ঢাকা শনিবার, ১৮ মে ২০২৪

শ্রদ্ধাঞ্জলি

সুরের সারথি

সুরের সারথি

মিতা হক: ১৯৬২-২০২১

শামা রহমান

প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০২১ | ১৪:৪০

সংগীতশিল্পী মিতা হক নেই- এ খবরটি শোনার পর স্তব্ধ হয়ে গেছি। বিষাদে মনটা ছেয়ে আছে। যার সঙ্গে গানের জগতে কাটিয়েছি বহু বছর, সে মানুষটি আমাদের মাঝে নেই- ভাবতে কষ্ট হচ্ছে। করোনায় একে একে সংস্কৃতি অঙ্গন থেকে আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন অনেকে। এ তালিকায় যোগ হলো শুদ্ধ সংগীতচর্চার অন্যতম পুরোধা মিতার নাম। এটি খুবই বেদনাদায়ক। করোনায় অনেকে চলে গেছেন, কিন্তু মিতার এই বয়সে চলে যাওয়ার খবর মেনে নেওয়া কঠিন।

মিতাকে চিনি বহু বছর ধরে। অনেক দিন দেশের বাইরে ছিলাম আমি। ১৯৯১ সালে ফিরেছি। এর পর মিতার সঙ্গে শাহজাদপুর কুঠিবাড়িসহ বহু জায়গায় গিয়েছি। সেসব আজ শুধুই স্মৃতি! আমি তার গান প্রথম শুনেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক মিলনায়তনে (টিএসসি)। সেখানে তার গাওয়া 'আজ শ্রাবণের পূর্ণিমাতে' গানটি এখনও কানে বাজে। এরপর তিনি ব্যস্ত হয়ে গেলেন। বয়সে ছোট হলেও এক সময় আমাদের বন্ধুত্ব আরও গভীর হলো। একসঙ্গে অনেক সময় কাটিয়েছি। তার সঙ্গে গান নিয়ে পরামর্শ করতাম। সমৃদ্ধ হয়েছি অনেক। আমি যেন প্রতিটি অনুষ্ঠানে গান করতে পারি, মিতা তা মনেপ্রাণে চাইতেন।

রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী হিসেবে মিতাকে সবাই চেনেন। কিন্তু জীবনের প্রথম স্টেজ অনুষ্ঠানে তিনি গেয়েছিলেন নজরুলসংগীত। ৫-৬ বছর বয়সে 'নাচে ইরানি মেয়ে' গান দিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। ওই শোতে উঁচু টেবিলের ওপর তাকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ তথ্যটি মিতা আমার সঙ্গে শেয়ার করেছিলেন।

মিতা ভীষণ সাংগঠনিক ছিলেন। একেবারে অন্তর থেকে কাজ করতেন। রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের বেশ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। গড়েছেন 'সুরতীর্থ' নামে একটি সংগীত প্রতিষ্ঠান। সারাদেশে রবীন্দ্রনাথের গান ছড়িয়ে দিতে মিতার অবদান অপরিসীম। এ রকম একজন মানুষ চলে যাওয়ায় কী যে ক্ষতি হলো, সত্যি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়! শুধু দেশে নয়; দেশের বাইরেও তার গানের ভক্ত রয়েছে। কলকাতায় গেলে আমাকে অনেকেই তার কথা জিজ্ঞেস করতেন।

চার মাস আগে মিতা আমাকে ফোন করেছিলেন। বললেন, শামা, তুমি একদিন বাসায় এসো; একসঙ্গে গান করব। কিন্তু তার ইচ্ছা অপূর্ণই থাকল। যাব যাব করেও আমার আর যাওয়া হয়নি। সবাইকে কাঁদিয়ে পৃথিবী থেকে চলে গেলেন মিতা। শুধু বড়মাপের শিল্পী হিসেবেই নন, মানুষ হিসেবেও মিতা ছিলেন সবার কাছে অতিপ্রিয়। ভালো মনের মানুষটির মধ্যে অনেক সরলতা ছিল। অতিথিপরায়ণতা ছিল তার আরেকটি গুণ।

এখন অনেক শিল্পীর কাছ থেকে আমরা প্রশংসা পাই না। কিন্তু মিতা সবার প্রশংসা করতেন। কারও গান শুনে মুগ্ধ হলে সবাইকে তা বলে বেড়াতেন। এ রকম একজন শিল্পী ছিলেন বলেই বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের ভিত অনেক মজবুত হয়েছে। সবচেয়ে বড় যে গুণ ছিল মিতা হকের; তা তার কণ্ঠের মাধুর্য। এমন অসামান্য শিল্পীর আসলে মৃত্যু হয় না। আমি জানি, মিতা তার কণ্ঠমাধুর্যের মধ্য দিয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী

আরও পড়ুন

×