গত ২৪ মে এ দেশের সংঘর্ষমুখর রাজনীতি খানিক থমকে দাঁড়ায়। এদিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন টুইট বার্তায় ‘বাংলাদেশে যারা গণতন্ত্র এগিয়ে নিতে চায়, তাদের সমর্থনে’ এবং ‘গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে যারা বাধাগ্রস্ত করবে’ তাদের ওপর মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুঁশিয়ারি দেন। এর পরই জাতীয় রাজনীতির মূল দুটি দল– আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের বিপরীত ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হতে থাকে, এই বার্তায় আওয়ামী লীগ শঙ্কিত ও বিএনপি উৎফুল্ল।

১৮ আগস্ট ডয়চে ভেলে এবং ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়– শেখ হাসিনার সরকারের পক্ষ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে কূটনৈতিক বার্তা দিয়েছে ভারত। এবার আওয়ামী লীগ উৎফুল্ল ও বিএনপি শঙ্কিত। ২০ আগস্ট চার দিনের সফরে ভারত যান জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জি এম কাদের। জি এম কাদেরের ভারত সফরের সময় নিজেই নিজেকে জাপার চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করেন রওশন এরশাদ। ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই জেনারেল এরশাদের মৃত্যুর পর থেকে জি এম কাদের জাপার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করলেও সে বছরের ডিসেম্বর থেকে আরও অন্তত দু’বার রওশন এরশাদ নিজেকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছেন।

জাতীয় রাজনীতি এমন ‘অনিশ্চিত’ পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই এগোচ্ছে। অনিশ্চয়তা ও সংকটের মধ্যে রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের দুর্বলতা ও সুযোগসন্ধান আরও একবার স্পষ্ট হচ্ছে।  

২.

গত দুটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ‘বৈতরণী’ পার হতে সাহায্য করে জাতীয় পার্টি। ২০১৪ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে ‘ঢাল’ বানিয়ে নির্বাচিত হয় আওয়ামী লীগ। ২০১৮ সালে জাতীয় পার্টি মহাজোটের অংশ হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলে পরিণত হয়। জাতীয় নির্বাচনের আগে রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরের তৎপরতা তাই বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ‘ঢাল’ হিসেবে জাতীয় পার্টি আবারও আবির্ভূত হলে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে হিসাবনিকাশে গত দু’বারের নির্বাচনের বাস্তবতা সামনে এসে দাঁড়াবে।

রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি রাষ্ট্রপক্ষ– প্রত্যেকেই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলছেন। অবাধ নির্বাচন বাস্তবায়নের পথ নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে ঘোর বিরোধ। প্রথম পক্ষ চাইছে, চলমান সরকারের আওতায় নির্বাচন; দ্বিতীয় পক্ষের চাওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার! এই নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক বিবাদ আমরা দেখি, জানি বিরোধী দলের ওপর মামলা-হামলার খবর। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে একটি প্রসঙ্গ সামনে আসে। টানা ১৫ বছর সরকারে আওয়ামী লীগ। তাদের অর্জন নিশ্চয়ই কম নয়। তারপরও প্রতিপক্ষের দুর্বল নেতৃত্ব কি আওয়ামী লীগকে বেশি আত্মপ্রত্যয়ী করে তুলছে?

৩.

কেন বিএনপির নেতৃত্বকে ‘দুর্বল’ বলে চিহ্নিত করতে হয়?

আগস্ট ‘নিষ্ঠুর’ মাস হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের ভয়ংকর বহু হত্যাকাণ্ড আগস্ট মাসে সংঘটিত। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সব নৃশংসতা অতিক্রম করে গেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। আমরা দেখি, সেই রক্তস্রোত পেরিয়ে বিভেদের রাজনীতি অনেকটা ধূসর করে আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পরস্পরের নিকটবর্তী। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া একই সোফায় পাশাপাশি বসেন; স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সুতীব্র আন্দোলন পরিচালনা করেন। তাদের নেতৃত্বে এরশাদ সরকার পতনের পর ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১-এ পরপর তিনবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন হয়। বিজয়ী দল যথাক্রমে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। তিনবারের নির্বাচন নিয়ে কোনো জনঅসন্তুষ্টি ছিল না।

