ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪

সমাজ

'কিশোর গ্যাং' উপসংস্কৃতির গতি-প্রকৃতি

'কিশোর গ্যাং' উপসংস্কৃতির গতি-প্রকৃতি

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২০ | ১২:০০

বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের দুঃসহ সংক্রমণ বিস্তার ও নির্দয় প্রাণ সংহারের চলমান দৃশ্যপট এবং সম্ভাব্য দ্বিতীয় তরঙ্গের ভয়াবহতা নিয়ে মানুষের হৃদয়ে অজানা-অদৃশ্য আশঙ্কা আতঙ্কের বাসা বেঁধে চলেছে। কঠিন মানবিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি নতুন সংযোজিত সংকট হচ্ছে 'কিশোর অপরাধ'। 'কিশোর গ্যাং উপসংস্কৃতি' সমসাময়িক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রপঞ্চ। এর সঠিক অনুধাবন-গতি-প্রকৃতি-মাত্রিকতা-কারণ ইত্যাদির বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা ব্যতিরেকে সংশ্নিষ্ট সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং সমাধান সম্ভাবনার স্বরূপ উন্মোচন অতিশয় দুরূহ ব্যাপার। দেশের নগর-শহর-জেলা-উপজেলাসহ প্রত্যন্ত প্রান্তিক অঞ্চলে এই উপসংস্কৃতির বিকাশ ও বিস্তার ইতোমধ্যে ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও জনশ্রুতি অনুসারে পারিবারিক-সামাজিক অনুশাসনের বিপর্যয়, অনৈতিক-অবৈধ পন্থায় বিভিন্ন দলের পদ-পদবিপ্রাপ্ত জঙ্গি-সন্ত্রাসী-মাদকসেবী-দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিকের কুৎসিত প্রভাব এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত। সর্বোচ্চ উচ্চশিক্ষা থেকে শুরু করে নিম্নতম পর্যায়ের শিক্ষা-সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মেধাশূন্য অযোগ্য-অপদার্থ, অর্থ-ক্ষমতা লিপ্সু ব্যক্তিদের নিকৃষ্ট-জঘন্য অপকৌশল অবলম্বনে লবিং-তদবির-কথিত সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসনিক পদ-পদায়ন দখল ও রক্ষায় ব্যক্তিস্বার্থে এদের ব্যবহার অমার্জনীয় পাপাচারতুল্য। এই উপসংস্কৃতিতে জড়িত কিশোরদের বিপথগামী করে 'বড় ভাই' নামধারী ব্যক্তিরা বরাবরই আড়ালে থেকে যাচ্ছে। 
নিকট অতীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত বিশ্বের প্রায় দেশে ষোলো বছরের নিল্ফেম্ন অপ্রাপ্ত বয়স্কদের অসামাজিক ও আইনবিরোধী কার্যকলাপকে কিশোর অপরাধ এবং ষোলো বা তদূর্ধ্ব বয়স্কদের এমন কার্যকলাপকে অপরাধ বলে গণ্য করা হতো। আমাদের দেশে আইন অনুযায়ী সাত থেকে ষোলো বছর বয়স্কদের এমন অপরাধীদের কিশোর অপরাধী বলা হয়। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাময়িকী ল্যানসেট চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডলসেন্ট হেলথের গবেষণা প্রবন্ধ মতে, ১০ বছর বয়স থেকেই কিশোর জীবন প্রবাহের যাত্রা শুরু হয়। মূলত কিশোর গ্যাং বা গ্যাং উপসংস্কৃতিতে জড়িতদের বয়স হচ্ছে প্রায় ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৭ বছর।
আমাদের হয়তো অনেকেরই জানা, এই অপসংস্কৃতির উৎসমূলে রয়েছে ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্রুত সামাজিক পরিবর্তন ও বিপুল জনসংখ্যা বৃদ্ধি। সাধারণত নানামুখী জীবন নির্বাহের ধরন, কর্মসংস্থান, অপরিকল্পিত নগরায়ণ-শিল্পায়নের ফলে সৃষ্ট গ্রাম থেকে শহরমুখী গণস্থানান্তর, চরম বৈষম্যের বহিঃপ্রকাশে এর কলুষিত প্রবৃদ্ধি বিকশিত হয়। বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি, দ্রুততর সময়ের মধ্যে ক্ষমতা-অর্থসম্পদ-বিত্তশালী হওয়ার প্রলোভন ও জীবন প্রবৃত্তিরই বিপরীত-নেতিবাচক বীভৎস তাড়না সভ্যতার সাবলীল ও মঙ্গলময় বিকিরণে প্রতিষ্ঠিত অপশক্তিমান প্রতিবন্ধকতা এবং অন্তরায়। এ কারণেই উন্নত বিশ্বের প্রায় প্রত্যেক নগরেই ১৮৭০ সালে স্থায়ী পুলিশ বিভাগ স্থাপিত হয়। বিংশ শতাব্দীর প্রাথমিক পর্যায়ে কিশোর অপরাধ ব্যাপ্তির সঠিক মূল্যায়ন করার জন্য পুলিশ বিভাগে বিশেষায়িত শাখা প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এ সময় নারী অফিসারদের এসব কর্মকাণ্ড তদারকির ভার দেওয়া হয়। 
১৯২৪ সালে প্রায় বৃহৎ নগরগুলোয় 'কিশোর ব্যুরো' স্থাপিত হয়। ১৯৩০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিট ও সংশ্নিষ্ট প্রচণ্ড বিধ্বস্ত অর্থনীতি এই কিশোর অপরাধকে গ্যাংভিত্তিক উপসংস্কৃতিতে পরিণত করে। আমরা হয়তো এও জানি, উনিশ শতকের মাঝামাঝি যুক্তরাজ্যে কিশোর গ্যাংগুলো ভয়ানক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। ১৮৯০ সালের দিকে কিছু প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি এদের কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ জনগণের সুরক্ষায় উদ্ভাবনী এক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এরই ফলে সৃষ্ট বিশ্বখ্যাত ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও ম্যানচেস্টার সিটি ক্লাবের প্রতিষ্ঠা এবং সন্ত্রাসী তরুণদের খেলা ও মননশীল বিনোদনের দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করার লক্ষ্যে ফুটবল খেলা অধিকতর স্বল্প সময়ের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। উল্লিখিত এই ক্লাব দুটির মাধ্যমে কিশোর-তরুণদের বিকৃত মনোভাবকে পাল্টে দিয়ে সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে প্রচণ্ডভাবে উৎসাহিত করা হয়।
২০১৮ সালের ৬ জানুয়ারি বাংলাদেশে উত্তরা ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র আদনানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী 'নাইন স্টার' ও 'ডিসকো বয়েজ'-এর সংঘাতের বিষয়টি বাংলাদেশের জনগণের বিস্মৃত হওয়ার কথা নয়। সহজ-সরল অর্থে এ দুটি কিশোর গ্যাংয়ের মূল কাজ ছিল পার্টি করা, বিকট শব্দে হর্ন বাজিয়ে দ্রুততম গতিতে মোটরসাইকেল চালানো, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, যা ধীরে ধীরে তাদের সন্ত্রাস-মাদক-ছিনতাই-চুরি-ডাকাতি-হত্যা-ধর্ষণসহ সমাজের আইনবিরোধী ঘৃণ্য কর্মযজ্ঞে জড়িত করে। আমরা হয়তো অবগত আছি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যুদ্ধোত্তর ধ্বংসযজ্ঞের প্রভাবে ক্রমবর্ধমান অসমতা ও বৈষম্য সমাজে ব্যাপক অসংগতির জন্ম নেয়। বিশেষ করে ১৯৫৫ সাল থেকে বিপুলসংখ্যক কিশোর অপরাধী এবং গ্যাংয়ের উত্থান ঘটে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় অর্থ ও সুযোগ-সুবিধা সহজে প্রাপ্তির কারণে কিশোররা বেপরোয়াভাবে তাদের স্বাধীন সত্তার অপব্যবহারে লিপ্ত হয়। 
