ঢাকা শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

বিনোদন

বলিউডের রাজনীতি ও দুই কন্যার 'পাঙ্গা'

বলিউডের রাজনীতি ও দুই কন্যার 'পাঙ্গা'

সঞ্জয় সাহা পিয়াল

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১৪:৪০

করোনাকালে নতুন সিনেমা রিলিজ না হলেও বলিউডের বাজার কিন্তু হাত পোড়ানো গরম! বলছি পড়শি দেশের সিনেমাপাড়ার কথা। সেখানে এখন দুই কন্যা রিয়া চক্রবর্তী ও কঙ্গনা রানাউতকে নিয়ে মিডিয়ায় 'জ্যায়সা ফিল্মো মে হোতা হ্যাঁয়' নাটক। যার শুরু সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যু দিয়ে। একটি আত্মহত্যা থেকে প্ররোচিত আত্মহত্যা, সেখান থেকে বলিউডের স্বজন পোষণের অভিযোগ। এই রিয়েলিটি শোতে এরপর রিয়া চক্রবর্তী ও মাদকের প্রবেশ এবং বহুকাঙ্ক্ষিতভাবেই শেষ পর্যন্ত রাজনীতির প্রলেপ। এই অংশে আগমন 'কুইন' খ্যাত নায়িকা কঙ্গনা রানাউতের। মহারাষ্ট্রের কংগ্রেস সমর্থিত শিবসেনা সরকারের সঙ্গে এখন তার 'পাঙ্গা'। এই নামে একটি সিনেমা করেছেন কঙ্গনা।

সুশান্ত সিং রাজপুতের খুব বেশি সিনেমা দেখা হয়নি। খুব বেশি বলতে ওই একটি ছবিই দেখা হয়েছে, যেটা ক্রিকেটার মহেন্দ্র সিং ধোনির জীবনী নিয়ে নির্মিত- 'এমএস ধোনি : আনটোল্ড স্টোরি'। সিনেমাটিতে ধোনির মতো হেলিকপ্টার শট মারতে দেখে সুশান্ত ছেলেটিকে বেশ ভালোই লেগেছিল। সুদর্শন, স্মার্ট। মুম্বাইয়ের ফ্ল্যাটে গেল ১৪ জুন তার মৃত্যুর খবরে অনেক ভারতীয় ক্রিকেটারই টুইটারে শোক জানিয়েছিলেন। বলিউডও শোকে আহত ছিল, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তখন নীরব ছিল বলিউডের একটি বড় অংশ। এটা সেই অংশ, যাদের বলিউডি সুশীল বলা হয়।

বেডরুম থেকে গলায় রশি প্যাঁচানো অবস্থায় পাওয়া সুশান্তের মৃতদেহ নিয়ে মুম্বাই পুলিশও চল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে 'এটা আত্মহত্যা' বলে রায় দিয়ে দেয়। সুশান্তের ভক্তকুল এত দ্রুত মেনে নিতে পারেনি। কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় তার প্রেমিকা রিয়া চক্রবর্তীকে।

নামের টাইটেল দেখেই স্পষ্ট রিয়া বাঙালি মেয়ে। বলিউডে রানি মুখার্জি আর বিপাশা বসুর পর সেভাবে কোনো নায়িকাকে সেখানে দাপট দেখাতে দেখা যায়নি। রিয়া বাঙালি হলেও জন্ম ও বেড়ে ওঠা ব্যাঙ্গালুরুতে। সুশান্তের মৃত্যুর জুতসই ক্লু না পেয়ে ভারতীয় মিডিয়ায় শুরু হয়ে যায় রিয়া চক্রবর্তীকে নিয়ে অষ্টপ্রহর বদনামনামা। স্যোশাল মিডিয়ায় হ্যাশট্যাগে প্রতিশোধের গর্জন আর কর্কশ মিডিয়ার সান্ধ্য আদালতে রিয়া চক্রবর্তীকে ভার্চুয়াল গণপিটুনি! শেষ পর্যন্ত বলিউডের এই অখ্যাত বাঙালি কন্যা এখন কারাগারে।

অপরাধ? সুশান্তের মৃত্যুর সঙ্গে জড়িতের কোনো কারণে নয়। তাকে জেলে পাঠানো হয়েছে মাদক সেবন ও বহনের কারণে। দু-দু'বার জামিন আবেদন করেও ব্যর্থ হয়েছেন। রিয়ার অসহায় পিতা একপর্যায়ে বলেই ফেলেছেন- 'একটি মধ্যবিত্ত পরিবারকে কীভাবে ধ্বংস করা যায়, তা দেখিয়ে দেওয়া হলো। অভিনন্দন ভারত!'

