ঢাকা রবিবার, ১৯ মে ২০২৪

চারদিক

শ্যাম বাউলের আখড়া

শ্যাম বাউলের আখড়া

আবু সালেহ আহমদ

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২১ | ১২:০০

ঐতিহাসিক শ্যাম বাউলের আখড়াটি হবিগঞ্জ জেলার ঐতিহ্যবাহী বানিয়াচং উপজেলার যাত্রাপাশা গ্রামের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে অবস্থিত। আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগে শ্যাম বাউল রামকৃষ্ণ গোস্বামীর সঙ্গে ঘুরে শিষ্যত্ব ও আধ্যাত্মিকতা লাভ করে নিজ বাড়ি যাত্রাপাশায় এসে যে আখড়াটি স্থাপন করেছিলেন, তা-ই বর্তমানে শ্যাম বাউলের আখড়া নামে পরিচিত। আখড়াবাড়ির সামনেই রয়েছে সমাধি মন্দির। মণ্ডপ ঘরের পেছনে রয়েছে মূল আখড়ার দুটি ঘর। এই আখড়ার বর্তমান কর্ণধার বাসুদেব বৈষ্ণবের মতে, সম্ভবত একটি আখড়া নির্মাণ করা হয় গুরু রামকৃষ্ণ স্মরণে, অন্যটি শ্যাম বাউলের সমাধি মন্দির। এই আখড়াটি খুবই দৃষ্টিনন্দন এবং প্রতিদিন সেখানে অনেক ভক্তের সমাগম ঘটে।

শ্যাম বাউলের আখড়া ঘিরে রয়েছে নানা চমকপ্রদ কাহিনি। জানা যায়, নিজ বাড়িতে আসার পর শ্যাম বাউল তার কিছু লাঠি (গল্লা) দিয়ে বিভিন্ন দৈবশক্তির মাধ্যমে মানুষের উপকার সাধনে সচেষ্ট হন। বিষয়টি এক সময় যখন বানিয়াচং রাজার কানে আসে, তখন তিনি কিছু মাংস ও মিষ্টি প্যাকেটে পাঠিয়ে বললেন, 'এতে মিষ্টি জাতীয় দ্রব্য আপনার খাওয়ার জন্য রয়েছে।' শ্যাম বাউল রাজার চালাকি বুঝতে পেরে বাহককে বললেন, আপনি এখানে বসুন, মিষ্টি খেয়ে যান। মিষ্টির প্যাকেট খুলে নিজে হাতে সবাইকে মিষ্টি পরিবেশন করলেন এবং তা দেখে আশ্চর্য হয়ে বাহক দ্রুত রাজার কাছে গিয়ে সবিস্তারে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন।

অন্য আরেক দিনের ঘটনা। এক কৃষক বাড়িতে এসে কান্নাকাটি জুড়ে দিয়ে বললেন, আমার ঘরের বড় গরুটি অসুস্থ হয়ে বাড়িতে পড়ে রয়েছে। শ্যাম বাউল গিয়ে লাঠি দিয়ে আঘাত করতেই গরুটি দৌড়ে চলে যায়। বাসুদেব গোস্বামী জানান, তিনি তার বাবার কাছে এই কাহিনি শুনেছেন। কয়েক বছর আগেও আখড়ায় একটি বিষাক্ত সাপ আশ্রয় নেয়। সাপটি কখনও কখনও সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াত, আবার কখনও কখনও মন্দিরের কাছে গাছের ডালে উঠে বসে থাকত। দুধ-কলা দিলে তা খেয়ে যেত, কিন্তু কারও কোনো ক্ষতি করত না। সাপটি দেখার জন্য প্রতিদিন শতশত মানুষের ভিড় সামলাতে হতো আখড়ার সেবকদের। কয়েক মাস পর সাপটিকে আর দেখা যায়নি। এই কাহিনি এলাকার লোকমুখে এখনও শোনা যায়।

শ্যাম বাউল বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারী ছিলেন। বৈষ্ণবরা ভেদাভেদে বিশ্বাস করেন না। প্রতি বছর এই আখড়ার সামনে গঙ্গা স্নান, বারুণী মেলাসহ নানা অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। ওইসব মেলা-অনুষ্ঠানে প্রচুর লোকের সমাগম হয়। ঐতিহ্যবাহী শত বছরের পুরোনো এই আখড়াটি সংস্কারের অভাবে এখন জীর্ণদশা। বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারীদের এই আখড়াটির দুরবস্থার জন্য এলাকাবাসীর আক্ষেপ শোনা যায়। তাদের দাবি, আশু এর সংস্কার করা হোক। আখড়ার সন্নিকটে দুটি ঘরও হয়ে গেছে নড়বড়ে। হৃদয়ানন্দ মহন্তের সমাধিটিও ভেঙে যাওয়ার পথে। এলাকার বিজ্ঞজনের অভিমত, আখড়াটি সংস্কার করলে পর্যটনশিল্পের যেমন বিকাশ ঘটবে, তেমনি অতীত ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্টৃ্কতি রক্ষা করা সম্ভব হবে। এই আখড়ায় প্রতিদিন অনেক ভক্ত নিয়মিত আসেন। নিরাপত্তার জন্য আখড়ার চারদিকে দেয়াল যেমন প্রয়োজন, তেমনি ভক্তদের আসা-যাওয়া জন্য রাস্তাটির সংস্কার করা প্রয়োজন। এত পুরোনো একটি ঐতিহ্যবাহী স্থানের দিকে স্থানীয় প্রশাসন ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সুনজর আশা করেন এলাকাবাসী। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার দাবি, শ্যাম বাউলের আখড়ার সংস্কার করা হোক ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষার প্রয়োজনে।

লেখক ও লোক গবেষক

আরও পড়ুন

×