'দ্য মোদি কোয়েশ্চেন' শিরোনামে বিবিসির ডকুমেন্টারি পুরোনো প্রশ্ন নতুন করে সামনে এনেছে। এর ফলে ভারতের ক্ষুব্ধ ডিজিটাল যোদ্ধারা চ্যানেলটি বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। এরই মধ্যে ওই ভিডিওর প্রদর্শন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধও করে দেওয়া হয়েছে। ডকুমেন্টারির ফলে বৈশ্বিক ক্ষেত্রে দেশটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণের উদ্বেগই ভারতের ভেতরের এত হৈচৈয়ের মূল কারণ। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর এ সময়ের লৌহমানব হওয়ার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। আর এটি দেশটির মূল্যবান সম্পদ 'সফট পাওয়ার' তথা বহু সংস্কৃতির উদার গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তির বিরুদ্ধে যাচ্ছে।

প্রথমেই আমরা দেখব, ডকুমেন্টারিটি আসলে কী বিষয়ে, যেটি বিবিসির সাম্প্রতিক সময়ে প্রচারিত অন্য প্রতিবেদনগুলো থেকে একেবারে আলাদা? বিবিসির ডকুমেন্টারিটি ২০০২ সালে সংঘটিত ভারতের গুজরাট দাঙ্গা নিয়ে। বিশেষত তিনটি কারণে এটি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পরস্পরকে দানব প্রতিপন্ন করার প্রতিযোগিতার সঙ্গে তা মোটেও সম্পর্কিত নয়। প্রথমত, ডকুমেন্টারিটি করা হয়েছে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরের অফিসিয়াল সরকারি প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে। দ্বিতীয়ত, সাবেক ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব জ্যাক স্ট্র এতে অকপট সাক্ষাৎকার দিয়েছেন এবং দ্ব্যর্থহীনভাবে কথা বলেছেন। সর্বশেষ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অংশ হিসেবে এটি বেসরকারি সংবাদমাধ্যমের পরিবর্তে সরকারি সংস্থার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এটি যেহেতু ব্রিটিশ এস্টাবলিশমেন্টের তৈরি একটি পণ্য, তাই এর বিশ্বাসযোগ্যতা অনন্য।

ডকুমেন্টারিতে মোদির সমর্থকদেরও কথা বলার পূর্ণ ও সমান সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বিজেপির রাজ্যসভার সাবেক সাংসদ স্বপন দাশগুপ্ত পুরো এপিসোডে প্রধান কয়েকটি অভিযোগ খণ্ডনের চেষ্টা করেছেন। এমনকি দুই পর্বের এপিসোডের প্রথমটি শেষ হয়েছে স্বপন দাশগুপ্তের কথা দিয়ে। পরিহাসজনক হলো, নরেন্দ্র মোদির সমালোচক ও তাঁর বিরোধিতাকারীদের চেয়ে ক্ষমতাসীন বিজেপি ও দলটির সমর্থকরাই বিবিসির ডকুমেন্টারিটি প্রচারে ও দীর্ঘস্থায়ী হতে প্রধান ভূমিকা পালন করবে।

