আবারও রাজধানীর সড়কে বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ের বলি হইলেন এক শিক্ষার্থী। সোমবার সমকালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, রোববার বন্ধুর মোটরসাইকেলে চড়িয়া প্রগতি সরণির যমুনা ফিউচার পার্কের সম্মুখ দিয়া শিক্ষকের সহিত সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে যাইতেছিলেন একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগের ছাত্রী নাদিয়া। অকস্মাৎ বাহনটিকে ধাক্কা দেয় ভিক্টোরি ক্লাসিক পরিবহনের এক বেপরোয়া বাস; সড়কে ছিটকাইয়া পড়েন নাদিয়া। কিন্তু 'গতিদানব' বাসটি না থামিয়া দ্রুত তাঁহার মাথা থেতলাইয়া চলিয়া যায়। মুহূর্তের মধ্যে নিথর হইয়া পড়েন প্রাণচঞ্চল একটি তরুণী। গত বৎসর জুলাইয়ে এই সড়কেই বেপরোয়া লরির চাপায় নিহত হন দুই ভ্যানচালক। আর ২০১৯ সালের মার্চে এই সড়কে জেব্রা ক্রসিং ধরিয়া এক পার হইতে অপর পারে যাওয়ার কালে একইভাবে প্রাণ হারান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরার। তখন অবশ্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পক্ষ হইতে ঐ এলাকায় নিরাপদ সড়ক পারাপারে কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, যাহার ফলে ঐ সড়কে বিশেষ করিয়া গাড়ির ধাক্কায় পথচারী মৃত্যুর সংখ্যা পূর্বের তুলনায় অনেকাংশে হ্রাস পায়। কিন্তু বেপরোয়া চালকদের নিয়ন্ত্রণে যেহেতু অদ্যাবধি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গৃহীত হয় নাই, উহার কারণে উক্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত সড়কটিতে মৃত্যুর মিছিল পুরোপুরি থামিতেছে না।

সত্য বলিতে কি, এহেন বেপরোয়া যানচালকদের থামাইবার চেষ্টা দেশের অন্যত্রও হইতেছে না। পরিণামে সকল সড়ক-মহাসড়কই একপ্রকার মৃত্যুকূপে পরিণত হইয়াছে। এমনকি দুঃখজনকভাবে, এই প্রকারের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার বাড়বাড়ন্ত অবস্থা সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ হইতে স্বীকারও করা হয় না। সম্প্রতি যাত্রী অধিকারবিষয়ক বেসরকারি সংস্থা যাত্রী কল্যাণ সমিতি সংবাদ সম্মেলন করিয়া জানাইয়াছিল- ২০২২ সালে সড়ক দুর্ঘটনা পূর্ববর্তী বৎসর অপেক্ষা ২৯ শতাংশ বৃদ্ধি পাইয়াছে। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের দাবি- গত বৎসর নাকি সড়ক দুর্ঘটনা বরং হ্রাস পাইয়াছে। খোদ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের পক্ষ হইতে এই প্রকারের অস্বীকৃতি চলিতে থাকিলে আগামী দিবসগুলিতে যে নাদিয়ার ন্যায় আরও অসংখ্য প্রতিশ্রুতিশীল প্রাণ ঝরিয়া পড়িবে- উহা হলফ করিয়াই বলা যায়। হতাশাজনক বিষয় হইল, সড়ক দুর্ঘটনাবিষয়ক বিভিন্ন সমীক্ষায় বহু পূর্বেই এই সত্য উঠিয়া আসিয়াছিল যে, দেশের সড়ক-মহাসড়কে প্রতি বৎসর যত দুর্ঘটনা ঘটিয়া থাকে, সেইগুলির অর্ধেকেরও বেশির পশ্চাতে রহিয়াছে বেপরোয়া ড্রাইভিং। একই সঙ্গে এই সত্যটাও উঠিয়া আসিয়াছিল, হালকা ও ভারী যত যানবাহন সড়ক-মহাসড়কে চলে, উহার একটা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক চালকের প্রকৃত ড্রাইভিং লাইসেন্স নাই। এমনকি যান চালানো এবং বিদ্যমান ট্রাফিক আইন সম্পর্কিতও অনেকের যথাযথ জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ নাই। আমাদের মনে আছে, বর্তমান সড়ক, পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীও ২০১১ সালে প্রথম মন্ত্রণালয়টির দায়িত্ব গ্রহণের পর উক্ত আতঙ্কজনক তথ্যগুলি স্বীকার করিয়াছিলেন। তিনি তখন এই চিত্র অচিরেই বদলেরও অঙ্গীকার করিয়াছিলেন। কিন্তু সকলই গরল ভেল। খোদ ঐ মন্ত্রীবচন অদ্যাবধি কথার কথা হইয়া রহিয়াছে।

আমাদের সন্দেহ, সংশ্নিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষসমূহের নিকট সড়ক দুর্ঘটনা নিছকই সংখ্যা মাত্র। ইহার ফলে ঝরিয়া পড়া প্রাণগুলিও হয়তো অধিকতর কিছু নহে। অথচ এহেন দুর্ঘটনার শিকার হইয়া দেশে প্রতিদিন যে ডজনখানেক মানুষ প্রাণ হারান কিংবা চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেন, তাঁহাদের অনেকেই সংশ্নিষ্ট পরিবারের একমাত্র উপার্জক্ষম; অর্থাৎ সড়ক দুর্ঘটনা বহু পরিবারের জন্য রীতিমতো অস্তিত্বের সংকট সৃষ্টি করিয়া চলিয়াছে। নাদিয়ার উপর হয়তো তাঁহার পরিবার নির্ভরশীল ছিল না। কিন্তু এহেন মধ্যবিত্ত পরিবারে সন্তানকে ঘিরিয়া বিশেষত পিতা-মাতা যে প্রকারের স্বপ্ন বুনেন, নাদিয়ার পরিবারও সেই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নহে- অন্তত নাদিয়ার মরদেহ স্পর্শ করিয়া তাহার শোকার্ত পিতার যে আর্তনাদ প্রতিবেদনে তুলিয়া ধরা হইয়াছে, উহা বিবেচনায় রাখিলে তাহা উপলব্ধি করা দুরূহ হইবে না। তিনি বলিয়াছেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অনুমতি পাওয়ার পরও নাদিয়াকে নিজের কাছাকাছি রাখিয়া মানুষ করিতে চাহিয়াছিলেন, তাই ব্যয় সংকুলান কষ্ট হইবে জানিয়াও ভর্তি করিয়াছিলেন ঢাকারই একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু তাঁহার সেই স্বপ্ন কাড়িয়া নিল ভিক্টোরি পরিবহন নামক এক গতিদানব। আমাদের প্রত্যাশা, নাদিয়ার বাবার এই আহাজারি সংশ্নিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষসমূহের কর্ণকুহরে প্রবেশ করিবে এবং উহারা সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামাইতে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে।

বিষয় : সম্পাদকীয় গতিদানব

মন্তব্য করুন