সম্ভবত 'টেডস্থ যুদ্ধোত্তর বিশ্বে প্রথম উপসংস্কৃতি। পরবর্তীতে 'রক এন রোল' জাতীয় বহুমাত্রিক কদাচার কিশোর গ্যাং উপসংস্কৃতির অশুভ অগ্রসরমানতাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিশোরদের অধিকার যথার্থ সংজ্ঞায়িত করে এসব নষ্টামি থেকে পরিত্রাণের উদ্দেশ্যে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক আইন-কনভেনশন-গাইডলাইন তৈরি করে। ১৯৮৯ সালে 'দ্য কনভেনশন অন দ্য রাইট অব দ্য চাইল্ড (সিআরসি)' প্রণয়ন ও আর্টিকেল ২-এর ব্যাখ্যায় ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-ভাষা-জাতীয়তা-রাজনৈতিক মতামত, নৃজাতিক-সামাজিক পরিচিতি, সম্পদ, প্রতিবন্ধী, জন্ম এবং অন্যান্য সব মর্যাদার বিষয়টি আমলে নিয়ে কিশোর-তরুণ ও পিতামাতা-অভিভাবকদের দায়িত্ব-কর্তব্য-অধিকার বর্ণিত হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্রান্তিকাল, দরিদ্রতা-স্থানান্তর-ভঙ্গুর পরিবার, পারিপার্শ্বিক প্রতিবেশ ও পরিবেশ, পিতামাতার শিথিল নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন অরুচিকর বিনোদন ও কল্পিত নায়ক-খলনায়কের মধ্যে সহিংস বিরোধ দৃশ্যের প্রদর্শন, গৃহবিবাদ, ভূমিহীনতা ও মাদক সেবন-বিক্রি, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ক্রয়-বিক্রয়-ব্যবহার ইত্যাদি প্রণিধানযোগ্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত।
তাত্ত্বিক পর্যালোচনায় আমরা দেখি, অধ্যাপক আরকে মার্টনের মতে নির্ভরশীল অনুমান, প্রত্যয় ও প্রস্তাবনার বিমূর্ত, সামান্যকৃত তাত্ত্বিক বিন্যাসের ওপরই সমাজের বিরূপ আচরণ বা অপরাধ প্রবণতার উপায় ও উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠিত। সমাজ ও সংস্কৃতির অস্তিত্ব, সংহতি এবং নিরবচ্ছিন্নতা পরিপুষ্ট হয় পারস্পরিক সমঝোতা-সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার যথাযথ অনুশীলনে। অধ্যাপক মার্টন এসব সমাজ-আইনবিরোধী কার্যকলাপকে ব্যতিক্রমী ক্রিয়া বা বিচ্যুত আচরণ হিসেবেই আখ্যায়িত করেছেন। নানাবিধ ক্রিয়াবাদী দৃষ্টান্ত বা প্যারাডাইম ব্যবহার করে নব্য প্রথা প্রবর্তন, আচারপরায়ণতা, পশ্চাৎমুখিনতা ও বিদ্রোহ ইত্যাদির গ্রহণ-বর্জনে প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার বিভাজিত ফলাফল ব্যাখ্যা করেছেন। 
অপরাধ বিজ্ঞানীদের কেউ কেউ মনে করেন, অপরাধের শাস্তি যদি অপরাধীর অন্তরে অপরাধ কর্মের জন্য কঠিন যন্ত্রণার উদ্রেক না করে, অপরাধপ্রবণতা সমুদয় প্রমুদিত হয়। মনীষী কার্ল মার্কস, সিগমুন্ড ফ্রয়েড, এমিল ডুর্কেইম, জেলেমি বেনথাম, সিজার লমব্রোসো, এনড্রিকো ফেরি, রাফেলে গ্যারোফেলো, এডউইন এইচ সুদারল্যান্ডসহ খ্যাতিমান সমাজ-মনো-নৃবিজ্ঞানী এবং অপরাধ বিজ্ঞানীরা নানাবিধ শারীরিক-মনস্তাত্ত্বিক-সুস্থ ও সুষ্ঠু পারিবারিক বন্ধন-সৎ ও অসৎ সঙ্গ-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া-নৃজাতিক নানা দৃষ্টিকোণ থেকে নৈরাজ্যজনক পরিস্থিতিতে কী ধরনের অপরাধ কীভাবে সংঘটিত হয়ে থাকে, তার বিশদ বিশ্নেষণ করেছেন। 
স্বল্প পরিসরে এসবের বিস্তারিত পর্যালোচনা সম্ভব নয়। মোদ্দা কথা হচ্ছে, ধ্বংসের তলানিতে পৌঁছানোর আগেই জনসংখ্যার তুলনায় স্বল্পসংখ্যক এসব কিশোর অপরাধী ও গ্যাং উপসংস্কৃতি নির্মূলে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে পর্যাপ্ত সংশোধনের ব্যবস্থা, কাউন্সেলিং-নিরাময় কেন্দ্র, পরিবারের যথোপযুক্ত মনোযোগ, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। একই সঙ্গে অপরাধীদের ও তাদের ইন্ধন-উৎসাহদাতাদের কঠোর আইনের আওতায় আনা না গেলে এই কিশোর গ্যাং উপসংস্কৃতি করোনা অতিমারির চেয়েও ভয়ংকর মহামারির রূপ ধারণ করবে- নিঃসন্দেহে তা বলা যায়।
  শিক্ষাবিদ; সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় 

আরও পড়ুন

×