ঢাকা সোমবার, ২০ মে ২০২৪

রাজনীতি

জনস্বার্থ মানে কার স্বার্থ?

জনস্বার্থ মানে কার স্বার্থ?

আমীন আল রশীদ

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২২ | ১২:০০

বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় বহুল ব্যবহূত এবং বলা সংগত, নিয়মিত অপপ্রয়োগের শিকার হওয়া একটি নিরীহ শব্দ 'জন'। যেমন 'জনগণ'। রাজনীতিবিদরা নিয়মিত জনগণের দোহাই দেন। তাঁরা বলেন, তাঁরা জনগণের জন্য রাজনীতি করেন। যদিও সেই জনগণই তাঁদের দ্বারা নিয়মিত নিগ্রহ ও বঞ্চনার শিকার।
সব নেতাই নিজেকে 'জনদরদি' বলে দাবি করেন। কিন্তু আমাদের 'জননেতা' বা 'জনদরদি' নেতারা কতটা জনসংশ্নিষ্ট, সেটি দেশের জনগণ নিয়মিত তাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে হাড়ে হাড়ে টের পায়।
'জনস্বার্থ' শব্দটিও রাজনীতি, বিশেষ করে প্রশাসনে বহুল চর্চিত ও ব্যবহূত। যেটি সম্প্রতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে প্রশাসনের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনায়।
১৬ অক্টোবর বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মকবুল হোসেনকে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, তাঁকে 'জনস্বার্থে' অবসর দেওয়া হয়েছে। যদিও তাঁর চাকরির মেয়াদ ছিল আরও প্রায় এক বছর। প্রশাসনের এ রকম সিনিয়র পদে লোকজন অবসরে যাওয়ার পরও যেখানে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান, সেখানে কী এমন হলো, মকবুল হোসেনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হলো! কী সেই 'জনস্বার্থ'?
তথ্য সচিব মকবুল হোসেনের পর তিনজন পুলিশ সুপারকে তাঁদের চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই 'বাধ্যতামূলক' অবসরে পাঠানো হয়। তাঁদেরও অবসরে পাঠানোর বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ যে আলাদা প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, তার সবটির ভাষা অভিন্ন। তাতে বলা হয়, 'সরকারি চাকরি আইন ২০১৮-এর ৪৫ ধারার বিধান অনুযায়ী জনস্বার্থে সরকারি চাকরি থেকে অবসর প্রদান করা হলো।'
প্রশ্ন হলো, আইন ও সরকারের প্রজ্ঞাপনে যে 'জনস্বার্থ' নিয়ে কথা বলা হচ্ছে, তার ব্যাখ্যা কী?
সরকারি চাকরি আইন ২০১৮-তে বিভিন্ন শব্দের যে ব্যাখ্যা বা সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, সেখানে 'জনস্বার্থ' বলতে কী বোঝানো হবে, তা উল্লেখ নেই। তার মানে, সরকার বা রাষ্ট্র যেটিকে জনস্বার্থ বলে মনে করবে, সেটিই জনস্বার্থ?
যেমন 'জননিরাপত্তা আইন'। এই আইনে এ যাবৎ যত মামলা হয়েছে, তার সবই বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। অর্থাৎ সব আমলেই সব সরকার তার বিরোধীদের দমন করতে এই আইন প্রয়োগ করে মূলত জননিরাপত্তার অজুহাতে।
একইভাবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এই আইনে এ যাবৎ যত মামলা হয়েছে তার অধিকাংশই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত স্ট্যাটাস ও কমেন্টের কারণে, যার সঙ্গে অধিকাংশ সময়েই জনগণের নিরাপত্তা বা নাগরিক সুরক্ষার কোনো সম্পর্ক থাকে না।
একজন সচিব এবং কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনা নিয়ে যখন তোলপাড়, তখন ইত্তেফাকের একটি খবরে (১৮ অক্টোবর ২০২২) বলা হয়, আরও পাঁচ সচিবকে অবসরে পাঠানো হচ্ছে। কেননা, তাঁদের বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। শুধু সচিব নন, কয়েকজন অতিরিক্ত সচিবও আছেন এই ষড়যন্ত্রে। সব মিলিয়ে সংখ্যাটা ১২। শুধু তাই নয়; তাঁদের কারও কারও বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হতে পারে, সে বিষয়ে শীর্ষ মহলে আলোচনা হচ্ছে বলে খবরে উল্লেখ করা হয়।
