ঢাকা শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

প্রতিবেশী

কংগ্রেসের লাগাম গান্ধী পরিবারের হাতেই

কংগ্রেসের লাগাম গান্ধী পরিবারের হাতেই

স্বাতী চতুর্বেদী

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০

যেমনটা ভাবা হয়েছিল, সেটাই বাস্তবে হয়েছে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস গান্ধী পরিবারের চক্রেই সীমাবদ্ধ রাখল। 'পারিবারিক মনোনীত' প্রার্থী ৮০ বছর বয়সী মাল্লিকার্জুন খাড়গেই ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন দলের সভাপতি হিসেবে বড় ব্যবধানে নির্বাচিত হয়েছেন। দলটির সবচেয়ে দীর্ঘ সময় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ৭৩ বছর বয়সী সোনিয়া গান্ধী তাঁর দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন মল্লিকার্জুন খাড়গের কাছে। নির্বাচনে খাড়গে পেয়েছেন ৭ হাজার ৮৯৭ ভোট। অন্যদিকে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী শশী থারুর পেয়েছেন ১ হাজার ৭২ ভোট। বলাবাহুল্য, স্বাধীনতার পর থেকে গান্ধী পরিবারের সদস্যরাই অধিকাংশ সময় কংগ্রেসের নেতৃত্ব দিয়ে এসেছেন। নেহরু-গান্ধী পরিবারের বাইরে এর আগে সভাপতি হন ১৯৯৭ সালে।
কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে চলছে ভারত জোড়ো যাত্রা। এ আন্দোলন থেকে তিনি বিরতি নিয়ে এক বক্তব্যে রাহুল গান্ধী বলেন, কংগ্রেসের নতুন সভাপতি হিসেবে মাল্লিকার্জুন খাড়গে সিদ্ধান্ত নেবেন- ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে আমার ভবিষ্যৎ ভূমিকা কী হবে। বলাবাহুল্য, রাহুল গান্ধী যে বিষয়টি বলেননি সেটা হলো, গান্ধী ব্যবস্থাপনা ফার্মের নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে মাল্লিকার্জুন খাড়গে হবেন পরিবারের একজন মুখপাত্র।
শশী থারুর কংগ্রেসের সভাপতি প্রার্থী হিসেবে একটি ভালো প্রচারণা চালিয়েছিলেন। এ প্রচারণায় মনে হয়েছিল, কেবল কংগ্রেস পার্টি নয়, ভারতের মধ্যেও এক ধরনের সাড়া পড়েছে। পার্টির সভাপতি নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশে ভোট গণনার সময় শশী থারুর শিবির একটি প্রাথমিক অভিযোগ করে। তবে যে ব্যবধানে মল্লিকার্জুন খাড়গে জয়লাভ করেছেন, তা দেখে শশী থারুর তাঁর অনিবার্য হার মেনে নেন।
শশী থারুর ভারতের কেরালা রাজ্যের রাজধানী তিরুবনন্তপুরম বা ত্রিবান্দ্রমের লোকসভার একজন সংসদ সদস্য। তিনি তিনবারের সংসদ সদস্য। শশী থারুর কংগ্রেস পার্টিতে পরিবর্তন আনার একটি এজেন্ডা গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর ইশতেহারে তৃণমূল স্তরের দলীয় কর্মীদের শীর্ষ নেতাদের কাছে পৌঁছে যাওয়ার সুযোগ থেকে শুরু করে দলীয় শাখাগুলোর হাতে ক্ষমতা দেওয়ার মতো একাধিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কংগ্রেসের বদ্ধ পরিবেশকে এক প্রকার খোলা হাওয়ায় এনেছেন শশী থারুর।
কিন্তু এটা স্পষ্ট- গান্ধী পরিবারের নেতৃত্ব দেওয়া ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ২০১৪ সাল থেকে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। দলটি একের পর এক নির্বাচনে হারছে। একাধিক বিষয়ে দলের অবস্থান নিয়ে বছরের পর বছর ধরে দলীয় কর্মীদের মনে ক্ষোভ রয়েছে। দলের একাংশ মনে করছে, বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে এবং কেন্দ্রে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে টিকে থাকতে দলের নেতৃত্ব থাকা উচিত অ-গান্ধী কোনো সদস্যের হাতে। এখন মাল্লিকার্জুন খাড়গে সভাপতি হলেও তিনি গান্ধী পরিবারের প্রভাবের বাইরে নন। তার মানে, কংগ্রেস মূলত খুব একটা পরিবর্তনে আগ্রহী নয় এবং গান্ধী পরিবার থেকে দলটি বের হতে চাইছে না। বর্তমানে গান্ধী পরিবারের তিন সদস্যই কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর মধ্যে শুধু সোনিয়া গান্ধী রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণের কথা বলেছেন।


