প্রাণঘাতী এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত এইডস রোগীর সংখ্যা দেশে বৃদ্ধির খবর উদ্বেগজনক। যদ্যপি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলিতেছে, দেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, প্রবাসী শ্রমিক, শিরায় মাদক গ্রহণকারী এবং যৌনকর্মীদের মধ্যে এইডসে আক্রান্তের হার অধিক; কিন্তু ইহা যে সাধারণের মধ্যেও ছড়াইয়া যাইতে পারে, তাহা অনুধাবন করিয়া প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যাবশ্যক। বিশেষ করিয়া সমকালের প্রতিবেদনে আমরা দেখিয়াছি, এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্তদের এক-চতুর্থাংশই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। এই ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে তাই তাহাদের উপর বিশেষ দৃষ্টিদান আবশ্যক। বিশেষ করিয়া, রোহিঙ্গাদের মধ্যে ব্যাপক পরীক্ষা চালাইয়া তাহাদের চিকিৎসা যেমন নিশ্চিত করিতে হইবে, তেমনি তাহারা যেন সাধারণের মধ্যে মিশিয়া না যায়, সেদিকেও নজর রাখিতে হইবে।
সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদন অনুসারে, দুই দশকের মধ্যে গত বৎসর সর্বাধিক দুই শতাধিক এইডস রোগী মৃত্যুবরণ করিয়াছে। এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসা নিশ্চিত করিলে তাহারা আরোগ্যলাভে সক্ষম হইত। ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা হেতু মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমবর্ধমান বলিয়া আমাদের ধারণা। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশের এক-তৃতীয়াংশ জেলায় এইডস চিহ্নিতকরণসহ চিকিৎসা এবং সচেতনমূলক কর্মকাণ্ড যে পদ্ধতিতে চলমান, তাহা লইয়া প্রশ্ন উত্থাপন স্বাভাবিক। বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারত, মিয়ানমার ও নেপালে এইডস মহামারি আকারে ছড়াইয়া পড়িয়াছে বলিয়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যে উঠিয়া আসিয়াছে। বাংলাদেশ অদ্যাবধি মৃদু আক্রান্তের দেশ রূপে পরিগণিত হইলেও প্রতিবেশী দেশগুলির বর্ধমান অবস্থানের কারণে আমাদের ঝুঁকি অধিক বলিয়াই অতিরিক্ত সতর্কতা ও কার্যকর ব্যবস্থা জরুরি। পার্শ্ববর্তী দেশগুলিতে এইচআইভি সংক্রমণের বিস্তৃতির তুলনায় আমাদের দেশে তাহা কিঞ্চিদূন বলিয়া আত্মতুষ্টির অবকাশ নাই। মিয়ানমারের প্রভাবই এই দেশের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইডস রোগীর আধিক্যের কারণ হইতে পারে।
যদ্যপি জাতিসংঘের সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তথ্যে বাংলাদেশে দেড় সহস্র মানুষের মধ্যে এইচআইভি চিহ্নিত হইবার বিষয়টি উঠিয়া আসিয়াছে; বাস্তবে সংখ্যাটি ততোধিক হইতে পারে বলিয়া আমাদের ধারণা। এখানে আরও অনেকে যে ঝুঁকিতে রহিয়াছে, তাহাও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করিয়া দিয়াছেন। কিন্তু উদ্বেগের কারণ হইল, দেড় সহস্রের মধ্যে চিকিৎসাধীন প্রায় অর্ধেক রোগী। তজ্জন্যই আমরা মনে করি, প্রতিটা জেলায় এইচআইভি পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকা বাঞ্ছনীয়। আমাদের শঙ্কা, অধিকাংশ জেলাতেই এইচআইভি ভাইরাস পরীক্ষার সুযোগ না থাকায় অনেকেই শনাক্তের বাহিরে রহিয়াছে। আমরা জানি, এইচআইভি ভাইরাসের লক্ষণ ব্যাপকতা পাইতে অনেক সময় লাগিয়া যায়। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হইবার কয়েক মাস পর জ্বর, গলাব্যথা কিংবা মাথাব্যথার মতো সাধারণ যে লক্ষণ দেখা যায়, তাহা অনেকে স্বাভাবিক ভাবিয়া লইতে পারেন। যেখানে এইচআইভি কোনো লক্ষণ ছাড়াই কয়েক বৎসর পর্যন্ত মানবদেহে বাস করিতে পারে, সেখানে ইহার পরীক্ষা সর্বব্যাপী না হইলে অনেক রোগী সুস্থ মনে করিতে পারে এবং তাহার মাধ্যমে অন্যান্য ব্যক্তিও সংক্রমিত হইতে পারে।
আমরা মনে করি, এইচআইভি ছড়াইবার অন্যতম কারণ অসচেতনতা। এই ক্ষেত্রে কুসংস্কারও কম দায়ী নহে। রক্তদাতার মাধ্যমেও এই ভাইরাস অপরের শরীরে প্রবেশ করিতে পারে। ইতোপূর্বে দেখা গিয়াছে, প্রবাসী ব্যক্তি দেশে আসিবার পর তাহার এবং তাহার স্ত্রীও এইডস রোগে আক্রান্ত হইয়াছে। ফলে আমরা মনে করি, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করিতেই হইবে। বিশেষ করিয়া প্রবাসী ব্যক্তিরা দেশে আসিবার পর তাহাদের এইচআইভি ভাইরাস পরীক্ষা অত্যাবশ্যক। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও মাদকসেবীদের মধ্যে যেহেতু আক্রান্তের হার অধিক, সেহেতু চলাচল সীমিত করিয়া তাহাদের মধ্যে ব্যাপক পরীক্ষার ব্যবস্থা করা চাই। অন্যথায় এইচআইভি ভাইরাস সাধারণ মানুষদের মধ্যে আরও ব্যাপকভাবে ছড়াইয়া পড়িতে পারে।
যেহেতু এইচআইভি ভাইরাসে রোহিঙ্গারা বেশি আক্রান্ত হইয়াছে, সেহেতু ইহা প্রতিরোধে আমাদের জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় এই জনগোষ্ঠীকে বিশেষভাবে রাখিয়া প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ লইতে হইবে। তজ্জন্য তাহাদের সচেতন করিতে এবং রোহিঙ্গা শিবিরগুলিতে মাদকের কর্মকাণ্ড বন্ধে সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। অন্যথায় এইচআইভি ভাইরাস স্থানীয় জনগোষ্ঠীসহ সমগ্র দেশকেই হুমকিতে ফেলিবে।

বিষয় : সম্পাদকীয় সতর্কবার্তা

মন্তব্য করুন