আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস-জেএসএস) গত বছর সুবর্ণজয়ন্তী অতিক্রম করেছে। ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি- এক ঐতিহাসিক দিনে মহান বিপ্লবী নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে জুম্ম জনগণের অধিকারকামী দেশপ্রেমিক অংশের উদ্যোগে জেএসএস প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর পর থেকে বিগত পাঁচ দশকের অধিক সময় ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে জেএসএস গৌরবময় সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে।

জেএসএস জন্মের সঙ্গে সঙ্গে ঘোষণা করে, পার্বত্য চট্টগ্রাম হচ্ছে ১১টি ক্ষুদ্র জাতির আবাসভূমি। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমঅধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচার- এই মূলনীতির ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিন্ন ভাষাভাষী জুম্ম জাতি জেএসএসের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। মানবতাকে আদর্শ হিসেবে ধারণ করে জাতি, সম্প্রদায়, লিঙ্গগত বৈষম্য ও নির্যাতন-নিপীড়ন এবং মানুষ কর্তৃক মানুষের শোষণ ও বঞ্চনার অবসান তথা বৈষম্যহীন ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সূচিত হয় জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। অন্যদিকে দেশের স্বৈরাচারী ও অগণতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠী জেএসএসের নেতৃত্বাধীন জুম্ম জনগণের আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে ষড়যন্ত্র ও নৃশংস দমন-পীড়ন চালাতে থাকে। তা সত্ত্বেও মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা প্রদর্শিত আদর্শ ও পথ অনুসরণে জেএসএস নেতৃত্ব অবিচল থাকে। জেএসএসের নেতৃত্বে জুম্ম জনগণের আড়াই দশকের রক্ত-পিচ্ছিল দুর্বার আন্দোলনের ফলে দেশের শাসকগোষ্ঠী বাধ্য হয় ১৯৯৭ সালে ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, জুম্ম জনগণের শাসনতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি দিয়ে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষর করলেও আজ পর্যন্ত কোনো সরকার চুক্তির মূল বিষয়গুলো বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেনি।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে চারটি বিষয়ের ভিত্তিতে একের পর এক হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছে জেএসএস। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসেবে ১০ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছে। কিন্তু জেএসএসের শত শত সদস্যকে মিথ্যা মামলায় জড়িত করে এলাকাছাড়া করা হয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়নের শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলন মোকাবিলার নামে সরকার নানা সহিংস পথ অনুসরণ করে চলেছে।

পার্বত্য চুক্তির আগেও শাসকগোষ্ঠী নামে-বেনামে সশস্ত্র সন্ত্রাসী ও লাঠিয়াল বাহিনী সৃষ্টি করে জেএসএসের নেতৃত্বাধীন জুম্ম জনগণের ন্যায়সংগত আন্দোলনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিল। কিন্তু জুম্ম জনগণের ঐক্যবদ্ধ দুর্বার আন্দোলনের মাধ্যমে জেএসএস শাসকগোষ্ঠীর সেসব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছিল। চুক্তি-উত্তর সময়েও বিগত আড়াই দশক ধরে জেএসএস শাসকগোষ্ঠীর সব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে আসছে এবং পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন তথা জুম্ম জনগণের শাসকগোষ্ঠীর নৃশংস দমন-পীড়নের মুখেও জেএসএস অব্যাহতভাবে আপসহীন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। তাই বরাবরের মতো জেএসএস জুম্ম জনগণের ভরসার একমাত্র আশ্রয়স্থল ও আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে সংগ্রামী ভূমিকা পালন করে চলেছে। তাই তো বিগত আড়াই দশকে আপামর জুম্ম জনগণ জেএসএসের নেতৃত্বে অধিকতর ঐক্যবদ্ধ হয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আন্দোলনে শামিল হয়েছে। দেশপ্রেমিক ও বিপ্লবী জুম্ম ছাত্র-যুব সমাজ ক্রমাগত জেএসএসের নেতৃত্বে সমাগত হয়ে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন তথা জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আন্দোলনকে বেগবান করেছে।

এটা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে গড়িমসি ও কালক্ষেপণের মধ্য দিয়ে দেশের শাসকগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতিকে আবারও জটিলতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। জেএসএসের নেতৃত্বে জুম্ম জনগণ এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সংকল্পবদ্ধ। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নস্যাৎ করার যে কোনো ষড়যন্ত্র এবং জুম্ম জনগণের এই চুক্তি বাস্তবায়নের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে ফ্যাসিবাদী কায়দায় দমন-পীড়নের কোনো চক্রান্ত জেএসএস কখনোই মেনে নেবে না। জেএসএস তথা জুম্ম জনগণ দীর্ঘ আড়াই দশক ধরে রক্ত-পিচ্ছিল সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত অধিকার সনদ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে কখনোই বৃথা যেতে দেবে না।
বিগত পাঁচ দশক ধরে জেএসএস জুম্ম জনগণের ঐক্য-সংহতি জোরদার করে চলেছে। জুম্ম জনগণের দেশপ্রেমিক অংশ এই সংগ্রামে নেতৃত্ব প্রদান করে চলেছে। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার সংগ্রামের কঠিনতম দিনগুলোতেও জেএসএস নেতৃত্ব বিভ্রান্ত ও বিচলিত না হয়ে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সমর্থ হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়িত ও শোষিত জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব ও জন্মভূমির অস্তিত্ব সংরক্ষিত না হওয়া পর্যন্ত জেএসএস তার সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ক্রমাগত এগিয়ে যাবেই।

বস্তুত পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠায় পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের মধ্যেই জুম্ম জনগণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ভূমি অধিকার প্রতিষ্ঠায় দুর্বার বৃহত্তর আন্দোলন চালিয়ে যেতে জেএসএস বদ্ধপরিকর। শত প্রতিকূলতা ও শাসকগোষ্ঠীর নারকীয় দমন-পীড়নের মুখেও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন তথা জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বৃহত্তর বা উচ্চতর আন্দোলন থেকে জেএসএস কখনোই পিছপা হবে না।

মঙ্গল কুমার চাকমা: পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক