ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪

ব্রিটেন

ঋষি সুনাকের প্রধানমন্ত্রিত্বে খুশির কারণ নেই

ঋষি সুনাকের প্রধানমন্ত্রিত্বে খুশির কারণ নেই

হাসি মোহাম্মদ

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০

প্রথম এশীয় হিসেবে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় ঋষি সুনাককে অভিনন্দন। এ ঘটনা নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত, ঋষি সুনাক কনজারভেটিভ দলের নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় অভিবাসী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। প্রবাদে আছে- অভিবাসী হিসেবে নিজেকে প্রমাণের জন্য কিংবা লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য তোমাকে দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হবে। দ্বিতীয় সুযোগেই তিনি কনজারভেটিভ পার্টির নেতা হয়েছেন। এর আগে লিজ ট্রাস প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। বৈশ্বিক বাজার-বিশৃঙ্খলায় অর্থনীতি সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন। এর পর ঋষি সুনাকের সুযোগ আসে। তাঁর পথের বরিস জনসন-বাধা দূর হওয়ার পর ঋষি সুনাকের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। নেতৃত্বের এ প্রতিযোগিতা বলছে, ঋষি সুনাককে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য শুধু তাঁর পূর্বসূরিদের চেয়ে বেশি পরিশ্রমই করতে হয়নি; বরং গোটা জাতির কাছে এটি পরিস্কার- পূর্ববর্তী নেতৃত্ব নির্বাচনে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে বিচক্ষণ প্রার্থী। কনজারভেটিভ পার্টি বা টোরি দলের জন্য দুঃখজনক বিষয় হলো, তারা একজন বাদামি পুরুষের তুলনায় সাদা নারীকে বেছে নিয়েছিল। এ সময় অবশ্য তাঁকে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ ছিল না।
সেদিক থেকে ঋষি সুনাকের প্রধানমন্ত্রী হওয়া একটা অনস্বীকার্য বড় অর্জন। একজন এশীয় হিসেবে সব ধরনের প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে সুনাক ব্রিটেনের সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। তাঁর পথপরিক্রমা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, একজন কালো কিংবা বাদামিকে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য কীভাবে লড়াই করতে হয়। তবে এসব রাজনৈতিক কৌশলের বাইরে ব্রিটেনে জাতিগত সম্পর্ক আসলে কী বলছে?
আমাদের মতো মানুষের জন্য ঋষি সুনাকের প্রধানমন্ত্রিত্বে খুব খুশি হওয়ার কিছু নেই। অভিবাসী বাবা-মায়ের সন্তান হিসেবে একজন ব্রিটিশ নেতার যেমন হওয়া উচিত বলে প্রত্যাশিত; তিনি তেমনটি নন। বরং তাঁর কট্টরপন্থাই স্পষ্ট। তবে এটি সত্য, সুনাকের বাবা-মা ষাটের দশকে অভিবাসী হিসেবে যেভাবে ব্রিটেনে আসেন; তাঁদের সন্তান একজন এশীয় হিসেবে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হওয়া অকল্পনীয়। একটি সময় ছিল, যখন জাতীয়তাবাদী সমর্থকদের কারণে অভিবাসীদের একঘরে করে রাখা হতো। বিশেষ করে ইনক পাওয়েলের, রিভার্স অব ব্লাডের বক্তব্য ব্রিটেনে অভিবাসীদের অন্ধকার ভবিষ্যতেরই বার্তাবহ।
আমরা দেখেছি, ৯/১১-এর পর এশিয়ার সব ধর্মবিশ্বাসের মানুষ বর্ণবাদের লক্ষ্যবস্তু হয়। সে সময় বিদেশি আতঙ্ক স্মরণযোগ্য। এমনকি পাঁচ বছর আগেও যখন মনে করা হতো- ব্রিটেনে কোনো বর্ণবাদ নেই, তখন ব্রেক্সিটের ভোটের সময় আবার বর্ণবাদের জিগির তোলা হয়। সুনাক সে সময় বারবার বলেছিলেন, ব্রেক্সিট সমর্থন করায় তিনি গর্ব বোধ করছেন।
বর্তমানে সরকারি দপ্তর ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্রিটিশ-এশীয়দের প্রতিনিধিত্ব আগের চেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় হিসেবে স্পষ্ট হচ্ছে। একজন ব্রিটিশ-এশিয়ানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া তার বাইরে নয়। তবে একজন ধর্মপ্রাণ হিন্দু হিসেবে ঋষি সুনাকের ডাউনিং স্ট্রিটে প্রথম পদচারণা ঘটেছে দিওয়ালিতে। এটা কি কোনো ইতিবাচক বিষয়?
