ঢাকা বুধবার, ২২ মে ২০২৪

কালবিলম্ব নহে

কালবিলম্ব নহে

খালেদ মাহমুদ সুজন। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০

একাত্তরের যুদ্ধশিশুগণ অবশেষে জাতীয় পরিচয়পত্র তথা নাগরিকত্বের স্বীকৃতি পাইতে চলিয়াছেন- ইহা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক সংবাদ। সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে- সোমবার জামুকা তথা জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের ৮১তম সভায় এতদ্‌বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ সংশ্নিষ্টদের নিকট সুপারিশের সিদ্ধান্ত গৃহীত হইয়াছে। জানা গিয়াছে, পিতার নাম না থাকায় দেশের উত্তরাঞ্চলের এক যুদ্ধশিশুর জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার আবেদনে কর্তৃপক্ষ সাড়া প্রদান করছিলেন না। বিষয়টির সুরাহা চাহিয়া ঐ আবেদনকারী জামুকার দ্বারস্থ হন। ইহার পরিপ্রেক্ষিতে জামুকা আবেদনকারীসহ সকল যুদ্ধশিশুর জাতীয় পরিচয়পত্রসহ সর্বপ্রকার নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করিবার লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ লইবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বিলম্বে হইলেও এহেন সিদ্ধান্তের জন্য আমরা জামুকার প্রতি সাধুবাদ জানাই। বিলম্বের কথাটা এই জন্য বলা; যুদ্ধশিশু হইল তাঁহারা, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পাশবিক নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশের নারীদিগের গর্ভে মুক্তিযুদ্ধকালে বা অব্যবহিত পরে জন্ম হইয়াছে যাঁহাদের। দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য এহেন অপরিসীম ত্যাগ স্বীকারের পরিপ্রেক্ষিতে ঐ নির্যাতিত নারীদিগের সন্তানদের স্বাভাবিকভাবেই এই দেশের নাগরিক হিসাবে স্বীকৃতি পাইবার কথা। কিন্তু দুঃখজনক হইলেও সত্য, এই স্বাভাবিক স্বীকৃতির জন্য তাহাদিগকে অর্ধশতাব্দীরও অধিক কাল অপেক্ষা করিতে হইতেছে। আর জামুকার প্রতি সাধুবাদের কারণ হইল, সিদ্ধান্তটা কার্যকর হইলে শুধু যুদ্ধশিশুদেরই নাগরিকত্বের সংকট ঘুচিবে না; ঐ নির্যাতিত মাতাগণও এতদিন ধরিয়া চলমান সামাজিক-সাংস্কৃতিক অপপ্রচারের যন্ত্রণা হইতে কিঞ্চিৎ মুক্তি পাইবেন।
সচেতন মানুষমাত্রেরই জ্ঞাত থাকিবার কথা, পাকিস্তানি সেনাদের হাতে নির্যাতিত হওয়ার পর ঐ নারীগণের বিরুদ্ধে নানা সামাজিক কালিমা লেপন করা হইয়াছিল। ইহার ভয়ে সংশ্নিষ্ট পরিবারগুলি তাহাদের পরিত্যাগ করিয়াছিল। সেই বিপৎসংকুল পরিস্থিতিতে অনেক নির্যাতিত নারী গর্ভের ভ্রূণ হত্যাই শুধু নহে, আত্মহননের পথ পর্যন্ত বাছিয়া লইতে বাধ্য হইয়াছিলেন। এই কথা যথার্থ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐ নির্যাতিত নারীগণকে বীরাঙ্গনা বলিয়া সম্বোধন করিয়াছিলেন। পাশাপাশি দেশে-বিদেশে এই শিশুদের সাথে তাহাদের মায়েদেরও পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছিলেন। কিন্তু ইহাও অস্বীকার করা যাইবে না, পচাত্তরের মর্মন্তুদ পট পরিবর্তনের পর বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুগণের স্বীকৃতি ও পুনর্বাসনসংক্রান্ত সকল রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ শুধু থামিয়া যায় নাই, একেবারে হিমাগারে চলিয়া যায়। ১৯৯৬ ও ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার সরকার বীরাঙ্গনাদের কিছু আর্থিক সহায়তা করিলেও ২০১৫ সালের পূর্বে এই বিপন্ন নারী এবং তাহাদের সন্তানদের সমাজে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রের তরফ হইতে কার্যকর কিছুই করা হয় নাই। এমনকি ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় সংসদে বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার সময়ও যুদ্ধশিশুগণকে নাগরিক হিসাবে স্বীকৃতির বিষয়টা নিস্পত্তি হয় নাই। যেই কারণে এই দেশের নাগরিক হিসাবে স্বীকৃতি পাইবার জন্য যুদ্ধশিশুদের এই ২০২২ সালেও দ্বারে দ্বারে ঘুরিতে হইতেছে।
আমাদের প্রত্যাশা- সিদ্ধান্তটা দ্রুত কার্যকর করিবার জন্য জামুকা আন্তরিকভাবে চেষ্টা চালাইবে; কোনো ধরনের লালফিতার দৌরাত্ম্য যাহাতে বিষয়টাকে ফাইলচাপা দিয়া রাখিতে না পারে, সেই ব্যাপারে সজাগ থাকিবে। বীরাঙ্গনা বা যুদ্ধশিশুগণের স্বার্থসংশ্নিষ্ট বিষয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতা। ১৯৭৫ সালের পর একটার পর একটা সরকার ক্ষমতায় বসিয়াছে; কিন্তু ঐ বীরাঙ্গনাদের প্রতি জাতির দায় মোচনের লক্ষ্যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে নাই। সেই বাধা কাটিয়া যাইবার পর এখন আমলাদের দায়িত্ব সরকারের সিদ্ধান্তসমূহ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা। কিন্তু এই দেশে এমন নজির ভূরি ভূরি রহিয়াছে, যেখানে কোনো বিষয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হইবার পরও আমলাতন্ত্র তাহা বাস্তবায়নের পথে নানা রকম দৃশ্যমান ও অদৃশ্য বাধা তৈরি করিয়া থাকে; ফলত বিষয়টা যতই জনস্বার্থসংশ্নিষ্ট হউক, বৎসরের পর বৎসর ঝুলিয়া থাকে। আমরা আলোচ্য ক্ষেত্রে এমন কোনো বাধা দেখিতে চাই না। অবশ্য যাহারা দশকের পর দশক ধরিয়া বিষয়টা লইয়া সোচ্চার থাকিবার কারণে একদিকে বীরাঙ্গনারা মুক্তিযোদ্ধার সম্মান পাইয়াছেন এবং আরেকদিকে যুদ্ধশিশুরা নাগরিকত্বের স্বীকৃতি পাইতে চলিয়াছে, সেই নাগরিক সমাজকেও তাহাদের আন্দোলনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করিতে হইবে বৈকি।

আরও পড়ুন

×