ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪

দিবস

অদৃশ্য প্রতিবন্ধী

অদৃশ্য প্রতিবন্ধী

মিজান শাজাহান

প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০২ ডিসেম্বর ২০২২ | ১৫:১০

প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নেওয়া শিশু যেমন তার শারীরিক অক্ষমতার জন্য দায়ী নয়; তেমনি বাবা-মাও দায়ী নন। মায়ের অপুষ্টিজনিত সমস্যায় শিশুর কাঠামোগত ত্রুটি থাকলে তা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু কুসংস্কারের কারণে একসময় বলা হতো, বাবা-মায়ের পাপের ফসল হিসেবে প্রতিবন্ধী শিশু জন্মায়। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারে সেই কুসংস্কার থেকে পুরোপুরি মুক্ত না হলেও উল্লেখ করার মতো সাফল্য এসেছে। জন্মগত প্রতিবন্ধীর পাশাপাশি বিভিন্ন দুর্ঘটনা ও জটিল রোগে আক্রান্ত হয়েও কেউ কেউ প্রতিবন্ধী হচ্ছে।

সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে হাত-পা হারিয়ে পঙ্গু হওয়ার উদাহরণ আমাদের দেশে অনেক। শিল্পকারখানায় কাজের সময় হাত হারানো কিংবা আন্দোলনে যোগ দিয়ে পুলিশের টিয়ার গ্যাসের শেলে চোখ হারিয়ে অন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও আমাদের কমবেশি জানা। পোলিও রোগে আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি স্ট্রোকের কারণে শারীরিক প্রতিবন্ধীর তালিকাভুক্ত লোকের সংখ্যাও কম নয়। দৃষ্টি ও বাক্‌প্রতিবন্ধীর পাশাপাশি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীর সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। পাবনা মানসিক হাসপাতালে গেলে এর সত্যতা মিলবে। এ ছাড়া রয়েছে অটিজমের মতো সমস্যা বিদ্যমান। প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করা সবার দায়িত্ব। কিন্তু বেশিরভাগ সময় দেখা যায়, নানাভাবে বঞ্চনার শিকার হতে হয় তাদের।

পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র দায়িত্বশীল হলে কোনো প্রতিবন্ধীই বোঝা হবে না। বরং তাদের কর্মসংস্থান করে স্বাবলম্বী হয়ে বেঁচে থাকার সুযোগ করে দেওয়া যায়। উপযুক্ত সহযোগিতা পেলে সব প্রতিবন্ধী তাদের সক্ষমতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। বিশেষ করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের কেউ কেউ লেখাপড়ায় ভালো ফল অর্জন করে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি পর্যায়ে কর্মরত।

প্রতি বছর ৩ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস পালন করা হয়। ১৯৯২ সাল থেকে এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে। শারীরিকভাবে অসম্পূর্ণ মানুষের প্রতি সহমর্মিতা ও সহযোগিতা প্রদর্শন এবং তাদের কর্মকাণ্ডের প্রতি সম্মান জানানোর উদ্দেশ্যেই দিবসটির সূচনা। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাস্তবতা বিবেচনায় ১৯৯৯ সাল থেকে বাংলাদেশেও জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবস পালিত হচ্ছে। অর্থাৎ আজ ৩১তম আন্তর্জাতিক ও ২৪তম জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবস পালিত হচ্ছে আমাদের দেশে। এবারের প্রতিপাদ্য- 'অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য পরিবর্তনমুখী পদক্ষেপ; প্রবেশগম্য ও সমতাভিত্তিক বিশ্ব বিনির্মাণে উদ্ভাবনের ভূমিকা'। এবারের প্রতিপাদ্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে প্রতিবন্ধীদের জন্য নতুন করে ভাবতে হবে।

প্রতিবন্ধী দিবসের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৫৮ সালে বেলজিয়ামে সাংঘাতিক খনি দুর্ঘটনায় বহু মানুষ মারা যায়। আহত পাঁচ সহস্রাধিক লোক চিরজীবনের মতো প্রতিবন্ধী হয়ে যায়। জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। তাদের প্রতি সহমর্মিতা ও পরহিতপরায়ণতায় বেশ কিছু সামাজিক সংগঠন চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কাজে স্বতঃপ্রবৃত্তভাবে এগিয়ে আসে। এর ঠিক পরের বছর জুরিখে বিশ্বের বহু সংগঠন সম্মিলিতভাবে আন্তঃদেশীয় স্তরে এক বিশাল সম্মেলন করে। সেখান থেকেই প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যের হদিস মেলে। সেখানে সর্বসম্মতভাবে প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে বেশ কিছু প্রস্তাব ও কর্মসূচি গৃহীত হয়। খনি দুর্ঘটনায় আহত, বিপন্ন প্রতিবন্ধীদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণে আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস পালনের আহ্বান জানানো হয়। জাতিসংঘ থেকে এর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মেলে ১৯৯২ সালে। সেই থেকে সারাবিশ্বে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়ানোর দিন হয়ে উঠেছে ৩ ডিসেম্বর।

চিকিৎসাবিজ্ঞান অনেক দূর এগিয়েছে। তাই মায়ের অপুষ্টিজনিত কারণে কোনো শিশু যেন প্রতিবন্ধিতার শিকার না হয়, সে ব্যাপারে দায়িত্বশীল হতে হবে। পাশাপাশি দুর্ঘটনা, রোগ ও ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় কেউ যেন প্রতিবন্ধিতার শিকার না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। বিষণ্ণতার কারণেও মানসিক প্রতিবন্ধীর সংখ্যা বাড়ছে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের হাতে সাদা ছড়ি দিয়েই দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীদের ব্যাপারেও জোরালো চিন্তা করতে হবে। মানসিক হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের পাশাপাশি আমাদের পরিবার ও সমাজে অনেক বিষণ্ণ রোগী রয়েছে। শনাক্ত ও চিকিৎসার অভাবে মাঝেমধ্যে আত্মহত্যার মতো অপমৃত্যুর তালিকায় নাম লেখাচ্ছে এসব অদৃশ্য প্রতিবন্ধী।

মিজান শাজাহান: সহ-সম্পাদক, সমকাল
mizanshajahan@gmail.com

আরও পড়ুন

×