ঋষি সুনাকের প্রধানমন্ত্রী হওয়া ব্যক্তিগতভাবে তাঁর জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। একই সঙ্গে তাঁর মতো ব্রিটিশ-এশিয়ানরাও তাঁর নিয়োগে খুশি হতে পারেন বৈকি। যদিও আমরা দেখেছি, নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রিত্বে ভারতে এটি বলা গৌরবেরই বিষয় যে, হিন্দুরা মোদির মতো একজন প্রভাবশালীকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছে। কিন্তু আমরা কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে ব্রিটেনের প্রথম চ্যান্সেলর কোয়েসি কোর্তেংকে পেয়েছিলাম। তিনি অবশ্য বেশিদিন দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। যদিও তাঁকে অধিকাংশ ব্রিটিশ-এশিয়ানই ধর্মবিশ্বাস ও জাতিগত পরিচয়ের বাইরে সুনাকের সঙ্গে মেলাতে চাইবে না।
এখন আমরা আলোচনা করি ঋষি সুনাক সম্পর্কে। স্মরণ করা যেতে পারে, তিনি রুয়ান্ডা নীতির ব্যাপারে ব্রিটেনের পার্লামেন্ট সদস্য প্রীতি প্যাটেলের মতের সমর্থক। যে নীতি বাস্তবে থাকলে হয়তো তাঁর মা-বাবা কখনও ব্রিটেনেই আসতে পারতেন না। ঋষি সুনাকের মতো আরও অনেক কালো ও বাদামি যাঁরা কনজারভেটিভ পার্টিতে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন; অন্যদের থেকে তাঁরা যে ব্রিটেনকে বেশি ভালোবাসেন- সেটি প্রমাণে তাঁরা মরিয়া। ব্রিটেনকে রক্ষায় তাঁদের যেন আলাদা বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে এবং এটা তাঁদের অন্য স্তরে গিয়ে দেখাতে হয়। যাঁরা সহজাতভাবে এদের বিশ্বাস করেন না, তাঁদের শান্ত করার জন্য যেন তাঁদের অধিক কিছু করতে হয়। কেমি বাদেনক ও সুয়েলা ব্রাভারম্যান যেভাবে তাঁদের নির্দিষ্ট ক্যাম্পেইন পরিচালনা করেছেন, সেখানে আমরা এ বিষয়টি প্রত্যক্ষ করেছি। সেটি আমরা প্রত্যক্ষ করেছি ঋষি সুনাকের আমেরির গ্রিনকার্ড বিষয়ে রাজনৈতিক আলোচনায়। সেটি আমরা দেখি, যেভাবে সংখ্যালঘু প্রার্থীরা অন্যদের তুলনায় নিজেদের ব্যক্তিগত গল্প তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন সেখানে। বাদেনক যেভাবে তাঁর বাবা থেকে 'দায়িত্ব' সম্পর্কে এত কিছু জানতে পারছেন, সেখানেও আমরা তার প্রমাণ পাই। ব্র্যাভারম্যান বারবার আমাদের বলছেন, কীভাবে তাঁর বাবা-মা খালি হাতে এখানে আসেন। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, তাঁদের নীতি বাস্তবে আজ বিদেশি কাউকেই এভাবে স্বাগত জানাত না।
ব্যক্তিগতভাবে কোটিপতি ঋষি সুনাক উইনচেস্টার কলেজে পড়াশোনা করেছেন। এর পর তিনি বিয়ে করেন এক ধনকুবেরের মেয়েকে, যা তাঁর এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে অন্যদের যেভাবে বাড়ি ভাড়া কিংবা খাবার কেনাসহ অন্যান্য বিল পরিশোধে হিমশিম খেতে হয়েছে, সেটা তাঁর ক্ষেত্রে হয়নি। আমাদের প্রথম বাদামি রঙের প্রধানমন্ত্রির এটি বলা কি উচিত হবে না- 'আসলে আমার হৃদয়স্পর্শী কোনো পেছনের গল্প নেই। আমি এ দেশের অধিকাংশ মানুষ যেভাবে বড় হয় তার চেয়ে ভালোভাবে বেড়ে উঠেছি এবং এটি সত্যিই দুঃখজনক, অনেক মানুষই সে ধরনের সুযোগ পাচ্ছে না।'
ঋষি সুনাকের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মুহূর্ত নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক। তবে এটিও সত্য, অনেকের প্রত্যাশা থাকলেও তিনি প্রত্যাশিত মাত্রার প্রগতিশীল হবেন না। সে জন্য অবশ্য সমবেদনাও। তবে ঋষি সুনাকের মতো অধিকাংশ অভিবাসীর সন্তানকে এটি মনে রাখা দরকার- যেহেতু তাঁকে প্রমাণ করতে দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হয়েছে, সেহেতু নিচে নামার ক্ষেত্রেও তার অর্ধেক খারাপ হওয়াই তাঁর জন্য যথেষ্ট হবে।
হাসি মোহাম্মদ :ব্যারিস্টার, লেখক; গার্ডিয়ান থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক

আরও পড়ুন

×