ঢাকা শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

জন্মদিন

শতবর্ষেও সক্রিয়

শতবর্ষেও সক্রিয়

জাহান আরা রহমান, জন্ম :১৯২২

মিজান শাজাহান

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২২ | ১৫:৩৫

বেগম রোকেয়া ও শামসুন্নাহার মাহমুদের পর বাঙালি মুসলিম নারীদের যে প্রজন্ম নারীশিক্ষার বিস্তার ও সমাজসেবায় পুরো আত্মনিবেদন করেন, সে প্রজন্মেরই অদম্য সদস্য জাহান আরা রহমান। ১৯২২ সালের ২৭ আগস্ট কুমিল্লা শহরে নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতা মফিজউদ্দিন আহমদ তৎকালীন বাংলা প্রদেশের সিভিল সার্ভিসের সদস্য ছিলেন। ১৯৫০-এর দশকে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের রিলিফ কমিশনারের পদ থেকে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর মায়ের নাম ছালেহা খাতুন। তিনি কোনো স্কুলে পড়েননি; তবে বাড়িতে বসে বাংলা ও ইংরেজি ভালোভাবে শেখেন। সরকারি আমলার কন্যা হওয়ার ফলে জাহান আরাকে পরিবারের সঙ্গে নানা জায়গায় ঘুরতে হয়েছে। এক জায়গায় পড়ার সুযোগ তিনি পাননি। অনেক জেলা শহরে মেয়েদের হাই স্কুল ছিল না। তাই কখনও স্কুলের বদলে তাঁকে প্রাইভেট পড়তে হয়েছে।

১৯৩৯ সালে কলকাতায় মুসলমান ছাত্রীদের জন্য লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই কলেজে মুসলমান ছাত্রীদের জন্য হোস্টেল স্থাপন করা হয়। একই ক্যাম্পাসে হোস্টেল ও কলেজ অবস্থিত হওয়ায় মুসলমান ছাত্রীদের পক্ষে পর্দা মেনে পড়াশোনার সুযোগ সৃষ্টি হয়। তাই এই কলেজ পর্দা কলেজ নামে পরিচিত হয়। কলেজটি প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। কলেজের মানোন্নয়নের জন্য বিলেত থেকে অধ্যক্ষ ও কয়েকজন শিক্ষিকা নিয়ে আসা হয়। যেসব ভারতীয় নারীকে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ করা হয় তাঁরাও ছিলেন অত্যন্ত উঁচুমানের। এই কলেজে তিনি চার বছর পড়েছেন। আইএ পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। তবে তিনি দ্বিতীয় শ্রেণির বিএ ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৪৬ সালে কলকাতার ট্রপিক্যাল মেডিকেল স্কুলের ডাক্তার সন্দ্বীপের প্রতিবেশী ড. মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। দেশ বিভাগের পর রহমান পরিবার ঢাকায় চলে আসে। পঞ্চাশের দশকে বেগম জাহান আরা রহমান ঢাকার বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন। পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর মালিক ফিরোজ খান নূনের স্ত্রী ভিকারুননিসা নূনের নেতৃত্বে তিনি ঢাকায় ভিকারুননিসা নূন স্কুল প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে কন্যাসন্তানদের স্কুলে পাঠাতে রাজি করানোর জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের সম্মতি আদায় করেন।

১৯৬০-এর দশকে তিনি অল পাকিস্তান উইমেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (এপিডব্লিউএ) পূর্ব পাকিস্তান শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। তাঁর মেয়াদকালে পশ্চিম পাকিস্তানের মারি শহরে এপিডব্লিউএর সাধারণ সভা হয়। এই সভায় তিনি পূর্ব পাকিস্তান দলের নেতৃত্ব দেন। ষাটের দশকেই তিনি এপিডব্লিউএ ছাড়াও উইমেন্স ভলান্টারি অ্যাসোসিয়েশনের (ডব্লিউভিএ) সঙ্গে কাজ শুরু করেন। তিনি বাংলাদেশে ডব্লিউভিএর সভাপতি নির্বাচিত হন ও লালমাটিয়ায় মেয়েদের জন্য ডব্লিউভিএ কলেজ স্থাপনে নেতৃত্ব দেন। তাঁর ছোট বোন নার্গিস খান এই কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক ছিলেন এবং পরে দীর্ঘদিন এ কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে ডব্লিউভিএ ঢাকার উপকণ্ঠ বাসাবোতে মেয়েদের বৃত্তিমূলক শিক্ষার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়।

১৯৯৪ সালে জাহান আরা রহমান ঢাকায় লেডি ব্রেবোর্ন কলেজের প্রাক্তন ছাত্রীদের সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। এই পদে থাকাকালে তাঁর নেতৃত্বে 'ব্রেবোর্ন বিচিত্রা' নামে একটি বই প্রকাশিত হয়। মিসেস আকতার ইমামের সভাপতিত্বে বর্ষীয়ান নারীদের জন্য 'হৈমন্তিকা' নামে একটি সংগঠন গড়ে ওঠে ও জাহান আরা রহমান এই প্রতিষ্ঠানের জন্মলগ্ন থেকেই উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন।

১৯৪৭ সালে নূরজাহান বেগমের সম্পাদনায় 'বেগম' পত্রিকা প্রকাশিত হয়। প্রথম থেকেই 'বেগম' পত্রিকায় জাহান আরা রহমান কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন। 'বেগম' পত্রিকায় ৮০'র দশক পর্যন্ত তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে।

১৯৯১ সালে তাঁর স্বামী ড. মুজিবুর রহমান ইন্তেকাল করেন। দীর্ঘদিন তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত ছিলেন। স্বামীর সেবাযত্ন করার জন্য আশির দশকের শেষ দিক থেকে তাঁকে বাইরের সমাজসেবার কাজ কমিয়ে আনতে হয়েছিল। তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ে হামীম খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণি লাভ করেন এবং প্রায় তিন দশক ঢাকার সানবিমস স্কুলে অঙ্কের শিক্ষক হিসেবে কৃতিত্বের সঙ্গে কাজ করেছেন। ২০১৬ সালে তিনি এবং এর এক বছর আগে তাঁর একমাত্র সন্তান নেহরীন খান ইন্তেকাল করেন। তাঁর জামাতা আকবর আলি খান মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁর ছেলে ডা. এহসানুর রহমান একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে গত ৫০ বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করছেন।

জাহান আরা রহমান বর্তমানে শারীরিকভাবে অসুস্থ। তবে মানসিকভাবে এখনও সক্রিয়। জন্মশতবার্ষিকীতে তিনি সবার বিশেষ করে শুভানুধ্যায়ীদের দোয়া কামনা করছেন।

মিজান শাজাহান: সাংবাদিক
mizanshajahan@gmail.com

আরও পড়ুন

×