যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা জোট 'ভাইটাল সায়েন্স' প্রণীত স্বাস্থ্যসেবাবিষয়ক সমীক্ষায় উপসাগরীয় অঞ্চলের অভিবাসী কর্মী বিশেষত বাংলাদেশি শ্রমিকদের চিকিৎসাবঞ্চনার যে করুণ ও উদ্বেগজনক চিত্র উঠিয়া আসিয়াছে, তাহা আমাদের উদ্বিগ্ন ও বেদনাহত করিয়াছে। ঐ গবেষণা জোটের বাংলাদেশি অংশীদার রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট-রামরুর পক্ষ হইতে সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে বলা হইয়াছে- প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অভাবে স্বল্প বেতনের অভিবাসীরা সংশ্নিষ্ট দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা পাইতেছেন না। তাঁহাদের স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টা সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল নিয়োগকর্তাদের দয়া-দাক্ষিণ্যের উপর। উপরন্তু জরিপে অংশগ্রহণকারী এক-চতুর্থাংশ প্রবাসী শ্রমিক বলিয়াছেন, শুধু চিকিৎসাবঞ্চনা নহে; তাঁহারা জাতিগত বৈষম্যেরও শিকার। সংশ্নিষ্ট দেশের নাগরিকদের প্রাপ্ত স্বাস্থ্যসেবার যৎকিঞ্চিৎও প্রবাসী কর্মীরা পাইতেছেন না। কুয়েতের ৬৫ শতাংশ উত্তরদাতা বলিয়াছেন, তাঁহাদের চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতিরেকেই ব্যথানাশক ঔষধ সেবন করিয়া দিবস-রজনী একাদিক্রমে অসুস্থতাজনিত পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করিতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে চিকিৎসা ব্যয়ের উচ্চহারের বিষয়টা আমরা অবগত। ঐ রূপ পরিস্থিতিতে অসংখ্য বাংলাদেশি শ্রমিক শুধু চিকিৎসার জন্য দেশে প্রত্যাবর্তনে বাধ্য হন বলিয়া আলোচ্য প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে। অনিবার্য ফলস্বরূপ তন্মধ্যে অনেককে বহু অর্থ ও শ্রমসাধ্যে প্রাপ্ত কর্মসংস্থান হারাইতে হয়। বলা বাহুল্য, ঐ দেশগুলিতে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিক প্রায় সকলেই অদক্ষ ও স্বল্পশিক্ষিত। ফলে কায়িক শ্রম ও স্বল্প বেতনের চাকুরিই তাঁহাদের ভবিতব্য। আবার দরিদ্র শ্রেণির মানুষদের এই কর্মসংস্থান করিতে হয় আত্মীয়স্বজনের নিকট হইতে ঋণ করিয়া নতুবা পরিবারের শেষ সম্বল বাস্তু-ভূমি বিক্রয় করিয়া। অনেক সাধনার ধন যদি অমানবিক চিকিৎসা পরিস্থিতির কারণে খোয়াইতে হয়, তাহা হইলে অসহায় মানুষ যাইবে কোথায়?
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির আবহাওয়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য কতটা বৈরী, উহা নিশ্চয় ব্যাখ্যাতীত। অতিরিক্ত কাজের চাপের সহিত যুক্ত হয় প্রায় সকল প্রকার শ্রম ও মানবাধিকারের প্রতি উদাসীন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে বিশেষ করিয়া দরিদ্র দেশগুলি হইতে যাওয়া শ্রমিকদের কোনো প্রকার নিরাপত্তাব্যবস্থা ব্যতীত ঝুঁকিপূর্ণ কর্মে অংশগ্রহণের বাধ্যবাধকতা। আর দেশগুলিতে বিশেষত গৃহকর্মে নিয়োজিত বাংলাদেশি নারীদের যৌন নির্যাতনসহ কত প্রকারের ক্লেশ যে দাঁতকপাটি লাগাইয়া সহ্য করিতে হয়, তাহাও গোচরীভূত। মোদ্দা কথা, আমাদের প্রবাসী শ্রমিকদের উপসাগরীয় দেশগুলিতে এমন এক বৈরী পরিবেশ-পরিস্থিতিতে কর্ম করিতে হয়, যাহার মধ্যে কোনো মানুষেরই সুস্থ থাকিবার কথা নহে। বাস্তবেও উহা ঘটিতেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে আমরা জানিতে পারিয়াছি, প্রতি বৎসর মধ্যপ্রাচ্যে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্তত ১০ সহস্র শ্রমিক মৃত্যুবরণ করেন; যাহার অধিকাংশের কারণ অজ্ঞাত। প্রচণ্ড শারীরিক-মানসিক চাপের ফলে মৃত্যুবরণ করিলেও মৃত্যুসনদে স্বাভাবিক মৃত্যু কিংবা হৃদরোগ হিসাবে উল্লেখ করা হয়। আরও হতাশাজনক হইল, এই সকল বঞ্চনার বিষয়ে বাংলাদেশের দূতাবাসে যোগাযোগ করিয়াও প্রবাসী কর্মীরা কোনো সাড়া পান না বলিয়া অভিযোগ। অথচ বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে প্রত্যেক নাগরিকের- সেই নাগরিক দেশে কিংবা প্রবাসে থাকুন; স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
অবশ্য প্রবাসী বাংলাদেশিরা ছুটিতে বা চাকুরি শেষে দেশে আসিলে বিশেষ করিয়া বিমানবন্দরে প্রায়শ সরকারি কর্মীদের নিকট হইতে যেমন বিরূপ আপ্যায়িত হইয়া থাকেন, উহা মনে রাখিলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের এহেন উদাসীনতার কারণ উপলব্ধি দুরূহ হইবার কথা নহে। স্মর্তব্য, কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা রেমিট্যান্সরূপে দেশে প্রেরণ করিয়া জাতীয় অর্থনীতিতে প্রভূত অবদান রাখিবার পরও প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি রাষ্ট্রের এহেন উদাসীনতা ও বিরূপ আচরণ শুধু অনাকাঙ্ক্ষিতই নহে, আত্মঘাতী হইয়া উঠিতে পারে। বিষয়টা স্মরণে রাখিয়া সরকারের উচিত হইবে বিদেশে কর্মী প্রেরণকালে সর্বজনীন মানবাধিকার ও শ্রমিক অধিকারের বিষয়সমূহ নিশ্চিত করা, যেখানে শুধু মানসম্মত বেতন ও কর্মপরিবেশের কথাই থাকিবে না; সংশ্নিষ্ট দেশের নাগরিকদের সমরূপ প্রবাসী কর্মীদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের নিশ্চয়তা থাকিবে। এতদ্‌বিষয়ে অভিবাসীবিষয়ক সংগঠনগুলি, তৎসহিত নাগরিক সমাজকেও উচ্চকণ্ঠ থাকিতে হইবে বৈকি।

বিষয় : বঞ্চিতের বেদনা সম্পাদকীয়

মন্তব্য করুন