ঢাকা রবিবার, ১৯ মে ২০২৪

সমকালীন প্রসঙ্গ

সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের সামাজিক তাৎপর্য

সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের সামাজিক তাৎপর্য

শেখ আদনান ফাহাদ

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ১২:০০

দেশের ১৭ কোটি মানুষের সম্পদ যে সামান্য কিছু মানুষের কাছে কুক্ষিগত; তাদের সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নেওয়া সন্তানরা দেশের জন্য, দশের জন্য স্বাধীনতার ৫০ বছরে কী সম্মান বয়ে এনেছে? অন্যদিকে এ পর্যন্ত দেশের হয়ে লাল-সবুজের পতাকার মান যারা বিশ্বব্যাপী বাড়িয়েছে, তারা কারা? বেশিরভাগ নয় শুধু, প্রায় সবাই একেবারে হতদরিদ্র ঘরের সন্তান।
দক্ষিণ এশিয়ার ৭ দেশের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে সদ্য সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়া নারী ফুটবলারদের পারিবারিক ইতিহাস জানলেও আমাদের বিস্মিত না হয়ে উপায় থাকে না। যেমন সানজিদা আক্তারের কথা। নারী ফুটবলার সানজিদার একটি ফেসবুক পোস্ট ফাইনালের আগের দিন সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে। সানজিদা লিখেছিলেন- তাঁরা ফুটবলার হিসেবে নয়, দেশের জন্য যোদ্ধা হয়ে লড়বেন মাঠে। জীবনযুদ্ধে লড়ে অভ্যস্ত সানজিদা দেশবাসীর স্বপ্ন পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং প্রতিশ্রুতি অনুযায়ীই শিরোপা জয় করে বাংলাদেশের মানুষের মুখে গর্বের হাসি ফুটিয়েছেন।
বস্তুত বাংলাদেশ নারী জাতীয় দল ২৩টি গোল দিয়ে বিপরীতে একটি মাত্র হজম করেছে পুরো টুর্নামেন্টে। সাফের এই শিরোপা জয় শুধু ফুটবল বা একটি খেলার জয় নয়। এই জয় যে কত কিছুর বিরুদ্ধে জয়- এটা লিখে প্রকাশ করা যাবে না। একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা যেখানে বহু ধারায় বিভক্ত, সেখানে গ্রাম থেকে উঠে আসা এই মেয়েরা সমাজের অনেক কূপমণ্ডূূক গোষ্ঠীর গালে যেন চপেটাঘাত করেছে। নারীকে যখন অবরোধবাসিনী করে রাখার বহুমাত্রিক ষড়যন্ত্র চলমান, তখন এই মেয়েরা দক্ষিণ এশিয়ার চ্যাম্পিয়ন হয়ে নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দিয়েছে।
বলা বাহুল্য, এ দেশে নারী ফুটবলারদের পথ কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। এর সঙ্গে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাও গুরুত্বপূর্ণ। মনে আছে, ২০০৪ সালে বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে নারী ফুটবল লিগ শুরু করতে গিয়ে তৎকালীন বাফুফে ব্যর্থ হয়েছিল। কিছু জঙ্গিবাদী সংগঠন হুমকি দিয়ে সে সময় নারী ফুটবল শুরু করতে দেয়নি। দেশে যখন মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তবুদ্ধি, প্রগতিশীলতা বাধাগ্রস্ত হতে থাকে, তখন নারী ফুটবলের মতো সাহসী প্রকল্প বাস্তবায়ন অসম্ভব হওয়াই স্বাভাবিক।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে। বঙ্গবন্ধু নিজে ঢাকার লিগে ফুটবল খেলেছেন। তাঁর ছেলে শেখ কামাল আবাহনী ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা, যাঁর স্ত্রী সুলতানা আহমেদ খুকীও ছিলেন খ্যাতিমান ক্রীড়াবিদ। এমন ক্রীড়ামোদী পরিবারের সন্তান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও দেশের ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে আন্তরিক ও আবেগি। সানজিদাসহ দেশের অনেক নারী ফুটবলারকে নিজ উদ্যোগে জায়গা বরাদ্দ দিয়েছেন; এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থা করেছেন; নারী ফুটবলারদের নগদ অর্থ পুরস্কার দিয়েছেন। ক্রিকেট, ফুটবল থেকে শুরু করে সব খেলাতেই তাঁর সমান আগ্রহ।
