ঢাকা রবিবার, ১৯ মে ২০২৪

রাজনীতি

এরশাদের দীর্ঘ ছায়া

এরশাদের দীর্ঘ ছায়া

মোজাম্মেল হোসেন

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২১ | ১২:০০

প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অশরীরী ছায়া দেশের রাজনৈতিক পর্দার প্রান্তদেশে আবার দুলে উঠেছে। পর্দা কতখানি কাঁপবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। ইতিহাসে পুনরাবৃত্ত বিষয় প্রহসন হিসেবেই সাধারণত এসে থাকে। এ নিয়ে কার্ল মার্ক্সের একটা বহু ব্যবহূত উক্তি রয়েছে।
এরশাদের রেখে যাওয়া রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টি উত্তরাধিকারীদের ভূসম্পত্তির মতোই ভাই-বেরাদর, স্ত্রী-পুত্রের বিবাদ-বিসম্বাদ ও মিল-মিশের মধ্য দিয়ে টিকে আছে তো বটেই, রাজনীতির শেয়ার মার্কেটে দলটির দামও চড়া থাকে। কারণ সংসদীয় রাজনীতিতে ক্ষমতার নিরিখে দলটিকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলেরই দরকার হয়। জবরদখল করা ক্ষমতা থেকে গণআন্দোলনে ৩০ বছর আগে পতিত হওয়ার পর দুর্নীতি মামলার আসামি এরশাদকে নিয়ে এই টানাটানি চলে। এক পর্যায়ে বিএনপিকে পিছু হটতে হয়। আওয়ামী লীগই তাকে বগলদাবা করে রাখে বহু বছর।
এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা সাম্প্রতিককালে বাবার নামের পদবি অনুসারে ব্যবহূত স্বীয় নাম বিদিশা সিদ্দিককে মৃদু আড়াল করে আপাতত বিদিশা এরশাদ নামটি সামনে নিয়ে এসেছেন। ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই ৮৯ বছর বয়সে এরশাদের মৃত্যুর ১৪ বছর আগে তালাক হলেও তাদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ছেলে এরিকের (২০) মা হিসেবে তার লালন-পালন, এরশাদের বিপুল সহায়সম্পত্তি, টাকা-পয়সা; সর্বোপরি জাতীয় পার্টির বর্তমান ও আশু ভবিষ্যতের দেখাশোনার জন্যই এই নামের পরিচিতি তিনি নতুন করে সামনে এনেছেন। এ জন্যই পর্দায় ছায়ার দুলুনি। জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরীণ দ্বৈরথ হয়তো নতুন রূপ নিতে যাচ্ছে। তবে সে প্রসঙ্গ ছেড়ে আমাদের আজকের আলোচ্য এরশাদের দীর্ঘ ছায়া।
ইতিহাসে এমন ব্যক্তিরা আছেন, যাদের কাজ ও কথা পরবর্তীকালেও মানুষ ও ঘটনাবলিকে প্রভাবিত করে। এটা ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটোই হতে পারে। ভালো কাজের প্রভাব ভালো, খারাপ কাজের প্রভাব খারাপ। এই প্রভাবকেই আমরা ব্যক্তির 'ছায়া' রেখে যাওয়া বলি। তবে ভাষার দিক থেকে 'ছায়া ফেলা' ও 'দীর্ঘ ছায়া' বাংলা বাগ্‌ধারা নয়। বাংলায় 'ছায়া মাড়ানো', 'ছায়ার সাথে যুদ্ধ' প্রভৃতি বাগ্‌ধারা আছে। ইতিবাচক উপমায় আমরা আঁচলের ছায়া, স্নেহের ছায়া, মেঘের ছায়া, গাছের ছায়া, বটের ছায়া ইত্যাদি বলি। আবার বিপরীতে মৃত্যুর ছায়া, কালের করাল ছায়া প্রভৃতি ব্যবহার করি। তবে 'দীর্ঘ ছায়া' আমরা ইংরেজি 'কাস্ট এ লং শ্যাডো' ইডিয়ম থেকে ধার করেছি। ইংরেজিতে এই বাগ্‌ধারাটি নেতিবাচক অর্থে ব্যবহূত; কখনোই ইতিবাচক নয়।
কবি, লেখক ও ভাষাবিজ্ঞানী হুমায়ুন আজাদের ১৯৮০'র দশকব্যাপী সমকালীন প্রসঙ্গ নিয়ে লিখিত একটি নিবন্ধাবলির সংকলন গ্র্রন্থের নাম 'প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে'। বইটির ভূমিকায় তিনি বলেন :'কোনো দেশের স্বাধীনতার ব্যর্থতার চূড়ান্ত রূপ সামরিক শাসন। বাংলাদেশ ওই পতনের শেষ সীমায়ও পৌঁছেছে।'
