ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪

করোনার নতুন ধরন

বহুমাত্রিক ব্যবস্থার বিকল্প নেই

বহুমাত্রিক ব্যবস্থার বিকল্প নেই

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২১ | ১২:০০

কয়েক দিন আগে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে করোনার বিস্তার ও সংক্রমণের নতুন ধরন ও আমাদের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে তা ছড়িয়ে পড়ায় অধিকতর সচেতনতা-সতর্কতার তাগিদ দিয়ে লিখেছিলাম। কিন্তু শনিবার সমকালে প্রকাশিত শীর্ষ প্রতিবেদনে ফের যে তথ্য উঠে এসেছে তা আমাদের বহুমাত্রিক সতর্কতা ও সক্রিয়তার জোর তাগিদ দিয়েছে। ওই প্রতিবেদনে আইইডিসিআরের গবেষণার সূত্র ধরে বলা হয়েছে, সংক্রমণের ৮০ ভাগই 'ভারতীয় ধরন'। এই নতুন ধরনের সংক্রমণ সীমান্তবর্তী জেলার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ার খবর আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। আমরা জানি, যে কোনো সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণের অন্যতম উপায় নিয়ম মেনে চলা। কিন্তু দেশে করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই অনেকের স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে এক ধরনের উদাসীনতা ও উপেক্ষার মনোভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে; তাতে আমরা বারবার নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতি থেকে বিস্ম্ফোরণোন্মুখ অবস্থায় পড়ছি। চলার ক্ষেত্রে নিয়মের ব্যত্যয় ও জন-উদাসীনতা একই সঙ্গে সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলদের ঢিলেঢালা মনোভাব পুনর্বার যে বিপদাশঙ্কার সৃষ্টি করেছে, এর কমবেশি দায় সবারই।

আমরা জানি, গত মাসের প্রথম দিকে করোনার ভারতীয় নতুন ধরনের শনাক্তের পর তা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। তখন আক্রান্ত কয়েকটি জেলায় সাত দিনের 'লকডাউন' দেওয়া হলেও এ নিয়ে প্রশ্ন ছিল। বিশ্বব্যাপী করোনা-দুর্যোগে স্বীকৃত, এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে আক্রান্ত একটানা ১৪ দিন 'লকডাউন' ফলপ্রসূ হলেও আমাদের নীতিনির্ধারকদের এমন সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আমরা আগেই প্রশ্ন তুলেছিলাম। আমরা এও বলেছিলাম, বস্তুত বিচ্ছিন্নভাবে এক বা দুটি জেলায় নয়, যেসব জেলায় সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী ও নতুন ধরন যেখানেই পাওয়া গেছে, এর বিস্তার ঠেকাতে চলাচলে কঠোর 'লকডাউন' ও তা কার্যকরে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। শনিবার সমকালেই বলা হয়েছে, রাজশাহী মেডিকেল কলেজে রোগীর চাপ ক্রমেই বাড়ছে এবং এক দিনে ১৬ জন ও গত ১২ দিনে ৯৩ জনের মৃত্যু ঘটেছে। আবার অনেকেই হাসপাতালে যাচ্ছেন সংকটাপন্ন অবস্থায় নিপতিত হয়ে। প্রশ্ন দাঁড়ায়- নিজেকে সুরক্ষার ব্যাপারে মানুষের এই উদাসীনতা দূর হচ্ছে না কেন। আমরা জানি, রোগের প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। গণমাধ্যমসহ সরকারের বিভিন্ন মাধ্যমে উপসর্গের লক্ষণ দেখা দিলে কী করতে হবে তাও বারবারই প্রচার করা হচ্ছে। ভারতের সঙ্গে আমাদের বিস্তৃত সীমান্ত থাকায় করোনার নতুন ধরনের বিস্তার ও সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে করণীয় বিষয়গুলো সম্পর্কে সব পক্ষেরই ঔদাসীন্য-অদূরদর্শিতার বিষয়টি স্পষ্ট। দূরের বাদ্য তো নয়ই, এমনকি একেবারে কাছের বাদ্যও সচেতনতা-সতর্কতার ঘাটতি দূর ও উপযুক্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারেনি।

সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চলমান বিধিনিষেধের শর্তসাপেক্ষ শিথিলতার ফল হয়েছে বুমেরাং। জীবন-জীবিকার ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্ন উপেক্ষা না করেও এই প্রাণঘাতী সংক্রমণের নিয়ন্ত্রণে বহুমাত্রিক ব্যবস্থা নেওয়া ও তা কার্যকর করা কতটা জরুরি ছিল, বিদ্যমান বাস্তবতা এরই সাক্ষ্যবহ। করোনার প্রথম ঢেউ স্ম্ফীত হয়েছিল ইতালি প্রত্যাগতদের যথাযথ নিয়মকানুনের মধ্যে রাখতে না পারার কারণে। আর দ্বিতীয় ঢেউ স্ম্ফীত হয়ে উঠছে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কঠোর নজরদারির ক্ষেত্রে ব্যর্থতার কারণে। সরকার স্থলসীমান্ত বন্ধের ঘোষণা দিলেও আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমই শুধু নয়, ভারতে গিয়ে নানা কাজে আটকে পড়াদের দেশে প্রবেশও অব্যাহত রয়েছে। 'বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো'র ফলে পরিস্থিতির অবনতির যে আশঙ্কা আমরা করেছিলাম, বস্তুত তা-ই হয়েছে।

আমরা মনে করি, সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতে সীমান্ত বন্ধের শতভাগ কার্যকারিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলায় বাধ্য করতে কঠোর পদক্ষেপ নিতেই হবে। একই সঙ্গে আক্রান্ত সব জেলায় ১৪ দিনের কার্যকর বিধিনিষেধ বাস্তবায়ন করা জরুরি। করোনার নতুন ধরনের নাজুক পরিস্থিতি বিবেচনায় শর্তসাপেক্ষ সার্বিক কার্যাবলির এখন আর অবকাশ নেই। পরিস্থিতি যেভাবে খারাপ হচ্ছে; যেভাবে নতুন ধরনে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে ও ছড়িয়ে পড়ছে তাতে আক্রান্ত সব এলাকায় সর্বাত্মক 'লকডাউন'-এর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার আর জো নেই। ভ্যাকসিন কার্যক্রমও জোরদার করতে হবে। সম্ভাব্য সব উৎস থেকে প্রয়োজনের নিরিখে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করে এর আওতায় বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে আনতেই হবে। আতঙ্ক নয়, সচেতনতা-সতর্কতা ও বহুমাত্রিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

আরও পড়ুন

×