সোমবার জনসমক্ষে প্রকাশিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় বা বিএসএমএমইউর পাবলিক হেলথ ও ইনফরমেটিকস বিভাগ পরিচালিত জরিপে তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার যে করুণ চিত্র উঠিয়া আসিয়াছে, উহাকে আর যা-ই হউক কাঙ্ক্ষিত বলা যায় না। মঙ্গলবার সমকালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, দেশের ৯ জেলা হাসপাতাল ও ১৭ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপর পরিচালিত উক্ত জরিপের তথ্য বলিতেছে- দেশের ৫৯ শতাংশ উপজেলার সরকারি হাসপাতালে এক্স-রে হয় না; রক্ত সঞ্চালন হয় না ৪১ শতাংশ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে; প্রায় ৫৬ শতাংশ জেলা এবং ৮৮ শতাংশ উপজেলা আলট্রাসনোগ্রাম সুবিধাবঞ্চিত। অথচ যে কোনো প্রকার রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রথমেই এই তিনটার এক বা একাধিক সেবা অপরিহার্য। ইহা তো গেল যন্ত্রপাতির ব্যাপার, জরিপ অনুসারে ঐ সকল যন্ত্রপাতি পরিচালনার জন্য টেকনোলজিস্ট বা টেকনিশিয়ান ৫১ শতাংশ জেলা হাসপাতাল ও ৪২ শতাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নাই। আর পরীক্ষার প্রতিবেদন দেখিয়া যাঁহারা চিকিৎসা বাতলাইবেন, সেই আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা নাই ৬৩ শতাংশ উপজেলা সরকারি হাসপাতালে। অবশ্য চিকিৎসা কর্মকর্তা থাকিবেনই বা কোথায়, ৮০ শতাংশ জেলা হাসপাতাল ও ৮২ শতাংশ উপজেলা হাসপাতালে তাঁহাদের জন্য ডরমিটরি বা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নাই! এই সকল স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে রোগীরা কেবল যে যথাযথ চিকিৎসাবঞ্চিত উহা নহে, প্রায় ৭৮ শতাংশ জেলা ও ৬৫ শতাংশ উপজেলার সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নারী রোগীদের জন্য পৃথক টয়লেট সুবিধা নাই। অর্থাৎ তৃণমূল পর্যায়ে বিশেষত নারী রোগীদের বিড়ম্বনার শেষ নাই।

জরিপের ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মতে, ইহার দুর্বলতা হইল, উহাতে গ্রামের মানুষ কেমন সেবা পাইতেছেন, সেই তথ্য নাই। দৃশ্যত মন্ত্রী মহোদয়ের কথা সঠিক, কিন্তু জরিপে যে তথ্য উঠিয়া আসিয়াছে, তাহাতে কি তৃণমূলে স্বাস্থ্যসেবার প্রকৃত চিত্র বুঝিতে অসুবিধা হয়? কথায় বলে না- আকলমন্দকে লিয়ে ইশারা হি কাফি হ্যায়। আসলে জরিপের ফলকে ডুবন্ত হিমশৈলের চূড়া বলিলেও ভুল হইবে না। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্তাব্যক্তিরা চাহিলে আরও বিস্তৃত পরিসরে জরিপ চালাইতে পারেন। তবে উহাতে তথ্যের খুব একটা হেরফের হইবে বলিয়া মনে হয় না। কারণ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি নিত্য সংবাদমাধ্যম নিরীক্ষণ হইতে এই সত্যই আমরা জানি, কেবল জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতাল কেন, খোদ রাজধানীতেও এই ধরনের বহু প্রতিষ্ঠানে প্রায় সময়ই রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতি হয় অচল থাকে নতুবা সেখানে সাধারণ রোগীদের কোনো ব্যবস্থা থাকে না। একটা সামান্য পরীক্ষা করিতে হইলেও তাহাদের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক কেন্দ্রসমূহের দ্বারস্থ হইতে হয়। অনস্বীকার্য, অন্তত প্রাথমিক চিকিৎসা সুবিধা তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের দ্বার পর্যন্ত পৌঁছাইয়া দিবার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার প্রতিষ্ঠিত কমিউনিটি ক্লিনিকসহ আরও কিছু আয়োজন একপ্রকারের যুগান্তকারী ভূমিকা রাখিতেছে। সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দও এই সরকারের আমলে পূর্বের যে কোনো সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি পাইয়াছে। কিন্তু ইহাও অস্বীকার করা যাইবে না, এই বর্ধিত বরাদ্দ একদিকে অ্যাডহক ভিত্তিতে বণ্টিত হইতেছে। অর্থাৎ কোনো সুষ্ঠু পরিকল্পনার ভিত্তিতে ঐ অর্থ অদ্যাবধি ব্যয় হয় নাই; এমনকি দুর্নীতি, অপচয় ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগও এই খাতে বিস্তর। অনেক ক্ষেত্রে ঘোড়ার অগ্রভাগে গাড়ি জুড়িয়া দিবার ন্যায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল না থাকা সত্ত্বেও অত্যাধুনিক, এমনকি স্পর্শকাতর চিকিৎসা সরঞ্জাম বিভিন্ন জেলা-উপজেলা হাসপাতালের জন্য ক্রয় করা হইয়াছে। ফলস্বরূপ জনগণের কষ্টার্জিত অর্থে ক্রয় করা ঐ সকল মূল্যবান যন্ত্রপাতি অনেকাংশেই ধুলার সমুদ্রে ডুবিয়া নষ্ট হইয়া গিয়াছে।

আমরা মনে করি, আলোচ্য জরিপকে গুরুত্বের সহিত গ্রহণ করিয়া স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারকদের অবিলম্বে তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। মনে রাখিতে হইবে, দেশের সংবিধান সকল নাগরিকের জন্য মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের উপর অর্পণ করিয়াছে। এই ক্ষেত্রে শহর-গ্রামের বিদ্যমান বৈষম্য নিরসনের প্রশ্নেও বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ। সর্বোপরি তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা শক্তিশালী ও সুলভ হইলে ঢাকাসহ বড় শহরগুলির উপর চলমান রোগীর চাপও অনেকাংশে হ্রাস পাইবে, যাহা নগর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে আরও সক্ষম করিয়া তুলিবে।

বিষয় : হিমশৈলের চূড়া সম্পাদকীয়

মন্তব্য করুন