আমাদের সমকালীন ইতিহাসে লে. জেনারেল (অব.) এরশাদ এমন একজন সেনাপতি, যিনি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে সামরিক আইন জারি ও সংবিধান স্থগিত করে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হয়ে, আবার নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে এবং পরে প্রহসনের নির্বাচনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে পৌনে ৯ বছর স্বৈরাচারী শাসক হিসেবে দোর্দণ্ড প্রতাপে দেশ শাসন করেছেন। স্বৈরাচারী, ঘৃণ্য দুর্নীতিবাজ, ব্যক্তিগত চারিত্রিক স্খলনের নানা বদনাম নিয়ে তীব্র রক্তক্ষয়ী গণআন্দেলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে আবার নিজেকে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করেছেন; জেলে থেকে দু-দুটি জাতীয় নির্বাচনে একাই জাতীয় সংসদের পাঁচটি করে আসনে জয়ী হওয়াসহ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা জীবনের প্রতিটি নির্বাচনে জয়ী হয়ে আমৃত্যু সংসদ সদস্য থেকেছেন। সংসদে বিরোধী দলের নেতা হয়েছেন। নিজের ভাই জি এম কাদেরকে সংসদে এনেছেন। স্ত্রী রওশন এরশাদকেও নির্বাচিত মন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতা বানিয়েছেন। রংপুরে এরশাদের মরণোত্তর শূন্য আসনে জ্যেষ্ঠ পুত্র অর্থাৎ রওশনপুত্র সাদ এরশাদ সংসদ সদস্য হয়েছেন। ছায়া দীর্ঘই বটে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় এরশাদ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সপ্তম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার ছিলেন। রেজিমেন্টের গ্যারিসন হেডকোয়ার্টার চট্টগ্রামে, যেখানে বাঙালি সৈন্যদের বিদ্রোহ ও প্রতিরোধ মুক্তিযুদ্ধের বড় অধ্যায়। কিন্তু এরশাদ মুক্তিযোদ্ধা নন; তিনি তখন ফরমেশনে ছিলেন পাকিস্তানে। ১৯৭৩ সালে পাকিস্তান প্রত্যাগত এরশাদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের দুই সরকারের আমলে তর তর করে পদোন্নতি পেয়ে উঠে গেলেন সেনাপ্রধান তথা চিফ অব স্টাফ পদে।
মার্শাল ল জারি করে এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন ১৯৮২ সালে। ক্ষমতা থেকে পতন হয় ১৯৯০ সালে। ১৯৯১-এর সংসদ নির্বাচন থেকে আজ পর্যন্ত দেশে নিরবচ্ছিন্নভাবে সংসদীয় গণতন্ত্রকে শাসনব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলার যখন সুযোগ হয়েছিল, সে সময়টা সুস্থির কাটেনি। দুঃখজনকভাবে এই ৩০ বছরের প্রধান রাজনৈতিক দুর্ঘটনা হলো মুক্তিযুদ্ধের দল আওয়ামী লীগ ও সেনা ছাউনিতে পয়দা করা দল বিএনপির প্রতি সমর্থনের দিক থেকে দেশবাসীর প্রায় সমান সমান দুই ভাগে ভাগ হয়ে পড়া। জাতীয় নির্বচনে দুই দলের ভোটের ব্যবধান কম থাকায় দুই দলই তৃতীয় অবস্থানে থাকা জাতীয় পার্টির সমর্থনের জন্য এরশাদকে নিয়ে টানাটানি করেছে ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৬ সালে (পরে নির্বাচন হয় ২০০৮ সালে); প্রতিবারই নির্বাচনের আগে-পরে। এর পূর্ণ সুযোগ নিয়েছেন এরশাদ। 'জনতা টাওয়ার' নামে পরিচিত একটি মাত্র দুর্নীতি মামলায় তার পাঁচ বছর জেল হয়েছিল, আর বাকি দুর্নীতি মামলাগুলো, এমনকি মঞ্জুর হত্যা মামলার পরিণতি নিয়ে ব্যাপক সন্দেহ হলো, নেপথ্যে চলেছে সুতা টানাটানি। এরশাদের জেলে যাওয়া, জেল থেকে জামিনে বেরোনো, জোটে ভিড়াতে চাপ ও প্রলোভন প্রভৃতি কত যে নাটক! কখনও এরশাদ এক দলকে কথা দিয়ে আত্মগোপনে চলে যান; বেরিয়ে এসে অন্য জোটে যোগ দেন। কখনও বলেন, অমুক দল তাকে প্রেসিডেন্ট বানাবে বলেছে, কথা রাখেনি। কখনও বলেন, অমুক দল তাকে প্রধানমন্ত্রিত্ব সেধেছে, তিনি রাজি হননি; ওরা তাকে জেলে ঢুকিয়েছিল বলে ইত্যাদি। এই উপাখ্যানের বিবরণ ছোট নিবন্ধে সম্ভব নয়। এ সবকিছুর মধ্য দিয়ে দেশের মূলধারার রাজনীতিতেই ঢুকেছে অসততা, সুবিধাবাদ, কেনাবেচা, অর্থলোভ ও সার্বিক দুর্বৃত্তায়ন।
