ঢাকা শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

পাকিস্তান

ইমরান খান এখন কী করবেন

ইমরান খান এখন কী করবেন

আদ্রিয়ান এ. হুসাইন

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২২ | ১২:০০

১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ওপর জোর দিয়েছেন। এটি আমাদের আত্মমর্যাদা এবং বেঁচে থাকার জন্য জরুরি। তবে জীবন ধারণের বাইরেও স্বাধীনতার অন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় রয়েছে। সেদিকেও নজর দিতে হবে যদি আমাদের ঘিরে ধরা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সমাধান চাই। আমরা জানি, স্বাধীনতা এবং অরাজকতার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। নোয়াম চমস্কির তাত্ত্বিক নৈরাজ্যবাদ এক পাশে রেখে এটা আমাদের দিক থেকে বিবেচনায় রাখতে হবে।

আসলে প্রকৃত গণতন্ত্র নয়; ভান করা গণতন্ত্র চলছে এখানে। বিশেষ করে রাজনৈতিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে এটা অতীব সত্য। বলা ভালো, আজ আমরা সেখানেই দাঁড়িয়ে, যেখানে আমরা কাজ করছি। ঐতিহাসিকভাবে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিও এরই অনুমোদন দিচ্ছে। একুশ শতকের রাষ্ট্রচিন্তায় যেখানে ক্ষমতাই মুখ্য, সেখানে এটাই বাস্তবতা।

আমাদের এখানে দীর্ঘদিন ধরে একটা রাজনৈতিক সংস্কৃতি চালু আছে, যেখানে ক্ষমতাকে মনে করা হয় টোটেমের মতো। আর এটা বলা অত্যুক্তি হবে না যে, এ সংস্কৃতিই আমাদের আজকে আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে নিয়ে এসেছে। ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) এক রীতি চালু করেছে, যাকে বলা যায় নৃশংসতা এবং রাজপথের উন্মত্ততা। ক্ষমতার রাজনীতিতে এসব এখন সাধারণ ঘটনা। আমরা যে সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য গর্ব করি, তা আর সে জায়গায় নেই। সেখানে অধিক পরিপকস্ফ ও দায়িত্বশীল রাজনীতির চর্চা জরুরি।

সুশীল সমাজের অনেকেই দেশের আমূল পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু তাঁদের এই সম্ভাবনার মধ্যেই যে কতটা বিপদ লুকিয়ে আছে, সে বিষয়ে হয়তো তাঁরা সচেতন নন। অল্প কিছু মানুষ এটা অনুভব করছেন- জনপ্রিয় মন্ত্রের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলোর কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দুর্যোগ ছাড়া আর কিছু হবে না।

এটা বোঝা উচিত, আজ আমরা যা প্রত্যক্ষ করছি, সেটা কেবল রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়; একই সঙ্গে রাজনৈতিক ভাষারও ব্যর্থতা। ক্ষমতা এবং ধরনের দিক থেকে স্বৈরতন্ত্র ও গণতন্ত্রের মধ্যকার যে পার্থক্য; সেটিও আজ নৈতিকতার বিচারে খুব দূরত্বে নেই। বিষয়ের গভীরে গিয়ে যদি আমরা দেখি, কয়েক দশক ধরে বাস্তব চর্চায় গণতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের মধ্যকার পার্থক্য কতটা রয়েছে, তা বের করা মুশকিল।

দোষ আসলে আমাদেরই। বিষয়টি বছরের পর বছর ধরে জিইয়ে আছে। আমাদের অক্ষমতার কারণেই এর সমাধান হচ্ছে না। ক্ষমতাকে ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার আলোকে চিন্তার দৈন্য থেকেও এর উৎপত্তি। পিটিআই সমর্থকরা এটি অনুধাবন করতে ব্যর্থ- এ সময় কোনো স্বপ্নদ্রষ্টা কিংবা কোনো নায়ক কিংবা ত্রাণকর্তার প্রয়োজন নেই। বরং প্রয়োজন একজন মাঠের নেতৃত্ব এবং বাস্তববাদী রাজনীতি। এটা অবশ্যই দুঃখজনক- পিটিআই চেয়ারম্যান ইমরান খান বাস্তবতা এবং ইতিহাস অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি যা-ই বলুন না কেন; তাঁকে যেভাবে প্রধানমন্ত্রিত্ব থেকে অপসারণ করা হয়েছে, তা অসাংবিধানিক নয়। তবে তথাকথিত বৈদেশিক তহবিল মামলা এবং একই সঙ্গে ইমরান খানের সহযোগী অসহায় শাহবাজ গিল মামলা এবং সামাজিক মাধ্যম 'স্ক্যান্ডাল' তথা যেসব অভিযোগ পিটিআই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে এসেছে, সেগুলো তখনই ইমরান খানের নজরে আসা উচিত ছিল যখন এসব ঘটছিল। কিংবা কেউ এসবের মাধ্যমে ফায়দা নিতে পারে, এ বিষয়টি জেনে থাকলে সেভাবে সতর্ক হওয়া যেত। এ সময়ে ইমরান খানের সমর্থকদের উচিত নয় সরকারকে অতিমাত্রায় বিরক্ত করা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যখন অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে, তখন এসব অভিযোগ অমূলক হয়ে যাবে এবং আশা করা যায়, অগ্রাধিকারের বাইরে চলে যাবে।

এখন সরকার যে ব্যবস্থাই নিক, তা গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান মুসলিম লীগ (পিএমএল-এন) ও পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) যদি ভবিষ্যতে ভালো করে এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিবাচক পরিবর্তন আনে, তবে সেটা তাদের জন্য ভালো। দেশটির মানুষ কী করে, সেটাই দেখার বিষয়।

তবে আদালতে যাই হোক, পিটিআইকে সে রায়ই সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিতে হবে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনা সম্পর্কে ইমরান খান এমন তিক্তকর কিছু সত্য কথা বলেছেন, যেটা সরকার এড়িয়ে যেতে পারেনি। এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ- ইমরান খান এমনই কণ্ঠস্বর যেটি মানুষ শুনতে বাধ্য।

আদ্রিয়ান এ. হুসাইন: পাকিস্তানের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক 'ডায়ালগ'-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান; ডন থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত, ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক

আরও পড়ুন

×