লাভ করাকেই যথেষ্ট বলে মনে করা হতো। এখন বিষয়টি আর এত সহজ নয়। এখন আর পাবলিক পরীক্ষার ভালো ফলকে গুণগত শিক্ষার সমার্থক বলে মনে করা হচ্ছে না। কারণ, এখন জ্ঞানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীর দক্ষতা ও সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি বা মূল্যবোধ অর্জনেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এটা যেমন আগের মতো বই পড়ে পাওয়া যায় না; তেমনি খাতা-কলমের পরীক্ষা দিয়েও তা মাপা যায় না। ফলে শিক্ষকের ভূমিকা আগে যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এখন তার চেয়ে অনেক বেশি। আগে একজন ৮০তম পার্সেন্টাইলের শিক্ষক দেড় বছরের পড়া এক বছরে পড়িয়ে ফেলতে পারতেন। অন্যদিকে একজন ২০তম পার্সেন্টাইলের শিক্ষক এক বছরের পড়া দেড় বছর পড়াতেন। নতুন শিক্ষাক্রমে শেখানোর বিষয়টা বহুমাত্রিক হবে বলে শিক্ষকের ভূমিকা আরও বেড়ে যাবে।
কিন্তু একজন শিক্ষক ভালো কি মন্দ, সেটি বোঝা খুব সহজ নয়। আমরা সাধারণত শিক্ষার্থীদের ফল দেখে শিক্ষকের যোগ্যতা মাপি। কিন্তু ভালো ফল শুধু শিক্ষকের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে শিক্ষার্থী, শিক্ষার্থীর পরিবার, তার ভৌগোলিক ও সামাজিক অবস্থান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও জড়িত। আবার একজন শিক্ষকও যে তাঁর সাবজেক্টের সব অংশে সমান ভালো, তা নয়। একজন গণিত শিক্ষক ক্যালকুলাসে ভালো হলেও অ্যালজেব্রাতে খারাপ হতে পারেন। বছর বছর শিক্ষকের মানেরও পরিবর্তন হয়। তিনি হয়তো এই বছর ভালো পড়াচ্ছেন না, কিন্তু চেষ্টা করলে পরের বছর ভালো পড়াতে পারেন। দেখা যায়, অনেক শিক্ষক শুধু ভালো শিক্ষার্থী পেলে ভালো পড়াতে পারেন। শিক্ষার্থী খারাপ হলে আর পারেন না।
বাংলাদেশে অবকাঠামোর মতো এমন কিছু সমস্যা এখনও রয়ে গেছে, যাকে ধাঁধা হিসেবে বিবেচনা করে সমাধান করা যায়। কিন্তু কিছু সমস্যা আছে যা রহস্য। যেমন সোজাসাপ্টা শিক্ষকের সংখ্যা বাড়িয়ে সব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত কমানো যাবে না। সবাই ভালো স্কুলে তাঁদের সন্তানকে ভর্তি করতে চান বলে নামকরা স্কুল-কলেজে এই অনুপাতটা কমবে না। এ সমস্যা সমাধানে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নানাভাবে সমতা নিয়ে আসতে হবে।
শিক্ষার মান বাড়াতে যেটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেই শিক্ষকের মর্যাদা আগের মতো সহজ-সরলভাবে শুধু সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে সম্ভব নয়। শিক্ষকের যোগ্যতা, শিক্ষার প্রতি তাঁর কমিটমেন্ট এবং তাঁর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে।
অর্থাৎ বাংলাদেশের শিক্ষার পুরোনো অনেক অমীমাংসিত 'ধাঁধা'র যেমন সমাধান করতে হবে, তেমনি এখন যে নতুন নতুন 'রহস্য' তৈরি হয়েছে, তাও নানা উপায়ে ভেদ করতে হবে। না হলে কাঙ্ক্ষিত গুণগত শিক্ষা দূরস্থই থেকে যাবে।
সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক: মাউশি ও নায়েমের সাবেক মহাপরিচালক