প্রশ্ন হলো, প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা যদি বিরোধী কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সখ্য তৈরি করেন বা জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে কোনো ধরনের তৎপরতায় যুক্ত হন, সেটি কি রাষ্ট্রদ্রোহের মধ্যে পড়ে?
দণ্ডবিধি বা পেনাল কোড ১৮৬০-এর ১২৪ (ক) অনুসারে, কোনো ব্যক্তি যদি তার কথা কিংবা লিখিত শব্দাবলি অথবা কোনো চিহ্ন দ্বারা কিংবা দৃশ্যমান কোনো প্রতীক দ্বারা অথবা প্রকারান্তরে আইনবলে গঠিত সরকারের প্রতি ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা করার উদ্যোগ গ্রহণ করে অথবা বৈরিতা সৃষ্টি করে বা করার উদ্যোগ গ্রহণ করে, সে ব্যক্তি সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে। তার মানে, এখানে সরকার ও রাষ্ট্র অভিন্ন। সরকারের সমালোচনা মানে রাষ্ট্রেরও বিরোধিতা। এটি কোনো গণতান্ত্রিক দেশে চলতে পারে না। কারণ, সরকারের সমালোচনা করা প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার।
১৮৬০ সালে, অর্থাৎ ব্রিটিশরা যে আইন তৈরি করে গেছে, সেই আইনে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র চলছে- এটি খুব সম্মানের বিষয় নয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৫০ বছর অতিবাহিত হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে এ দণ্ডবিধি পুরোপুরি সংস্কার বা বাতিল করে বাংলাদেশের উপযোগী একটি নতুন ও আধুনিক দণ্ডবিধি প্রণয়নের যে উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত ছিল, কোনো সরকারই সেটি করেনি। কারণ, তারা প্রত্যেকেই যখন ক্ষমতায় থাকে, নিজেদের লর্ড ভাবে এবং জনগণকে ভাবে প্রজা। সংগত কারণেই ব্রিটিশ কলোনিয়াল আইনকে তারা রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সহজ ও উপযুক্ত মনে করে।
বাংলাদেশের সংবিধানে বাকস্বাধীনতা এবং সংগঠন ও সমাবেশ করার অধিকারের সঙ্গে 'যুক্তিসংগত বাধা নিষেধসাপেক্ষ' কথাগুলো উল্লিখিত। কিন্তু এই 'যুক্তিসংগত' বলতে কী বোঝানো হবে বা এই যুক্তি কে নির্ধারণ করবেন, তা স্পষ্ট নয়। তার মানে, সরকার যেটিকে 'যুক্তিসংগত' মনে করবে, সেটিই ঠিক।
সুতরাং আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে শুধু একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতার পালাবদলই যথেষ্ট নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সংবিধান ও আইন যেসব শব্দ ব্যবহার করছে, সেগুলো কতখানি গণতান্ত্রিক ও জনবান্ধব, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। জনগণকে প্রজা হিসেবে শাসন করা নয়, বরং নাগরিক হিসেবে তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে সব আইন হালনাগাদ করা প্রয়োজন। সংবিধান ও আইনের ভাষার দ্বারা সরকারের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব সৃষ্টি নয়, বরং পরস্পর একটি মধুর সম্পর্ক তৈরি হবে এবং রাষ্ট্র বলতে শুধু সরকার নয়, বরং সরকার ও জনগণের যূথবদ্ধতা বোঝাবে। একুশ শতকের আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এটিই সবার কাম্য হওয়া উচিত।
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক

আরও পড়ুন

×