পূর্বসূরি আরেক সেনাশাসক ও রাষ্ট্রপতি লে. জেনারেল জিয়াউর রহমান ও এরশাদের রাজনৈতিক দল গঠন হুবহু একই কায়দায়। আগে ক্ষমতা দখল, তারপর ক্যান্টনমেন্টে বসে বিভন্ন দলের সুবিধাবাদীদের অর্থ ও প্রলোভন দিয়ে টেনে এনে রাজনৈতিক দল গঠন। অতঃপর সেই দলের মনোনীত হয়ে ক্ষমতাবলে প্রহসনের নির্বাচনে জয়ী হয়ে 'বেসামরিক সরকার' গঠন। জিয়ার বেলায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তথা বিএনপি; এরশাদের বেলায় জাতীয় পার্টি। এই কৌশলের যে ফলাফল তা দেশের রাজনীতির সর্বাঙ্গ নীতিহীন সুবিধাবাদের বিষে জর্জরিত করে ফেলেছে। এ থেকে আওয়ামী লীগেরও মুক্ত থাকা কঠিন দেখছি।
এরশাদের আরেক বড় অপকীর্তি ধর্মের নামে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক জনকল্যাণমুখী আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্টম্ন ধূলিসাৎ করে জিয়া সামরিক আইনবলে প্রথমে সংবিধান থেকে অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি 'ধর্মনিরপেক্ষতা' ছেঁটে দিলেন। একই ধারায় এরশাদ সামরিক ফরমানে সংবিধানে ঢুকিয়ে দিলেন 'রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম'। অথচ ইসলামে রাষ্ট্রধর্ম বলে শব্দ ও ধারণার অস্তিত্ব নেই। কিন্তু ধর্মীয় কোনোকিছু নিয়ে সুস্থির চিন্তায় যুক্তির অবতারণা করা এখন খুব কঠিন। সংবিধানের পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী উচ্চ আদালতের রায়ে বাতিল হয়ে যাওয়ায় তার মধ্যে এরশাদের ওই মতলবি সংশোধনী বাতিল হওয়ার কথা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই সংসদের সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রধর্ম রেখে দেওয়া হলো।
সংসদের সাম্প্রতিক বাজেট অধিবেশনে বিএনপির সাংসদ হারুনর রশিদ অজ্ঞাত কারণে 'কোরআনে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা নেই' বলে উক্তি করলে প্রধানমন্ত্রী সমাপনী ভাষণে বলেছিলেন, অবশ্যই কোরআনে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা আছে। সমর্থনে তিনি সুরা কাফিরুনের 'লাকুম দিনুকুম ওয়ালিয়াদিন' আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন, যার যার ধর্ম সে সে পালন করবে বলার মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতাই আসে।
সংসদ কোরআনের তফসিরের জায়গা নয়। যদিও কার্যবিধি মেনে প্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক সব বিষয়ে কথা বলা যাবে। তবে বোঝা যাচ্ছে, ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করার মতলবিরা বারবার খুঁচিয়ে সুযোগ তৈরি করতে চাইবে। আমাদের সংবিধানে এখন ধর্মনিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রধর্ম দুটোই আছে। এই নীতিগত গোঁজামিল আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে আমাদের বাধা দেবে। সেই রাষ্ট্র চাইলে শিক্ষা-সংস্কৃতি ও রাজনীতিগতভাবে জনগণের মানসলোকে পরিবর্তন ঘটাতে হবে। জিয়া-এরশাদের দীর্ঘ অপচ্ছায়া দূর করতে সচেষ্ট হতে হবে।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×