মাল্লিকার্জুন খাড়গেই যখন কংগ্রেসের সভাপতি হলেন, তখন নির্বাচনেরই বা কী প্রয়োজন ছিল? কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে যাঁদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি, তাঁরা বলেছেন, এটি দলের সমালোচকদের জন্য একটা বার্তা। বিশেষ করে কংগ্রেসের বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী জি-২৩ গ্রুপের সদস্য, যাঁরা দলের মধ্যকার গণতন্ত্র এবং গান্ধী পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জবাবদিহির দাবি বারবার তুলছিলেন। শশী থারুর জি-২৩ গ্রুপের একজন সদস্য। তাঁরা ২০১৯ সালে দলনেত্রী সোনিয়া গান্ধীর কাছে চিঠি লিখে কংগ্রেসের ভেতরে পরিবর্তন আনার দাবি জানিয়েছিলেন।
কপিল শিবাল এবং গোলাম নবী আজাদ- এ দু'জন ছিলেন জি-২৩ গ্রুপের প্রধান নেতা। তাঁরা রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এনে কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করেন। একই সঙ্গে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্বশর্মা, বর্তমান বেসামরিক বিমানমন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া, আর পি এন সিং, জিতেন প্রসাদ, উত্তরপ্রদেশের মন্ত্রী যোগী আদিত্যও একই পথ ধরেন। অথচ এরা সবাই রাহুল গান্ধীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁরাই রাহুল গান্ধীকে আক্রমণ করেন এবং তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে কথা বলেন।
গান্ধী পরিবারের আরেক ঘনিষ্ঠ রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলটের পর খাড়গেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। বর্তমানে কংগ্রেসের হাতে যে দুই রাজ্য রয়েছে, তার একটি হলো রাজস্থান। রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বের পাশাপাশি তাঁকে কংগ্রেসেরও সভাপতি করার কথা ছিল। কিন্তু গেহলট বিদ্রোহ করে গান্ধী পরিবারকে খারাপ অবস্থায় ফেলেন। দলের সভাপতি নির্বাচনে না লড়ার কারণ ব্যাখ্যা করে রাজস্থানের তিনবারের এ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এই পরিবেশে নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি দলের সভাপতি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। রাজস্থানে অশোক গেহলটের প্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছেন শচিন পাইলট।
কথা হলো, এর পর কী? ভারতীয় ভোটাররা কংগ্রেসের দলীয় নেতৃত্ব বিশেষত গান্ধী পরিবারের নেতৃত্ব থেকে আসা সিদ্ধান্তের ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী নন বলেই মনে হয়। গান্ধী পরিবারের চারপাশে থাকা কিছু দরবারিও তাঁদের এমন সিদ্ধান্ত বজায় রাখার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
গুজরাট ও হিমাচল প্রদেশের আগত নির্বাচনও ভারতীয় জাতীয় পার্টি, কংগ্রেসের জন্য আরেকটি খারাপ খবর বয়ে আনবে। কারণ দুই মেরুর দুটি রাজ্যে আম আদমি পার্টির কংগ্রেসের ভোট নিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। দুটি জাতীয় নির্বাচনে হেরে যাওয়া রাহুল গান্ধী কোনো ধরনের জবাবদিহি ছাড়াই সোনিয়া গান্ধীর বদলে মাল্লিকার্জুন খাড়গেকে দিয়ে দল পরিচালনা করবেন, যাতে রাহুল গান্ধীর শেষ রক্ষা হয়।
নির্বাচনগুলোতে একের পর এক হারার পরও মনে হচ্ছে, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেনি। আপাতদৃষ্টিতে তাঁদের কর্মকাণ্ড প্রমাণ করছে- কংগ্রেসের স্বপ্ন হলো প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরোধী দল হিসেবেই দায়িত্ব অব্যাহত রাখা এবং বিজেপির আরও উত্থানে সহায়তা করা।
মাল্লিকার্জুন খাড়গে কি পরিবর্তনের সারথি হবেন? এ প্রশ্ন যখন কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতাদের করবেন, তাঁরা হাসবেন। কারণ একটাই- গান্ধী পরিবার থেকে তিনি পারবেন বলে মনে হয় না। ১৯ শতাংশ ভোট পাওয়া কংগ্রেসের কর্মকাণ্ড বলছে- এখনও ভারতীয় মানুষের ব্যাপারে তাঁদের যেন কোনো আগ্রহ নেই। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশের জন্য এটি এক দুঃখজনক বাস্তবতা, যেখানে সরকার থেকেই জবাবদিহি জরুরি।
স্বাতী চতুর্বেদী: ভারতীয় সাংবাদিক; গালফ নিউজ থেকে ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক

আরও পড়ুন

×