ঢাকা শনিবার, ১৮ মে ২০২৪

করোনাকালে উপনির্বাচন

'আত্মঘাত' থেকে সরে আসুন

'আত্মঘাত' থেকে সরে আসুন

ড. হাছান মাহমুদ- ফাইল ছবি

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২০ | ১২:০০

জাতীয় সংসদের শূন্য দুটি আসনে স্থগিত থাকা উপনির্বাচন অনুষ্ঠানের যে সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশন গ্রহণ করেছে, তা আমরা স্বাগত জানাতে পারছি না। দেশে যখন করোনাভাইরাস সংক্রমণ এবং এর জের ধরে মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলছে, তখন বগুড়া-১ ও যশোর-৬ আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠান 'জরুরি' হয়ে ওঠা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। আমাদের মনে আছে, এই দুই আসন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট গ্রহণের তারিখ ছিল ২৯ মার্চ। তার আগে ২১ মার্চ ঢাকা-১০, গাইবান্ধা-১, বাগেরহাট-৪ আসনে ভোট গ্রহণের তারিখ নির্ধারিত হয়। কিন্তু মার্চের মাঝামাঝি থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ জনসমাগমস্থলগুলো বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। তারপরও উপনির্বাচনগুলো অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। শেষ পর্যন্ত প্রথম দফায় তিনটি আসনে উপনির্বাচন হলেও, দ্বিতীয় দফায় দুই আসন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করে কমিশন। বস্তুত জনসমাগম যেখানে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সংক্রমণের আদর্শস্থল হতে পারে, সেখানে সংসদ নির্বাচনের মতো আয়োজন স্পষ্টতই 'আত্মঘাতী'। আমরা জানি, এদেশে নির্বাচন মানে বিপুল জনসমাগম এবং পাড়ায়-মহল্লায় দলে দলে গিয়ে দ্বারে দ্বারে প্রচারণা। আর এক একটি সংসদীয় এলাকার বিস্তৃতিও বিবেচনাযোগ্য। যে কারণে স্থগিত ঘোষণার সিদ্ধান্তকে আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই স্বাগত জানিয়েছিলাম। আমাদের প্রশ্ন, পরিস্থিতির কী এমন উন্নতি ঘটেছে যে, স্থগিত উপনির্বাচন আবার গ্রহণ করতে হচ্ছে? আমরা বরং পরিস্থিতির আরও অবনতিই দেখছি। মার্চে যেখানে করোনা সংক্রমণ রাজধানী ও উপকণ্ঠে সীমিত ছিল, এখন সেখানে ছড়িয়ে পড়েছে আলোচ্য দুই সংসদীয় আসনসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। রোববার সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন সিদ্ধান্তকে যে বিশেষজ্ঞদের বরাতে 'আত্মঘাতী' আখ্যা দেওয়া হয়েছে, তাতে অত্যুক্তি থাকতে পারে না। আমরা মনে করি, নীতিগতভাবেই এমন সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা উচিত। এভাবে নির্বাচন আয়োজনের কারণে যদি একজনও করোনায় আক্রান্ত হয় বা প্রাণ হারায়, তার দায় কি নির্বাচন কমিশন এড়াতে পারে? আমরা মনে করি, নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হলে নির্বাচনটি স্থগিত রাখার কারিগরি ব্যবস্থা অধরা থাকতে পারে না।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে তারা স্থগিত দুই আসনের উপনির্বাচন অনুষ্ঠানে বাধ্য হচ্ছেন। সংবিধানে বলা আছে, আসন শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে। ওই সময়ের মধ্যে সম্ভব না হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হতে হবে। এটা ঠিক যে, আলোচ্য দুই আসনে ইতোমধ্যে ১৮০ দিন পার হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। কিন্তু সমকালের কাছেই একজন সাবেক নির্বাচন কমিশনার বলেছেন যে, ১৮০ দিনের সাংবিধানিক নির্ধারিত সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরিস্থিতির জন্য প্রযোজ্য হবে না। প্রাকৃতিক পরিস্থিতির কারণে যদি নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব না হয়, তাহলে অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করা যাবে। আমরা দেখছি, নির্বাচন ও সুশাসন নিয়ে কর্মরত নাগরিক সংগঠন সুজনের পক্ষেও একই ধরনের অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছে। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের এই বক্তব্য সঙ্গত যে, প্রয়োজনে এই বিশেষ পরিস্থিতির জন্য উচ্চ আদালতে গিয়ে নির্দেশনা আনা যেতে পারে। কিন্তু তার বদলে সময়মীমার দোহাই দিয়ে বিপুল সংখ্যক মানুষকে স্বাস্থ্য এমনকি জীবনের ঝুঁকিতে ফেলা উচিত হবে না। আমরা মনে করি, এমন সময়ে নির্বাচন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্যও 'স্বাস্থ্যসম্মত' নয়। আমরা ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ১০ আসনের উপনির্বাচন দেখেছি। সেখানে ভোটার উপস্থিতি ছিল নগণ্য। গাইবান্ধা ও বাগেরহাটের উপনির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল আরও কম। আলোচ্য দুই আসনের উপনির্বাচনেও এমন পরিস্থিতির ব্যত্যয় ঘটবে বলে মনে হয় না। বরং এখন ভোটার উপস্থিতি আরও কম হতে পারে। এক্ষেত্রে প্রতিনিধি নির্বাচনে জনমতের কতটা প্রতিফলন ঘটবে? জনসমাগম কম থাকবে বলে সংক্রমণ কম হবে- এমন ভ্রান্তিরও অবকাশ নেই। কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রয়োজনীয় জনবল মোতায়েন করতেই হবে। তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকির
দায়ই বা কে নেবে? আমরা মনে করি, এখনও সময় আছে। এমন 'আত্মঘাত' থেকে নির্বাচন কমিশন সরে আসবে। প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশনের উচিত উচ্চ আদালত কিংবা রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে এই বিশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্দেশনা গ্রহণ করা। নাগরিকের জীবনের চেয়ে আনুষ্ঠানিকতা বড় হতে পারে না।

আরও পড়ুন

×