ঢাকা বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

রোহিঙ্গা ও স্থানীয়রা যেভাবে মিত্র থেকে বৈরী

দেখা থেকে লেখা

রোহিঙ্গা ও স্থানীয়রা যেভাবে মিত্র থেকে বৈরী

মাহফুজুর রহমান মানিক

প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৬ ডিসেম্বর ২০২২ | ১৩:২৫

রোহিঙ্গা শিবিরে সন্ত্রাসীদের গুলিতে শিশুসহ ৪ রোহিঙ্গা গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর ২২ ডিসেম্বর সমকাল অনলাইনসহ অন্যান্য সংবাদপত্রে প্রকাশ হয়। রোহিঙ্গা শিবিরে এমন অঘটন যেমন সাধারণ রোহিঙ্গাদের জন্য আতঙ্কের কারণ, তেমনি কক্সবাজারের হোস্ট কমিউনিটি তথা স্থানীয় অধিবাসীদের জন্যও বিরক্তিকর।
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে যাওয়ার সুযোগ হয় ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে। কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের ভেতরে হাঁটতে গিয়ে চোখে পড়ে আলাদা করে সীমানা দিয়ে রাখা 'হোস্ট কমিউনিটি' বা স্থানীয় অধিবাসী। স্পষ্টতই চোখে পড়েছে তাদের মধ্যকার অলিখিত দেয়াল।

মিয়ানমারে নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ৩০ বছর ধরে ধাপে ধাপে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আসছে। সর্বশেষ ২০১৭ সালের আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে নতুন করে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রশংসা কুড়িয়েছিল। ওই সময় কয়েক মাসে সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা আসে। সে সময়ের পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন সাংবাদিক মাইকেল হটজ লিখেছিলেন, 'এমনিতেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তার ওপর এ শরণার্থীর বোঝা সংকট নিশ্চয় আরও বাড়াবে। তারপরও বাংলাদেশ সরকার, জনগণ ও স্থানীয় অধিবাসীরা তাদের জন্য যেভাবে এগিয়ে এসেছে, তা বিস্ময়কর।' (সমকাল, ৫ অক্টোবর, ২০২২)।
কক্সবাজারের স্থানীয় জনসাধারণ রোহিঙ্গাদের আন্তরিকতার সঙ্গেই গ্রহণ করেছিল। রোহিঙ্গা এবং স্থানীয়দের মধ্যে নিশ্চয়ই একটা সৌহার্দ্যও গড়ে উঠেছিল। কিন্তু দিনে দিনে নানা কারণে সে সম্পর্কে চিড় ধরে। শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন আরআরআরসির তথ্যমতে, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে বর্তমানে ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প রয়েছে। এর মধ্যে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের জামতলী, বৃহত্তর কুতুপালংয়ের লম্বাশিয়া, মধুরছড়া ও বালুরমাঠ এবং টেকনাফের লেদা ক্যাম্প উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক সময়ে প্রায়ই এসব ক্যাম্পের অপরাধ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। বলাবাহুল্য, রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের মধ্যে সুসম্পর্ক নষ্ট হওয়ার এটাও অন্যতম কারণ।

কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের মধ্যে দা-কুমড়া সম্পর্ক থাকার বাস্তব কিছু কারণও অনস্বীকার্য। রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয়দের কর্মসংস্থানে সংকট তৈরি হয়েছে। কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে স্থানীয় বেশ কিছু পরিবারেরও আবাসন রয়েছে। সেখানে পণ্যের মূল্য বেশি থাকায় স্থানীয়রাও সংকটে পড়ছে। রোহিঙ্গা শিবিরে খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, বিভিন্ন গ্রুপে গোলাগুলি, আধিপত্য বিস্তার, মাদক, অস্ত্রসহ নানা সহিংসতার কারণে স্থানীয়রা ভয়ে থাকে। পরিসংখ্যান বলছে, গত ৪-৫ মাসে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পগুলোয় অন্তত ১৩ রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে।

