ঢাকা শনিবার, ১৮ মে ২০২৪

সাক্ষাৎকার: এম সাখাওয়াত হোসেন

নির্বাচন কমিশন সাপের লেজে পা দিয়েছে

নির্বাচন কমিশন সাপের লেজে পা দিয়েছে

সাক্ষাৎকার গ্রহণ :মিজান শাজাহান

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের (এসআইপিজি) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো। ২০০৭-১২ সাল পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৫ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে ১৯৯৫ সালে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। ২০০৯ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল এবং ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনাল থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। গবেষণা ও লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত এম সাখাওয়াত হোসেনের জন্ম ১৯৪৮ সালে বরিশালে।
সমকাল :সম্প্রতি আপনি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে গাইবান্ধার উপনির্বাচন বন্ধে ইসির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং পরের ধাপগুলোয় স্লিপ না কেটে অনড় থাকতে পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁরা কি পারবেন?
এম সাখাওয়াত হোসেন: আশা করি পারবেন। তাঁদের পারতেই হবে। কারণ তাঁরা সাপের লেজে পা দিয়েছেন। এখন সাপ না মারলে ছোবল দেবেই। তাই নির্বাচন কমিশন যে যাত্রা শুরু করেছে, তাতে অনড় থাকতে হবে। একই সঙ্গে গাইবান্ধায় যাঁরা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত তাঁদের শাস্তি দিতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে কেউ অনিয়ম করলে অ্যাকশনে যাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। শাস্তি দিলে সংক্ষুব্ধরা আদালতে যেতে পারেন; আদালত থেকে যে সিদ্ধান্ত আসে তা-ই চূড়ান্ত। এখন নির্বাচন কমিশন অভিযুক্তদের শাস্তি না দিলে এ কথা বলার সুযোগ সৃষ্টি হবে- গাইবান্ধা নির্বাচন বন্ধ করে নির্বাচন কমিশন লোক দেখানো কাজ করেছে।
সমকাল: গাইবান্ধা থেকে বেশিরভাগ প্রিসাইডিং অফিসার জানিয়েছেন, নির্বাচনে অনিয়ম হয়নি। এখানে ইসি ও মাঠ প্রশাসন কি মুখোমুখি?
এম সাখাওয়াত হোসেন: নির্বাচন কমিশন কি প্রিসাইডিং অফিসারদের থেকে এ ধরনের লিখিত বক্তব্য চেয়েছে? কমিশন না চাইলে তাঁরা এ ধরনের উদ্যোগ নিতে পারেন না। ইসি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, কমিটি সরেজমিন কাজ করছে। প্রিসাইডিং অফিসাররা আগ বাড়িয়ে অনিয়ম হয়নি মর্মে লিখিত বক্তব্য দিতে গেলেন কেন? নির্বাচন কমিশনে দেওয়ার আগে ওই কপি তাঁরা অন্য জায়গায় দিয়েছিলেন।
সমকাল: এসব প্রিসাইডিং অফিসার কি প্রভাবিত হয়েছেন?
এম সাখাওয়াত হোসেন : বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক প্রভাব থাকলেও থাকতে পারে। যেখানে নির্বাচন কমিশন তাঁদের কাছে এ ধরনের লিখিত বক্তব্য চায়নি, সেখানে প্রভাবিত না হলে তাঁরা কেন বলতে যাবেন- তাঁদের কেন্দ্রে কোনো অনিয়ম হয়নি! নির্বাচন কমিশন তো সিসি ক্যামেরায় অনিয়মের প্রমাণ দেখেই নির্বাচন স্থগিত করেছে।
সমকাল: তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, বুথের সামনে সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করে ভোটারের গোপনীয়তা লঙ্ঘন করা হয়েছে।
এম সাখাওয়াত হোসেন : তথ্যমন্ত্রী নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন। ভারতেও সিসি ক্যামেরার ব্যবহার হচ্ছে। ভোটকক্ষে সিসি ক্যামেরা ব্যবহারে দোষের কিছু দেখছি না।