মনে রাখতে হবে- বর্তমান প্রধানমন্ত্রীরই বিশেষ উদ্যোগে ২০১০ সাল থেকে দেশব্যাপী শুরু হয় বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টের। সানজিদা, মারিয়া মান্ডা, ঋতুপর্ণ চাকমাসহ দেশের নানা বয়সী দলের অধিকাংশ ফুটবলার উঠে এসেছে এই বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট থেকে। গত এক যুগে বাংলাদেশের নারী ফুটবলের পুরো চেহারাই পাল্টে গেছে। ছেলেদের ফুটবলেও বয়সভিত্তিক দলগুলোতে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট।
মনে রাখতে হবে, নারী সাফে এই চ্যাম্পিয়নশিপ বিজয় নিছক খেলোয়াড়ি বিজয় নয়। খেলাধুলার চাইতেও এ বিজয়ের সামাজিক-সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অনেক। ময়মনসিংহের কলসিন্দুর গ্রাম থেকে জাতীয় দলে খেলছে ৮ জন নারী খেলোয়াড়। তাদের প্রায় সবাই কলসিন্দুর স্কুলের ছাত্রী। তারা প্রমাণ করেছে- উদ্যোম ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র পরিবার থেকেও জাতীয় পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা যায়। বিদেশের মাটিতে দেশের পতাকা গর্বভরে ওড়ানো যায়।
এই নারী ফুটবল দল শুধু চ্যাম্পিয়নই হয়নি; বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী গোষ্ঠীর চোখ রাঙানিকেও উপেক্ষা করেছে। তাদের বিজয়ের পর প্রান্তিক জনপদের আরও অনেক কিশোরী একই স্বপ্ন ও সাহস বুকে ধারণ করতে পারবে। ক্রীড়ার বাইরে অন্যান্য ক্ষেত্রেও সামাজিক বৈষম্যের শৃঙ্খল ভাঙার স্পর্ধা দেখাবে।
দুর্ভাগ্যের বিষয়, নারী ফুটবল দল বা ক্রিকেট দলও পদ্ধতিগতভাবে বৈষ্যমের শিকার। এই যে দেশে প্রথমবারের মতো সাফ চ্যাম্পিয়ন হলো যে নারী ফুটবল দল; তাদের পারিশ্রমিক শুনলে লজ্জা পেতে হয়। ছেলেদের খেলায় সরকারের কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ হলেও প্রাপ্তি এখন পর্যন্ত বড় কিছু নেই। এই কথাটা ক্রিকেটের বেলায়ও সত্য। অথচ দেশের ইতিহাসের সেরা দুই প্রাপ্তি- এশিয়া কাপ এবং সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়েছি আমরা নারী ক্রিকেট ও নারী ফুটবল দলের হাত ধরেই।
যে দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, শিক্ষামন্ত্রী নারী; সে দেশে নারী ক্রিকেটার, ফুটবলারসহ অন্যান্য নারী খেলোয়াড়ের প্রতি চলমান বৈষম্যের অবসান কেন ঘটবে না? ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও বাংলাদেশের নারীরা সরাসরি অংশ নিয়েছেন। কেউ অস্ত্র হাতে, কেউ ডাক্তার বা নার্স হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। বন্ধুর এই পথে নারী জাতীয় দলের ফুটবল শিরোপাও সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে, বিশেষ করে নারী সমাজকে যুগ যুগ ধরে অনুপ্রাণিত করবে- এটা বলা যায় নিঃসন্দেহে।
শেখ আদনান ফাহাদ :সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×