ঢাকা শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

অন্যদৃষ্টি

প্রত্নতত্ত্ব চর্চার গুরুত্ব

প্রত্নতত্ত্ব চর্চার গুরুত্ব

মেজবাহ উদ্দিন তুহিন

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২২ | ১৫:৩৫

প্রত্নতত্ত্ব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে। আমরা ফিরে যাই সুদূর অতীতকালের সংস্কৃতির সারবত্তায়। লিখিত তথ্যের মাধ্যমে খুব বেশি হলে ৫ থেকে ৭ হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। বর্তমান আবিস্কৃত উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে ২০-৩০ লাখ বছর আগের মানুষের ইতিহাস জানা সম্ভব হচ্ছে। ফলে ইতিহাসে নতুন মাত্রা সংযোজিত হচ্ছে প্রত্নতত্ত্বের মাধ্যমে।

পদ্ধতিগত প্রত্নতাত্ত্বিক চর্চা শুরু হয়েছে দেড় শতাধিক বছর ধরে। কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক উইলিয়াম জোন্সের প্রচেষ্টায় ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ জানুয়ারি কলকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গলের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা শুরু হয়। এ অঞ্চলের পুরাকীর্তি অনুসন্ধান করেন ১৮০৯ সালে ফ্রান্সিস বুকানন হ্যামিলটন। তিনি সে সময়ে মহাস্থান, পাহাড়পুর প্রভৃতি অঞ্চলের পুরাকীর্তি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। ১৮৭৯-৮০ সালের দিকে ভারতবর্ষে প্রত্নতত্ত্বের জনক স্যার আলেকজান্ডার ক্যানিংহাম এ দেশের গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তির অনুসন্ধান ও প্রত্নকীর্তি উদ্ঘাটনের কাজ করেন। তিনি গৌড়ের বিভিন্ন স্থাপত্য কীর্তি দেবীকোট, ক্ষেতলাল, বাসুবিহার, মহাস্থান, পাহাড়পুর, ঢাকা, বিক্রমপুর, সোনারগাঁ প্রভৃতি আবিস্কার করেন। তিনি মহাস্থানকে প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন বলে উল্লেখ করেন। ১৯৩৪-৩৬ এই সময়ের মধ্যে এনজি মজুমদার মহাস্থান এলাকার গোকুল মেধে উৎখনন কার্য চালিয়ে একটি মন্দির আবিস্কার করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে কুমিল্লার ময়নামতি অঞ্চলে সেনানিবাস তৈরির সময় কিছু পুরাকীর্তি নষ্ট হয়। সে সময়ে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া টিএন রামচন্দ্রের তত্ত্বাবধানে জরিপ করে ১৮টি প্রত্নস্থান সংরক্ষণ করে।

পাকিস্তানি শাসন যুগে এ দেশে প্রত্নতত্ত্ব চর্চার দায়িত্ব নেয় পাকিস্তান প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ। তবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি তাদের তেমন মনোযোগ ছিল না। সে সময়ে লালমাই-ময়নামতি অঞ্চলের প্রত্নসম্পদগুলো উন্মোচিত হয়। মহাস্থানগড়ের কিছুটা খননকাজ চলে। আমাদের প্রত্নসম্পদ অনুসন্ধানের সুযোগ সৃষ্টি হয় স্ব্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এই প্রতিষ্ঠানটির কাঠামোগত ও নীতিনির্ধারণী কিছু সমস্যা থাকায় প্রত্নসম্পদ আহরণে খুব বেশি সাফল্য দেখাতে পারেনি। প্রতিষ্ঠান শুরুর প্রাক্কালে দিনাজপুর জেলার সীতাকোট বিহার, ময়নামতির আনন্দ বিহার, বগুড়ার বাসুবিহার এলাকায় কিছু কাজ করা হয়। তাই বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য প্রত্নসম্পদ বলতে লালমাই-ময়নামতি অঞ্চল, বগুড়ার মহাস্থান অঞ্চল এবং নওগাঁর পাহাড়পুরের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সুলতানি ও মোগল আমলের কিছু মসজিদ, মন্দির আবিস্কৃত ও সংরক্ষণ করা হয়। ১৯৮২ সালে ইউনেস্কো এবং ইউএনডিপি পাহাড়পুর ও বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ সংরক্ষণ প্রকল্প গ্রহণ করে বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ চর্চার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। ১৯৯১ সালে ফ্রান্স ও বাংলাদেশ যৌথভাবে প্রাচীনতম শহর পুণ্ড্রবর্ধন উৎখনন প্রকল্প হাতে নেয়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ২০১৫-১৬ সালে পঞ্চগড়ের ভিতরগড় এলাকায় খননকাজ চালিয়ে দুর্গ নগরী আবিস্কারসহ বিভিন্ন সময়ে নানা প্রত্নবস্তুর আবিস্কার করে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ১৯৯৪ সালের জানুয়ারিতে অনুসন্ধানকার্য পরিচালনা করে চাঁদপুরের আশ্বিনপুর, বারগাঁও ও লকি গ্রামে। সেখানে আবিস্কৃত হয় প্রাচীন পুকুর, প্রাচীন ইট, দেয়াল, মৃৎপাত্র, বেলেপাথরের স্তম্ভ ইত্যাদি। প্রত্নতত্ত্ব একটি প্রায়োগিক বিষয়। এর পূর্ণতা আসে ছাত্রছাত্রীদের গবেষণা ও অনুসন্ধান উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় ৪৬২টি পুরাকীর্তি রয়েছে। এসব পুরাকীর্তি থেকে উদ্ধারকৃত প্রত্নসম্ভার নিয়ে স্থানীয়ভাবে ২৪টি জাদুঘরও চালু করা হয়েছে। তবে এই অধিদপ্তর কোথায় কী করছে; পুরাকীর্তি সংগ্রহের ব্যাপারে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারছে- এ সম্পর্কিত সুস্পষ্ট রিপোর্ট ও উদ্ধারকৃত নিদর্শনগুলো জনসমক্ষে আনার ব্যবস্থা করা হলে জনগণ এ বিষয়ে আরও জানতে পারত। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ২০০টি ছোট-বড় জমিদার বাড়ির অনেকটাই অরক্ষিত। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কিছু জমিদার বাড়ি তাদের আওতায় নিয়ে সংরক্ষণ করে স্থানীয়ভাবে মানুষের বিনোদনের খোরাক জোগানোর চেষ্টা করছে।

ড. মেজবাহ উদ্দিন তুহিন: পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত), তথ্য ও গণসংযোগ বিভাগ, বাউবি

আরও পড়ুন

×