সমকাল:  ডিসি-এসপিদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বৈঠকে একজন কমিশনারের বাগ্‌বিতণ্ডা হয়েছে।
এম সাখাওয়াত হোসেন : আমাদের মাঠ প্রশাসনে যাঁরা কাজ করেন, তাঁরা ইনস্টিটিউশন তথা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল তা বোঝা গেল। রাজনৈতিক আশ্রয়ে ডিসি-এসপিরা কাউকে তোয়াক্কা করতে চাইছেন না। মাঠ প্রশাসনে ডিসি-এসপিরা উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা। একজন নির্বাচন কমিশনারের পদমর্যাদা তাঁদের অনেক ওপরে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্য কমিশনাররা সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সে কথা ভুলে গেলে চলবে না। কোনো কমিশনারের বক্তব্যের সঙ্গে ডিসি-এসপিদের দ্বিমত থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে তাঁরা প্রতিবাদ করতেই পারেন। আমলা হিসেবে তাঁদের ভালো করেই জানা থাকা উচিত সেই প্রতিবাদ কীভাবে, কোন পদ্ধতিতে করতে হয়। একজন নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য চলা অবস্থায় রাজনৈতিক দলের নেতাদের মতো হইচই করা ঠিক হয়েছে কিনা, এ প্রশ্ন তাঁদের কাছেই রাখছি।
সমকাল: কমিশনারের সঙ্গে ডিসি-এসপিদের আচরণ কি শাস্তিযোগ্য?
এম সাখাওয়াত হোসেন : তাঁরা ভাবেন কেউ তাঁদের কিছু করতে পারবে না। বেপরোয়া ভাব দেখাচ্ছেন। নিজেদের বড় কর্তৃপক্ষ মনে করছেন তাঁরা। যে কারণে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে যথাযথ সম্মান দেননি। এটা পুরোপুরি রাজনৈতিক আশ্রয়ের কারণে হচ্ছে।
সমকাল: গাইবান্ধার একটি নির্বাচনে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো, একই দিনে ৩০০ আসনে এমন অবস্থা হলে ইসি কীভাবে সামলাবে?
এম সাখাওয়াত হোসেন : গাইবান্ধায় যা হয়েছে, এর ভালো সমাধান হলে সবাই সতর্ক হবে। নির্বাচনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। এ জন্য সমন্বয়হীনতা দূর করতে হবে। দরকার হলে একাধিক রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ দিতে হবে।
সমকাল: বর্তমান বাস্তবতায় ইভিএমে ভোট গ্রহণ কতটা যৌক্তিক?
এম সাখাওয়াত হোসেন : ইভিএম মেশিন ভালো। কিন্তু এর কিছু সমস্যা আছে। ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি। এ অবস্থায় এটি ব্যবহার করা হলে নানা প্রশ্ন উঠবে। শতভাগ কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহারও করা হবে না। অর্ধেক ভোটারকে বাইরে রেখে এ ব্যবস্থায় না যাওয়াই ভালো। এ ছাড়া দেশের এই অর্থনৈতিক দুর্দিনে ইভিএমের জন্য এত টাকা খরচ করে বিতর্ক ডেকে আনার যৌক্তিকতা নেই।
সমকাল: জাতীয় নির্বাচন ঘিরে শঙ্কা দেখছেন কি?
এম সাখাওয়াত হোসেন : হ্যাঁ। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতায় অনেক প্রাণহানি হয়েছে। যদি নির্বাচন কমিশন নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে তাহলে সেই শঙ্কা জাতীয় নির্বাচনেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
সমকাল:বিএনপি বলছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবে না।
এম সাখাওয়াত হোসেন : সহিংসতার পথ পরিহার করে সব রাজনৈতিক দল আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি কৌশল নির্ধারণ করতে পারে।
সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
এম সাখাওয়াত হোসেন : সমকালের জন্য শুভকামনা।

আরও পড়ুন

×