গতকাল ২৪ জানুয়ারি বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস। জাতিসংঘের সব রাষ্ট্র দিবসটি পালন করে থাকে। ২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে প্রতি বছর ২৪ জানুয়ারি শিক্ষা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সে অনুযায়ী দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হচ্ছে। শিক্ষা একজন ব্যক্তির সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটায়। তার দৃষ্টিভঙ্গি ও মননশীলতায় প্রসারতা আনে। ব্যক্তিকে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে সচেতন করে তোলে। দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে সাহস জোগায়। সর্বজনীন মানবাধিকার সনদের ২৬ নম্বর আর্টিকেলে শিক্ষাকে নাগরিকদের অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের ইউনেস্কো শিক্ষা বিস্তারে কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিটি দেশের সংবিধানেও নাগরিকদের শিক্ষার অধিকারের কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ আর্টিকেলে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্র একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও আইনের দ্বারা নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এতদসত্ত্বেও শিক্ষাকে কি সর্বজনীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন করা সম্ভব হয়েছে?

সাক্ষরতার হার একটি দেশের শিক্ষার অবস্থান নিরূপণের একটি মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হয়। জাতিসংঘ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সদস্য দেশের সাক্ষরতার হার ও শিক্ষার মান বাড়ানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। সদস্য দেশগুলোর জাতীয় সরকারও নিজ নিজ দেশে সাক্ষরতার হার ও মান বৃদ্ধি এবং শিক্ষাকে সর্বজনীন করার উদ্যোগ নিচ্ছে। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের শিক্ষার হার ৭০ শতাংশের ঊর্ধ্বে। ২০-২৫টি দেশের সাক্ষরতার হার ৭০ শতাংশের নিচে। ধনী ও ক্ষমতাবান দেশগুলো হাজার হাজার কোটি টাকা সমরাস্ত্র তৈরি, যুদ্ধ ও আধিপত্য বিস্তারের জন্য খরচ করছে। এতে বিশ্ব শান্তি যেমন হুমকির মধ্যে পড়ছে, মানবাধিকারও তেমনি লঙ্ঘিত হচ্ছে। অথচ তারা শান্তি, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের স্লোগান দিয়ে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাচ্ছে। যুদ্ধ ও সমরাস্ত্র তৈরিতে ডলার খরচ না করে শিক্ষা ও দারিদ্র্য দূর করার জন্য এ অর্থ ব্যয় করলে পৃথিবী থেকে দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতা দূর হয়ে যেত। বিশ্ব মানবতার কল্যাণ ও সুরক্ষা সাধিত হতো।

বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। সাক্ষরতার হার প্রায় প্রতি বছরই বাড়ছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার ছিল ১৭.৬%। জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী বর্তমানে দেশে সাক্ষরতার হার ৭৪.৬৬%। ৫০ বছরে বেড়েছে ৫৭.০৬%। প্রতি বছর গড়ে ১ শতাংশের বেশি বেড়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই হার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৮১ সালে সাক্ষরতার হার ছিল ২৯.২৩%। ১০ বছর পর ১৯৯১ সালে এই হার দাঁড়ায় ৩৫.৩২%। ১০ বছরে বৃদ্ধির হার ৬.০৯%। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১২ সালে সাক্ষরতার হার ছিল ৫৭.৮৬%। ২০২২ সালে সাক্ষরতার হার ৭৪.৬৬%-এ উন্নীত হয়। এই দশকে সাক্ষরতার বৃদ্ধির হার ১৬.৮%। সরকার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেছে। ৯৫.৫% বালক-বালিকা প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করছে। প্রতি বছর ৩৪ কোটি পুস্তক বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
তবে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো অনেকদিন ধরে বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য সুপারিশ করছে, যা বাংলাদেশ মানতে পারছে না। বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ১২ শতাংশের কাছাকাছি থাকছে। শিক্ষার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট ব্যক্তি ও শিক্ষাবিদরা এই হার অন্তত ১৫ শতাংশ করার জন্য দাবি জানিয়ে আসছেন। শিক্ষার প্রসার, মান উন্নয়ন এবং আধুনিক ও যুগোপযোগী করার জন্য শিক্ষা খাতে বরাদ্দ অবশ্যই বাড়াতে হবে। তবে এ বরাদ্দ শুধু অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় না করে শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, শিক্ষাদান পদ্ধতিতে তথ্যপ্রযুক্তির সংযোজন, সৃজনশীল ও আধুনিকীকরণের দিকে বিশেষ জোর দিতে হবে।

শিক্ষার প্রসার ও মানোন্নয়নের দায়িত্ব কেবল সরকারের কাঁধে ঠেলে না দিয়ে সমাজের বিত্তবান ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সুখের বিষয়- বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি হচ্ছে। আগে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ৬টি। বর্তমানে ৫০টি। আগে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০৮টি; যদিও কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পারফরম্যান্স এবং শিক্ষকদের যোগ্যতা ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে; ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে অসচ্ছল এমনকি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরাও এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পরিচালিত হলে সাধারণ মানুষ এ থেকে কোনো সুফল পাবে না। যদিও বিশ্বব্যাপী গুণগত শিক্ষা বেশ ব্যয়বহুল। শিক্ষা খাতে এভাবেই বৈষম্য সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ১৯৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে শিক্ষার হার ৯০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। এটা হয়তো সম্ভব হবে। কিন্তু গুণগত, জীবনধর্মী এবং কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। নীতিনির্ধারকদের এ লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। যে শিক্ষা বেকার সৃষ্টি করে, সে শিক্ষাকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রতি জেলায় ভোকেশনাল ইনস্টিটিউশন নির্মাণ করা আবশ্যক। শিক্ষালাভের ক্ষেত্রে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন আবশ্যক। সাধারণ শিক্ষায় বড় বড় ডিগ্রি নেওয়ার মোহ থেকে বেরিয়ে কর্মমুখী শিক্ষার দিকে ঝুঁকতে হবে। 
যুগে যুগে দেশে দেশে মনীষীরা শিক্ষাকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করেছেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বক্তৃতা-বিবৃতিতে শিক্ষিত সমাজকে উপদেশ দিতেন দেশের কৃষক, শ্রমিক, দরিদ্র ও মেহনতি মানুষকে ভালোবাসতে, তাদের সম্মান দিতে। শিক্ষিত সমাজের প্রত্যেক সদস্যের অবশ্য কর্তব্য হওয়া উচিত জাতির পিতার উপদেশকে প্রতিপালন করা। মানুষের কল্যাণে কাজ করা, মানুষকে ভালোবাসা।

এ কথা সর্বজনস্বীকৃত শিক্ষা উন্নয়নের চাবিকাঠি, কল্যাণের আলোকবর্তিকা এবং স্বাবলম্বী হওয়ার সোপান। প্রত্যেক নাগরিক প্রকৃত শিক্ষা লাভ করে মানুষ হোক, মানুষের জন্য কাজ করুক- আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবসে এটাই হোক আমাদের সবার প্রত্যাশা।

এ কে এম শহীদুল হক: সাবেক ইন্সপেক্টর  জেনারেল, বাংলাদেশ পুলিশ