ঢাকা রবিবার, ২৬ মে ২০২৪

চারদিক

রংচুগাল্লা: জুম হারানোর বেদনা

রংচুগাল্লা: জুম হারানোর বেদনা

বহ্নি ফারহানা

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১৪:৩৭

সেই চুনিয়ার কথা বলছি, যে চুনিয়া গ্রামটিকে নিয়ে রফিক আজাদ তার বিখ্যাত 'চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া' কবিতায় লিখেছেন- 'চুনিয়া যোজনব্যাপী মনোরম আদিবাসী ভূমি'। টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার চুনিয়া গ্রামটিতে বাস করেন মান্দি জাতির মানুষেরা। আমরা যাদের গারো বলে চিনি। মান্দিরা যে ভাষায় কথা বলে, সেই আচিক ভাষার মান্দি শব্দের বাংলা হবে মানুষ।

মান্দিদের দ্বিতীয় প্রধান উৎসব 'রংচুগাল্লা'য় যাওয়ার সুযোগে এবার জানা হলো এই মানুষগুলোর ধর্ম, সংস্কৃতি এবং বন হারানোর বেদনার কথা। করোনার কালে উৎসবে রং কমেছে বলে শুনলাম। তবে আমার কাছে তুলনাটা অজানা বলে যা দেখা গেল, তাই যথেষ্ট বলে মনে হয়েছে। বরং ভাবনাটা এসেছে অন্য কিছু অনুষঙ্গ ধরে। মান্দিদের আদি ধর্ম সাংসারেকদের একটি আমুয়া অর্থাৎ, পূজা হলো রংচুগাল্লা। প্রায় শতভাগ মান্দি খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে যাওয়ার পরও কেমন করে এই পূজাটির প্রচলন রয়ে গেল? তাহলে কি তারা একটি নতুন ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার পরও পুরোনো আচারে আস্থা রাখে? যাদের সঙ্গে আমার এই পূজা দেখতে যাওয়া, তাদেরই একজন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ফারহা তানজীম তিতিল বললেন- রংচুগাল্লা যতটা না পূজা, তারও বেশি উৎসব বা সামাজিক কৃত্য। মান্দিদের সবচেয়ে বড় উৎসব ওয়ান্না বা ওয়ানগাল্লার আগের পর্বটি হলো রংচুগাল্লা। ওয়ান্না এবং রংচুগাল্লা এই পূজা দুটি মূলত জুমচাষকেন্দ্রিক মান্দিদের কাছে নতুন ফসল পাওয়ার উৎসব। এই উৎসব দুটিতেই নানান মিদ্দি মানে দেবদেবীর পূজাও দেওয়া হয়ে থাকে।

চুনিয়ার আদিবাসীদের সঙ্গে আলাপে জানা গেল, একসময় মান্দিরা দলবেঁধে মধুপুরের গড়ে জুমচাষ করতেন। মান্দিদের পূজাগুলোর সবই তাদের জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত। জীবনযাপনে পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে বিগত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকে। তখনই মধুপুরের বনকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৬২ সালে মধুপুরের এই বনকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করে কড়াকড়িভাবে আদিবাসীদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয় বনের অধিকার। ১৯৮৬ সালে রাবার চাষের মাধ্যমে মধুপুর বনকে আরও ক্ষত-বিক্ষত করা হয়। ২০০৩ সালে আবার ইকো পার্ক প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে মধুপুর বনকে বিপদাপন্ন করা হয়। এসব প্রকল্পের কারণে প্রাণবৈচিত্র্যসহ অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির তো পরিমাণ নিরূপণ হয়নি।

জুম চাষে বনের ক্ষতি হয় এমন অজুহাতে আদিবাসীদের কাছ থেকে বনকে কেড়ে নিয়ে এসব নানামাত্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ একটা সময় আদিবাসীরা যখন তাদের লোকায়ত জ্ঞান দিয়ে চাষাবাদ করত, তাতে প্রকৃতির প্রাণবৈচিত্র্যের কোনো ক্ষতি হতো না। যে জায়গায় জুম চাষ করা হবে, সে জায়গার জঙ্গল ও আগাছা বিশেষ কৌশলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়ে থাকে। কৌশলে আগুন ধরানো হয় বলে বনাঞ্চলে এই আগুন যেমন ছড়িয়ে পড়ে না, তেমনি টিকে থাকার স্বার্থেই আদিবাসীরা জুম চাষ করতে গিয়ে বন ও চাষ এলাকার কোনো বড় বা দামি গাছের ক্ষতি করে না। বৃষ্টির পর নির্বাচিত জুমের জমিতে পুড়ে যাওয়া জঙ্গল ও আগাছার ছাই সারের কাজ করে। এরপর সেখানে কয়েক ধরনের ফসল বোনা হয়।

জুমচাষ নিষিদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নষ্ট হয়েছে বনের সঙ্গে সেখানে বহু বছর ধরে বসবাসরত মানুষের আত্মিক সম্পর্ক। জুমের ফসল নিয়ে পূজা-পার্বণ, তাদের ধর্ম বিশ্বাস, সংস্কৃতি সবকিছু আজ বিলুপ্তির পথে। সেইসঙ্গে হারিয়ে গেছে বনের প্রাণ। হারিয়ে যাচ্ছে অনেক পশুপাখি, গাছগাছালি। হারাচ্ছে মান্দিদের জীবনের রং।

রংচুগাল্লায় এসে বুঝতে পারলাম, একে একে সবাই ধর্মান্তরিত হলেও চুনিয়ায় জনিক নকরেকের মতো আরও কিছু মানুষ আদি ধর্মকে আঁকড়ে ধরে আছেন। জনিক কেবল চুনিয়ায় নন, চুনিয়াবাসীর দাবি যথার্থ হলে দেশের সবচেয়ে প্রবীণ মানুষদের একজন হবেন। মান্দিদের আদি ধর্ম সাংসারেক ধর্ম এখন কেবল এই প্রবীণদের স্মৃতি এবং কৃত্যেই বেঁচে আছে। যারা ধর্মান্তরিত না হয়ে নিজেদের ধর্ম এবং ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন, হয়তো এক দিন এই মানুষগুলোর অবর্তমানে জুম চাষ যেমন নতুন প্রজন্মের মান্দিদের কাছে স্মৃতি, তেমনই সাংসারেক পূজা এবং কৃত্যগুলোও স্মৃতিতে পরিণত হবে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কোনো মান্দি শিশু হয়তো এক দিন বই পড়ে জানবে 'রংচু' অর্থ চিড়া আর 'গাল্লা' অর্থ উৎসর্গ। রংচুগাল্লা মানে এই পূজায় দেবতাকে চিড়া, গুড়, চিনি উৎসর্গ করা হয়। এই পূজা সম্পন্ন হওয়ার আগে ফসল তোলা অপরাধ। জুমের ফসল না থাকলেও জুমচাষ থেকে আসা এই পূজা এখনও হয় চুনিয়ার মতো মধুপুরের আরও কিছু গ্রামে। এবারের উৎসবের শেষে নকমা মানে গ্রামপ্রধানের বাড়িতে সমাপনীর অনুষ্ঠানে যে করুণ সুর বাজছিল, তা শুনে আমার কাছে মনে হয়েছিল রংচুগাল্লা যেন জুম হারানোর বেদনা হয়ে বাজছে।

প্রশিক্ষণার্থী সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×