এ রকম গণতান্ত্রিক আবহাওয়ার মধ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ঘটনা ঘটে। ট্রাকের ওপর তৈরি মঞ্চে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সে সময়ের বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনার ২০ মিনিটের বক্তৃতা শেষে বিক্ষোভ মিছিল শুরুর ঘোষণা দিয়ে নিচে নামার উদ্যোগ নিতেই তাঁকে লক্ষ্য করে শুরু হয় নৃশংস গ্রেনেড হামলা। দেড় মিনিট মাত্র সময়ের এই হামলায় ১১টি শক্তিধর গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয়। সঙ্গে সঙ্গে নিহত হন ১২ জন; আরও ১২ জন পরে হাসপাতালে নিহত হন। মানবঢাল তৈরি করে সেদিন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা শেখ হাসিনাকে রক্ষা করেন, আর চিরদিনের মতো প্রতিহিংসার রাজনীতি প্রকাশ্য হয়ে ওঠে। সে সময় ক্ষমতায় বিএনপি; প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। এই সহিংস ঘটনায় খালেদা জিয়ার নির্লিপ্তি বহু প্রশ্নের সৃষ্টি করে। সরকারের বিরুদ্ধে হাসপাতালে আহতদের সেবা প্রদানে প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টির অভিযোগ ওঠে। স্বয়ং খালেদা জিয়া বলে বসেন– শেখ হাসিনা নিজেই ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে সমাবেশে গেছেন ও নেতাকর্মীর ওপর নিজেই গ্রেনেড ছুড়ে মেরেছেন!

১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা ও জজ মিয়া কাহিনি নিশ্চয়ই মানুষের স্মৃতিতে স্থির হয়ে থাকে; বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব আজও ২১ আগস্টের ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকেই দায়ী করেন। এবারও লন্ডনে বসে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভিডিও বার্তায় সেই হাস্যকর দাবিই নতুন করে করলেন।

কোন বিবেচনায় এ ধরনের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে নিজ দলের কর্মীদের হত্যাকাণ্ডের জন্য দলীয় প্রধানকে দায়ী করেন আরেক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব? এই প্রতিহিংসায় সত্যিকার অর্থে কী বোঝায়? এই দুর্বলতা আসলে কার?

২০১৪ সালের নির্বাচনের আগের অগ্নিসন্ত্রাসের সময়ও বিএনপির নেতৃত্বের দুর্বলতা প্রকাশ পায়। যদিও বিএনপির অভিযোগ, সরকার বিএনপিকে দোষারোপের লক্ষ্যে নিজেই তখন বাসে, ট্রাকে আগুন লাগিয়ে বিএনপির নাম দিয়ে দিয়েছে! যদি প্রশ্ন করা হয়, সরকার বাসে আগুন লাগিয়ে বিএনপির নাম বসিয়ে দিল; তখন খালেদা জিয়া প্রকাশ্যে রাজপথে নেতৃত্ব দিচ্ছেন– তিনি কোন পদক্ষেপ নিলেন এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে? ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বে যে জোট তৈরি হয়, তাকে ‘দিশেহারা জোট’ বলাই সংগত; একপক্ষীয় নির্বাচনকে তা আরও সংহত করে। আবার নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে; দলের নেতা লন্ডনে বসে নানা ভিডিও বার্তায় এলোপাতাড়ি কথা বলে চলেছেন; বিবেচনাবোধ সেখানে প্রায়ই অনুপস্থিত। বিএনপি নেতাকর্মীর প্রতি সরকারের হামলা, হয়রানি, মামলার খবর গণমাধ্যমে নিয়মিত; এর বিরুদ্ধে যথার্থ প্রতিরোধ আন্দোলন আমরা দেখি না।

এই সুযোগে মঞ্চে চলে আসে জাতীয় পার্টি। বিরোধী দলের সদস্য হয়েও সরকারের মন্ত্রী হওয়ার মতো অবিশ্বাস্য সুযোগ ঘটে তাদের।

৪.

এবং নির্বাচনী ধরপাকড় নিয়ে একটি গল্প।

আশির দশকের মাঝামাঝি পাকিস্তানে জেনারেল জিয়াউল হকের শাসনামল। নির্বাচনের আগে বিরোধীদলীয় কয়েক হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসব ধরপাকড় যখন চলছিল তখন সারাদেশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষত প্রয়াত নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টোর গ্রাম লারকানাতে।

সে গ্রামে একটি বাড়িতে এক রাতে প্রচণ্ড করাঘাতের শব্দ শোনা যায়। ওই বাড়ির কোনো অধিবাসীই দরজা খুলে দিতে সাহস পায় না। তারা সবাই ঘুমের ভান ধরে পড়ে থাকে। করাঘাতের শব্দ বাড়তেই থাকে, আর তা এত জোরে যে মনে হয়, দরজা কেউ ভেঙেই ফেলবে!

তখন বাড়ির সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তিটি ভাবলেন, আমার আর ক’দিন! আমার ভয় কীসের? আমি দরজা খুলে দেব।

তিনি বিছানা থেকে উঠে দরজা খুললেন, এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি ছুটে বাড়ির মধ্যে ফিরে এলেন, আনন্দে চিৎকার করে বলতে থাকলেন– ‘ভাইসব! উঠে পড়ুন। উঠে পড়ুন। বাড়িতে পুলিশ আসেনি। বাড়িতে আগুন লেগেছে মাত্র ...’

মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল ও সাহিত্যিক
mahbubaziz01@gmail.com