রিয়ার পক্ষ থেকে যে দু-চারজন কথা বলছে বা টুইট করেছে তাদেরকে 'সুশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ' ছাপ বসানো হয়েছে। ওদিকে সামনে বিহারের ভোট। সুশান্ত বিহারের ছেলে হওয়ায় সেখানেও এই মৃত্যুকে ঘিরে কিছু কিছু বিজেপি নেতা নির্বাচনী পোস্টার ছাপিয়েছে। মহারাষ্ট্র সরকার ও মুম্বাই পুলিশের তদন্তের ওপর অনাস্থা আনা হয়েছে। মহারাষ্ট্র সরকার যেহেতু কংগ্রেস শাসিত, তাদের হাতে সুশান্তের মৃত্যুর তদন্তভার না দিয়ে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআইকে সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বলিউডের বক্স অফিস হিট করা ছবি যেমন রোমান্স, সাসপেন্স, অ্যাকশন ও থ্রিলারে ভরপুর থাকে তেমনই সুশান্ত-রিয়া-কঙ্গনা আর উদ্ধব ঠাকুরকে নিয়ে সেখানকার মিডিয়ায় ভরপুর বিনোদন চলছে।

করোনায় প্রতিদিন যেভাবে ভারতে আশি হাজারের ওপর রোগী শনাক্ত হচ্ছে, যেভাবে লাদাখ সীমান্তে চীন-ভারত উত্তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলছে- মিডিয়ার সেভাবে চোখ নেই। কারণ তারা জানে টিআরপি বাড়াতে বলিউডের তরজা নিয়ে চর্চা করার চেয়ে উত্তম বিষয় আর হতে পারে না। রিয়া চক্রবর্তীকে জেলে পুরিয়ে দিয়েও অনেকে দেশপ্রেমের সদম্ভ প্রমাণ করছেন।

বলিউডের সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ডের মাখামাখির গল্প নব্বইয়ের দশক থেকেই জনসাধারণের দখলে। কিন্তু সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর পর বলিউডের অজানা একটি গল্পও ক্যামেরার সামনে এসেছে। 'নেপটিজম' হ্যাশট্যাগে সোশ্যাল মিডিয়া কাঁপিয়ে দিয়েছে। আরব সাগরপাড়ের ওই ফিল্মি দুনিয়ায় স্বজন পোষণের কারণে সুশান্তের মতো 'বহিরাগত' (যাদের পরিবারের কেউ বলিউড স্টার নন) তাদের প্রতিভা দেখানোর সুযোগ পাচ্ছেন না- এমন একটা ধারণা বেশ মজবুত ভিত পেয়েছে। বলিউডের খান আর কাপুর গোষ্ঠীর আশীর্বাদ ছাড়া কেউ নাকি সেখানে থিতু হতে পারে না। এই ধারণা এতটাই শক্ত ভিত্তি পেয়েছে যে, সম্প্রতি আলিয়া ভাট আর সঞ্জয় দত্তের 'সড়ক টু' ছবিটি মুখ থুবড়ে পড়েছে বক্স অফিসে। পরিচালক করন জোহর তার টুইট অ্যাকাউন্টও ডিজঅ্যাবল করছেন এই রোষের হাত থেকে বাঁচতে। আর এই 'নেপটিজম' আন্দোলনে আগুনে ঘি ঢেলেছেন কঙ্গনা রানাউত। তার অভিযোগ- অতীতের নায়ক-নায়িকার ছেলেমেয়েরাই এখন কেবল বলিউডে সুযোগ পান, অন্যদের সুযোগ দেওয়া হয় না।

মহারাষ্ট্র রাজ্য সরকারের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে শিবসেনার সঙ্গে বলিউডের আন্ডারওয়ার্ল্ড সাম্রাজ্যের সক্ষমতার কথা জানিয়ে মুম্বাইকে 'পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর' বলেছেন। কাজের সূত্রে কয়েকবার মুম্বাই যাওয়া হয়েছে, দেখেছি সেখানে মারাঠিদের মধ্যে জাত্যাভিমান নিয়ে স্পর্শকাতরতা। তাই সিমলার মেয়ে কঙ্গনা যখন মারাঠিদের প্রাণের শহর মুম্বাই নিয়ে অমন কথা বলেন, তখন পুরো মহারাষ্ট্র কঙ্গনার বিপক্ষে চলে যায়। সেই সুযোগটাই কাজে লাগাতে গিয়ে ভুল করে বসে শিবসেনা সরকার। তারা কঙ্গনাকে মুম্বাই আসতে না ঠেকাতে পেরে তার ৪৬ কোটি রুপির অবৈধ স্থাপনা ঘোষণা করে ভেঙে দেয়। মাত্র ২৪ ঘণ্টার নোটিশে এভাবে কারও অফিস বা বাড়ি ভাঙার ঘটনা এর আগে ঘটেনি মুম্বাইতে। উদ্ধব ঠাকুরের সরকার যে 'উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই এমনটা করেছে, সেটা মুম্বাই হাইকোর্টও বলে দেন। এমনকি শিবসেনা সমর্থিত এনসিপি জোটের নেতা শারদ পাওয়ার বলে দেন কঙ্গনাকে এতটা গুরুত্ব দেওয়ার কিছু ছিল না, তার অফিস ভাঙাটা ঠিক হয়নি। অফিস ভাঙার পর সহানুভূতির ঢেউ অনুভব করেছেন কঙ্গনা, যা শুধু তাকে আরও জোরালো ভূমিকাতেই অবতীর্ণ করেনি, সঙ্গে বলিউডের এই চলতি তরজাকে আরও দীর্ঘ করতে চলেছে। তাই বলিউডের সিনেমা আপাতত হলে রিলিজ হোক না হোক মোঙ্গাবো-বাসন্তীদের নিয়ে বলিউডের এই আধুনিক 'শোলে' কিন্তু আরও বেশ কিছুদিন চলবে।

সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×