সাম্প্রতিক বা অতীত ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো লেখা, ছবি কিংবা শব্দকে জীবন্ত রাখার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো- শক্তিশালী কোনো সরকারের দ্বারা সেটি বন্ধ হওয়া বা নিষিদ্ধ করা। যেমন- সালমান রুশদির স্যাটানিক ভার্সেস কিংবা এম কে গান্ধীর হিন্দু স্বরাজ। এমনকি বিনায়ক দামোদর সাভরকারের 'হিস্ট্রি অব দি ওয়ার অব দি ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স' বইটিও নিষিদ্ধ হয়েছিল। এগুলো নিষিদ্ধ না হলে হয়তো এত আলোচনায় আসত না। এটি সত্য হলেও আমাদের সময়ের আমলারা তা না বুঝে সোৎসাহে সেন্সর আরোপেই তাঁদের মনোযোগ নিবদ্ধ করেন। ফলে বিবিসির এই ডকুমেন্টারি যদি বহুল প্রচারিত হয় এবং মানুষের মনোযোগের কেন্দ্রে থাকে, সে জন্য ব্রিটিশ পরিচালক ভারত সরকারকে ধন্যবাদ দিতে পারেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিবিসি ডকুমেন্টারির প্রচার কিংবা উল্লেখ করার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে মোদি একজন লৌহমানব হিসেবে তাঁর ভাবমূর্তি এবং কর্মকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছেন। এক সময়ে ভারতীয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্লোগান ছিল 'ইন্দিরাই ইন্ডিয়া'। এরপর মোদিই প্রথম নিজেকে জাতির সমার্থক হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন। 'গ্লোবাল গুরু' বা 'বিশ্বগুরু' হিসেবে মোদির সর্বশেষ অবতার ভাবমূর্তি তাঁর সেই প্রয়াসকে আরও জোরদার করেছে। ডকুমেন্টারি নিষিদ্ধ করা নিঃসন্দেহে মোদির উৎসাহী সমর্থকদের সন্তুষ্ট করবে, যারা ডকুমেন্টারিকে 'ঔপনিবেশিক' এবং 'শ্বেতাঙ্গদের' প্রচারণা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

ভারত চীন নয়; আজকের বিশ্বব্যবস্থায় ভারতকে সবাই অংশীদার করতে চায়। ভারতের প্রায় দেড়শ কোটির বিশাল জনসংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভারতের বহুল আলোচিত বৈচিত্র্য, স্বাধীনতা এবং উদার ও সাংবিধানিক গণতন্ত্রও বিশ্বমঞ্চে তার সবচেয়ে শক্তিশালী ট্রাম্প কার্ড।

জি২০'র প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুবাদে ২০২৩ সালে বিশ্ব নেতৃত্ব হবে দিল্লিমুখী, তাই ভারতের প্রতি বিশ্বের তীক্ষষ্ট দৃষ্টি থাকবে। প্রাসঙ্গিকভাবে বলা দরকার, সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া বিজেপির জাতীয় কার্যনির্বাহী পরিষদে যেহেতু এটি স্পষ্ট হয়েছে- ২০২৪ সালের নির্বাচনে মোদিই প্রার্থী হচ্ছেন। সে জন্য বিশ্বমঞ্চে তাঁর ব্যক্তিত্ব তুলে ধরার এটি শেষ সুযোগ হতে পারে। অধিকন্তু, মোদি বারবার নিজেকে ইউক্রেন এবং রাশিয়ার মধ্যে চলমান যুদ্ধে একজন আদর্শ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন (যেমন মধ্যস্থতা করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান)। যদিও এ ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্য তেমন কিছুই নেই।

ভারতীয় দর্শকরা কী দেখবে আর কী দেখবে না- সেখানে নিয়ন্ত্রণ আরোপ নৈতিক শক্তির বদলে কর্তৃত্বকেই তুলে ধরে। মোদির সমর্থকরা বিবিসিকে গালাগাল করে হয়তো তৃপ্তি পেতে পারে, কিন্তু এটি গণতান্ত্রিক ভারতের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এটি একইভাবে ভারতের 'সফট পাওয়ারেও' ক্ষত সৃষ্টি করবে। জনতুষ্টিবাদীরা হয়তো ডকুমেন্টারি নিষিদ্ধ হওয়াতে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেবে। কিন্তু এটি '৫৬ ইঞ্চি সিনা'খ্যাত মোদির বিশ্বগুরু পরিচয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁর ঘরোয়া অনুসারীরা হয়তো একে পাত্তা দেবে না; কিন্তু বিশ্ব ছাড়া যেমন আপনি বিশ্বনেতা হতে পারবেন না, ঠিক তেমনি এ দিয়ে আপনি ভারতেও বিশ্বখ্যাত হতে পারবেন না।

শ্রুতি কাপিলা :অধ্যাপক, ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি অ্যান্ড গ্লোবাল পলিটিক্যাল থট, ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজ; দ্য প্রিন্ট থেকে সংক্ষেপে ভাষান্তরিত