ঢাকা বুধবার, ২২ মে ২০২৪

ইসলাম ও সমাজ

দুর্নীতি এবং পরকালে জবাবদিহি

দুর্নীতি এবং পরকালে জবাবদিহি

মো. শাহজাহান কবীর

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০২২ | ২০:৫৯

ইসলাম একটি সুন্দর ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ কায়েমের ওপর অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছে। দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। দুর্নীতি দমনে মহানবী (সা.) শান্তি ও সুনীতির যে বাণী উচ্চারণ করেছিলেন- ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে তা বাস্তবায়ন করতে পারলে বিদ্যমান দুর্নীতি প্রতিরোধ সম্ভব। মহান আল্লাহতায়ালা মানুষকে সৎ কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে গিয়ে সুরা আন-নাহলের ৯৭ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেন, 'মুমিন পুরুষ কিংবা নারী যে কেউ সৎকর্ম করবে, আমি তাকে নিশ্চয়ই আনন্দময় জীবন দেব এবং তাদের কর্মের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দেব।'

সুরা আল-বাকারার ১৮৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা আরও এরশাদ করেন, 'আর তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের সম্পদ অবৈধ পন্থায় ভক্ষণ করো না এবং শাসকদের সামনেও এগুলো এমন কোনো উদ্দেশ্যে পেশ করো না, যার ফলে ইচ্ছাকৃতভাবে তোমরা অন্যের সম্পদের কিছু অংশ খাওয়ার সুযোগ পেয়ে যাও।'

যেহেতু শুধু আইন ও বিধান দিয়ে দুর্নীতি, অপরাধ দমন করা যায় না; সেহেতু ইসলাম দুর্নীতি প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি আরও কিছু পন্থা বা কৌশল অবলম্বন করেছে। এ পন্থাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো আত্মার পরিশুদ্ধতা। মানুষের কর্মের উৎস তার অন্তঃকরণ বা কলব। স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন অন্তর কোনো অপরাধ কিংবা অনৈতিক কর্মে সমর্থন দেবে না। তাই ইসলাম প্রথমে অন্তঃকরণ বা কলবকে স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন করার বিষয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহতায়ালা সুরা আশ-শামসের ৯ ও ১০ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেন, 'সফলকাম হয়েছে সে ব্যক্তি, যে তার অন্তরকে শুদ্ধ করেছে এবং ব্যর্থ হয়েছে সে, যে তা অকার্যকর করেছে।' সুরা আল-আ'লার ১৪ নম্বর আয়াতে আরও এরশাদ করেন, 'ওই ব্যক্তি সফলকাম হয়েছে, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে।' আরেকটি পন্থা হলো, প্রত্যেক ব্যক্তির অন্তরে পরকালে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে জবাবদিহির দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করা।

আল্লাহতায়ালা সুরা জিলজালের ৭ ও ৮ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেন, 'যে অণু পরিমাণ সৎ কাজ করবে, তা দেখবে; অন্যদিকে যে অণু পরিমাণ অসৎ কর্ম করবে, তাও দেখবে।' ইসলাম অপরাধী, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে পার্থিব শাস্তি প্রদানে স্বচ্ছ আইন এবং তা দ্রুত কার্যকর করার বিধান প্রণয়ন করেছে। ইসলামে কোনো অপরাধী, দুর্নীতিবাজ, খুনি আদালত কর্তৃক প্রমাণিত হলে তাকে ক্ষমা করার বিধান রাখা হয়নি। কারণ, এতে অপরাধীদের ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের অপকর্ম করার সুযোগ করে দেওয়া হয়। এ জন্য মহানবী (সা.) বলেছেন, 'আমার মেয়ে ফাতেমা চুরি করলেও আমি তার হাত কেটে দেব।' (সহিহ বুখারি)।

অসৎ ও হারাম উপায়ে উপার্জনের প্রবণতা থেকেই মানুষ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়। দুর্নীতি দমনের মূলনীতি হিসেবে ইসলাম হালাল-হারাম তথা পবিত্র-অপবিত্রর পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে। সেই সঙ্গে হালালের কল্যাণ ও উপকারিতা এবং হারামের অপকারিতা ও ক্ষতি স্পষ্ট করে দিয়েছে। আল্লাহতায়ালা সুরা আল-বাকারার ১৬৮ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেন, 'হে মানবমণ্ডলী, পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র বস্তুসামগ্রী ভক্ষণ করো। আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। সে নিঃসন্দেহে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন।' রাসুলে পাক (সা.) বলেছেন, 'ওই দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যা হারাম খাদ্য দ্বারা গঠিত হয়েছে।'

দুর্নীতি নির্মূল করতে হলে সমাজ থেকে সুদ-ঘুষ-দুর্নীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। রাসুলে পাক (সা.) ঘুষদাতা ও গ্রহীতার প্রতি অভিশাপ দিয়েছেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও মহান আল্লাহতায়ালার সামনে প্রতিটি কাজের হিসাব দিতেই হবে- এ বিশ্বাস সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তি পোষণ করলে সে সমাজে দুর্নীতি ও অপরাধ অনেকাংশে কমে আসবে।

এ ছাড়া দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সৎ ও যোগ্য নাগরিক তৈরির জন্য প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সম্পূরক অধ্যায় বা কোর্স চালু করা যেতে পারে। সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পদমর্যাদা ও দ্রব্যমূল্য সামনে রেখে সম্মানজনক জীবন-জীবিকার উপযোগী বেতন-ভাতা নির্ধারণ করা যেতে পারে। এভাবেই সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত করা সম্ভব।

ড. মো. শাহজাহান কবীর : চেয়ারম্যান, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

আরও পড়ুন

×