পরিস্থিতি যাই হোক, কক্সবাজারে রোহিঙ্গা এবং স্থানীয়দের মধ্যে সামাজিক সংহতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটা সত্য, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনেই জোর দেওয়া উচিত। কিন্তু যতদিন মিয়ানমারে তাদের যাওয়ার নিরাপদ পরিবেশ তৈরি না হয় এবং যতদিন তারা কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোয় রয়েছে, ততদিন তাদের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখা উচিত।
মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তারা আজ পরবাসী। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো অপরাধের জন্য খবর হওয়াটা যেমন সত্য, তেমনি এটাও সত্য; রোহিঙ্গাদের মধ্যে কিছু অপরাধী থাকলেও অধিকাংশই ভালোমানুষ। সেখানে নারী আছে, শিশু আছে। আছে বৃদ্ধও। স্থানীয়দের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে শুরুতেই যে সহানভূতি কাজ করত, তা বজায় রাখা সংগত। উভয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্বেষ প্রত্যাশিত নয়। সামাজিক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ, নিরাপদ ও স্থিতিশীল জীবনযাপনের জন্য কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোয় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং স্থানীয়দের মধ্যে সংহতি থাকা জরুরি। মিলেমিশে বসবাস করার মাধ্যমে সেখানকার সংকটগুলো নিজেরাই সমাধান করতে পারবে। উভয় জনগোষ্ঠীর দায়িত্বশীল ও নেতৃস্থানীয়দের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

এটা সত্য, রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয়রা বেকায়দায় পড়লেও রোহিঙ্গাদের প্রদেয় সুবিধা স্থানীয় জনগোষ্ঠীও পাচ্ছে। বস্তুত এর বিকল্পও নেই। কারণ তাদের কর্মসংস্থানের পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এমনকি রোহিঙ্গাদের জন্য কাজ করছে এমন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাও বিশেষভাবে সেখানকার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসূচি গ্রহণ করেছ। এ ক্ষেত্রে অক্সফামের কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ। ১০ ডিসেম্বর সহযোগী এক দৈনিকের প্রতিবেদনে প্রকাশ, অক্সফাম 'হোস্ট কমিউনিটি'র নারীদের জন্য হস্তশিল্পসহ নানা ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। এমনকি হাঁস-মুরগি-ছাগল পালনের প্রশিক্ষণসহ সেগুলো কেনার জন্য আর্থিক সহযোগিতাও দিয়ে থাকে সংস্থাটি। এতে সংকটে পড়া পরিবার সচ্ছলতা দেখছে। একই সঙ্গে সেফ প্লাস কর্মসূচির আওতায় যেভাবে রোহিঙ্গা পরিবারের জন্য এলপিজি চুলার ব্যবস্থা করা হয়েছে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও সেগুলো দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় জনসাধারণ ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে সদ্ভাব বজায় থাকলে একসঙ্গে তারা কক্সবাজারের পরিবেশ সুরক্ষা এবং সর্বোপরি নিজেদের সুরক্ষায় কাজ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনসাধারণের করণীয় বেশি। স্থানীয়রা রোহিঙ্গাদের দুর্দিনে জায়গা দিয়ে যে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে, সে জন্য তারা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। স্থানীয়দের সহানুভূতির জায়গা অটুট থাকলে তা যেমন রোহিঙ্গাদের উপকারে আসবে, তেমনি স্থানীয় জনসাধারণেরও কল্যাণ বয়ে আনবে। মনে রাখতে হবে, উভয় কমিউনিটি এখন প্রতিবেশী। ফলে সেখানকার সংকট উভয়কেই একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের মধ্যকার মিত্রতা কোনোভাবেই বৈরিতায় পরিণত করা যাবে না।
 

মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক, সমকাল
mahfuz.manik@gmail.com

আরও পড়ুন

×